চৈতন্যভূমে ওঁরা মাতলেন অনাবিল আনন্দে, চোখ মুছলেন মোসলেম

0
437
picnic at nandankanan
srila pramanik
শ্রীলা প্রামাণিক

সকাল থেকেই ওঁদের মুখটা ঝলমল করছিল খুশিতে। আজকের দিনটা তো সত্যিই আলাদা ওঁদের জন্য। নিজেদের ব্যাগ থেকে ভালো জামাকাপড় পরে নিয়ে তাঁরা গুটিগুটি পায়ে ভিড় জমিয়েছিলেন বাসের কাছে। বাস ছাড়তেই আর তাঁদের পায় কে! নাকাশিপাড়া থেকে নবদ্বীপ ঘন্টা খানেকের পথ পার হয়ে নন্দনকাননে পৌঁছোতেই খুশিতে আত্মহারা হয়ে ছুট লাগালেন কেউ কেউ, কেউ গান ধরলেন, আবার কেউ কেউ ব্যস্ত হয়ে পড়লেন নানা মনোরঞ্জনের সামগ্রী নিয়ে। দিনভর সেখানেই চলল হৈ হুল্লোড়, খাওয়াদাওয়া। ওঁরা মানসিক ভারসাম্যহীন ভবঘুরে। বাড়ি থেকে বেরিয়ে এসে হারিয়ে গিয়েছেন পরিবারের থেকে। এক অনাবিল আনন্দে ভর করে তাঁরাই আজ ভাগ করে নিলেন বনভোজনের আনন্দ।

উদ্যোগটা নিয়েছিলেন নাকাশিপাড়ার মুসলিম পাড়ার বাসিন্দা মোসলেম মুনশি। প্রায় দেড় দশক ধরে এই সব মানুষের জন্যই কাজ করে আসছেন তিনি। এই মানসিক ভারসাম্যহীন মানুষ, যাঁরা কোনো ভাবে হারিয়ে গিয়েছেন পরিবারের থেকে, তাঁদের নিজের বাড়িতে এনে চিকিৎসা করানোর ব্যবস্থা করেন তিনি। সুস্থ হয়ে নাম ঠিকানা বলতে পারলে বাড়ির সঙ্গে যোগাযোগ করে তাঁদের ফিরিয়ে দেন বাড়িতে।

এ ভাবেই হাজারেরও বেশি মানুষ মোসলেমের হাত ধরে পরিবার ফিরে পেয়েছেন। এই কাজের জন্য খুলে ফেলেছেন নির্মল হৃদয় নামে একটি সংস্থা। বর্তমানে তাঁর বাড়িতে আবাসিক রয়েছেন ৬৩ জন মানসিক ভারসাম্যহীন। প্রতি বছর তাঁদের নিয়ে বনভোজনের আয়োজন করেন। এই বছর ২৩ জানুয়ারি ছিল এমন দিন। ৬৩ জন আবাসিক, তাঁদের সঙ্গে মোসলেমের পরিবার, সংস্থার কর্মীরা। সব মিলিয়ে ৮১ জন।

মঙ্গলবার সকালে দু’টি বাসে চেপে তাঁরা রওনা দেন নবদ্বীপের নন্দনকানন। সেখানে দোলনা থেকে শুরু করে খেলার নানা জিনিস মজুত। উত্তর প্রদেশের যোগেন্দ্র খেতরা, বিহারের ওমপ্রকাশ প্যাটেল বা এই রাজ্যের অমিত ভট্টাচার্য, দেবব্রত চক্রবর্তী, মুম্বইয়ের সাগর, পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়েও এ দিন সব পেয়েছির আসর বসালেন। তাঁদের সঙ্গে ব্যাডমিন্টন বা ক্রিকেটে মন দিলেন বনভোজনে আসা অন্যরা।

শুধু খেলাই নয়, ছিল ভুরিভোজের ব্যবস্থাও। সকালে পৌঁছে লুচি, আলুর দম, ঘুগনি দিয়ে শুরু। দুপুরে পাতে পড়ল ভাত, ডাল, সবজির তরকারি, মাংস, চাটনি, মিষ্টি, দই। এ সবের মাঝেই কখন কেটে গেল গোটা দিন। দিনভর আনন্দের সাক্ষী থেকে গেল নন্দনকানন। শীতের পড়ন্ত বিকেলের আলো যখন এসে পড়ছে ওমপ্রকাশ, দেবব্রতদের মুখে, জানান দিচ্ছে ঘরে ফেরার তাড়া। তাঁদের চোখেমুখে অন্য খুশির ঝিলিক। বনভোজনের আনন্দ পিছনে ফেলে এ বার তাঁরা রওনা দিলেন ঘরের অভিমুখে। হ্যাঁ, ঘরই, পরিবারের থেকে আলাদা হয়েও অন্য এক পরিবার খুঁজে পাওয়া।

বাসে ওঠার মুখে আড়ালেই চোখ মোছেন মোসলেম। বলে যান, “ওদের জন্য তো বেশি কিছু করতে পারি না। যতটা ভালো রাখা যায়। জানেন তো ওদের মুখে এই হাসিটুকু দেখার চেয়ে আমার কাছে বড়ো আনন্দ আর কিছু নেই।” ততক্ষণে সূর্য ঢলেছে পশ্চিমে। জানান দিচ্ছে দিনশেষে সন্ধ্যা আসছে চৈতন্যভূমে। বাস দু’টো রওনা দেয় নাকাশিপাড়ার দিকে। পিছনে পড়ে থাকে এক অন্য রূপকথা।

এক ক্লিকে মনের মানুষ,খবর অনলাইন পাত্রপাত্রীর খোঁজ

loading...

মতামত দিন

Please enter your comment!
Please enter your name here