ইতিহাসে আজও উপেক্ষিত ঝাড়গ্রামে নেতাজির সভাসঙ্গীরা

0
4257
netaji's jhargram tour
Samir mahat
সমীর মাহাত

স্বাধীনতার এত বছর পরেও জঙ্গলমহলের নেতাজির সভাসঙ্গী, দেশপ্রেমী ও স্বাধীনতা সংগ্রামীরা উপেক্ষিত। তাঁদের অস্তিত্ব রক্ষা, স্মৃতিসৌধ সংরক্ষণ, শ্রদ্ধাজ্ঞাপনে প্রশাসনিক উদ্যোগ সামনে আসেনি।

নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর ঝাড়গ্রাম সফর এক ঐতিহাসিক ঘটনা। তথ্যমতে ১৯৪০ সালের ১২ মে ঝাড়গ্রাম শহরের পাঁচ কিমি পশ্চিমে দহিজুড়ি মোড়ে তিনি সভা করেন। সভায় স্থানীয় বিশিষ্ট বহু দেশপ্রেমী উপস্থিত ছিলেন। সেই সন্ধিক্ষণে নেতাজির একান্ত সহযোগী ছিলেন চাঁদড়া এলাকার মুচিরাম সিং, শশধর পাল, বরেন্দ্র নাথ পাল, কিশোরী মোহন মাহাত, রামচন্দ্র মাহাত, চন্দ্রাবতী মাহাত, কুলটিকরির মতিলাল ঘোষ প্রমুখ।

এঁদের মধ্যে রামচন্দ্রবাবু ঝাড়গ্রাম শহরের লালগড় মাঠে (বর্তমানে দুর্গা ময়দান) যুবক সমিতির পক্ষ থেকে নেতাজির উদ্দেশে দু’টি মানপত্র পাঠ করেন। দেশপ্রেমী চন্দ্রাবতী দেবী ইংরেজ শাসনে মহকুমাশাসক অফিস প্রাঙ্গণে প্রথম বার জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেন। স্মৃতিরক্ষা দূরঅস্ত, চন্দ্রাবতী দেবীর ইতিহাসই মেলা ভার। ঝাড়গ্রামের প্রবীন বিশিষ্ট সাংবাদিক তারাপদ কর তাঁর পুস্তিকা ‘নেতাজি সুভাষচন্দ্রের ঝাড়গ্রাম সফর’-এ এ ব্যাপারে ছবি-সহ সমৃদ্ধ তথ্য তুলে ধরেছেন। তথ্যমতে চন্দ্রাবতী দেবীর বাড়ি মানিকপাড়াতে।

পার্শ্ববর্তী বরবাড়ি গ্রামের বাসিন্দা ভুবন মাহাত নেতাজিকে দেখেছেন। তাঁর কথায়, “তখন আমার বয়স ৯-১০ বছর, সম্পর্কে পিসেমশাই গোকুলবাবুর সঙ্গে তাঁদের গোপন মিটিংয়ে যেতাম। মুড়ি ও লাড়ুর লোভেই তাঁর সঙ্গ নিতাম। মানিকপাড়া এলাকার বলিষ্ঠ চেহারার এক মহিলা নেত্রী থাকতেন। আমাদের মাহাত ভাষায় কথা বলতেন, কানাঘুষো শুনেছি তাঁর বাড়ি ললিতাশোলের দিকে। সম্ভবত চন্দ্রাবতী দেবী তাঁকেই বলা হচ্ছে।”

মানিকপাড়া গ্রামের বাসিন্দা শিক্ষক তরুণ মাহাত জানান, “আমার বাবা স্বাধীনতা সংগ্রামীদের সঙ্গেই থাকতেন, বাবার কাছে শুনেছি, এখানে একজন নেত্রী ছিলেন তাঁকে সবাই গান্ধীবুড়ি বলে ডাকত। তাঁর পরবর্তী বংশধরেরা এখানে কেউ নেই। কলকাতা ও ঝাড়গ্রামের বামদা, আখড়াশোল গ্রামে বংশধরেরা আছে বলে শুনেছি। সম্ভবত ওই বুড়িই চন্দ্রাবতী দেবী।”

বরবাড়ি গ্রামের প্রখ্যাত গৃহশিক্ষক দিলীপ মাহাত বলেন, “মানিকপাড়া এলাকায়, আমডিহা গ্রামের অবিনাশ মাহাত ও বহড়াকোঠা গ্রামের গৌতম মাহাতর দাদু এই দু’ জন স্বাধীনতা সংগ্রামীর সরকারি ভাতা পেতেন, কোনো মহিলাকে ভাতা পেতে দেখিনি। সেই স্বাধীনতা সংগ্রামীরা কেউ বেঁচে নেই। তাঁদের স্মৃতিরক্ষার উদ্যোগ আগে নেওয়া হলে বহু মূল্যবান তথ্য পাওয়া যেত।”

এ ব্যাপারে ঝাড়গ্রামের গবেষক ড. সুব্রত মুখোপাধ্যায় বলেন, “সেই সব স্বাধীনতা সংগ্রামীদের স্মৃতিরক্ষা অতি জরুরি, তা না হলে পরবর্তী প্রজন্ম এলাকার ইতিহাস সম্পর্কে মূল্যবান তথ্য জানতে পারবে না।” এ ব্যাপারে ঝাড়গ্রামের মহকুমাশাসক নকুল চন্দ্র মাহাত জানান, “স্থানীয় স্বাধীনতা সংগ্রামীদের স্মৃতিরক্ষার জন্য পরবর্তী কালে যথাযত পদক্ষেপ নেওয়া হবে।”

সাঁকরাইলের সংস্কৃতি বিশেষজ্ঞ বিমল মাহাত জানান, “কুলটিকরির স্বাধীনতা সংগ্রামী মতিলাল ঘোষ প্রভাবশালী ছিলেন। তাঁর পরবর্তী বংশধরেরা এলাকায় প্রখ্যাত ব্যাবসায়ী হিসেবে পরিচিত। স্বাধীনতা সংগ্রামীদের মধ্যে এলাকার মূলবাসী মাহাত-কুড়মি অনেকেই নেতাজিকে সঙ্গ দিয়েছিলেন, ইতিহাসে তাঁরা আজও উপেক্ষিত।”

ছবি: মধ্যমণি সুভাষচন্দ্র, পতাকা হাতে মানিকপাড়ার চন্দ্রাবতী দেবী। ‘নেতাজি সুভাষচন্দ্রের ঝাড়গ্রাম সফর’ পুস্তিকা থেকে সংগৃহীত।

এক ক্লিকে মনের মানুষ,খবর অনলাইন পাত্রপাত্রীর খোঁজ

loading...

মতামত দিন

Please enter your comment!
Please enter your name here