গভীর রাতে লাটাগুড়ির রিসর্টে পর্যটকদের ঘরে হানা, মদ্যপ পুলিশ সাসপেন্ড

0
2569
drunk asi of kranti police post

নিজস্ব সংবাদদাতা, জলপাইগুড়ি: রাত তখন সাড়ে তিনটে। এমনিতেই শীতের রাত, তার মধ্যে ডুয়ার্সের জঙ্গলে রিসোর্ট। ঘুমটা ভালোই জমেছিল। হঠাৎ দরজায় দমাদম লাথি আর ধাক্কার আওয়াজ শুনে ঘুম ভেঙে যায় রাজু দাসের। কলকাতার যোধপুর  গার্ডেনের বাসিন্দা রাজু দাস সপরিবার ডুয়ার্স ঘুরতে এসেছেন। উঠেছেন গরুমারা জাতীয় উদ্যান সংলগ্ন লাটাগুড়ির একটি বেসরকারি রিসর্টে।

দিন বেশ ভালোই কাটছিল। সাজানোগোছানো এবং সুরক্ষিত রিসর্ট। ভোররাতে সেই রিসর্টের ঘরের দরজায় জোর আওয়াজে ঘাবড়েই যান রাজুবাবু। কিন্তু ঘাবড়ানোর আরও বাকি ছিল। লাথি আর ধাক্কার পাশাপাশি পুলিশ পরিচয় দিয়ে দরজা খুলে দেওয়ার হুমকি আসছিল বাইরে থেকে। কিছুটা সাহস করে দরজা খোলেন তিনি। দেখতে পান খাকি উর্দি পরিহিত এক পুলিশ অফিসার দাঁড়িয়ে। তার সঙ্গে দু’জন সিভিক ভলান্টিয়ার। রীতিমতো টলতে টলতে গালিগালাজ শুরু করেন ওই অফিসার। রাজুবাবু বুঝতে পারেন ওই পুলিশ অফিসার নেশাগ্রস্ত অবস্থায় আছেন। এর পর প্রতিটি ঘরেই ধাক্কা মেরে পর্যটকেদের ঘর থেকে বের করে আনেন তিনি। তাঁদের গালিগালাজ করেতে শুরু করেন।

রাজুবাবু জানিয়েছেন, ওই পুলিশ অফিসারের অভব্য ব্যবহারের হাত থেকে রেহাই পাননি বয়স্ক মানুষ বা মহিলারাও। গোলমাল শুনে রিসোর্টের ম্যনেজার ছুটে এলে তাঁকেও ধাক্কাধাক্কি ও গালিগালাজ করেন ওই অফিসার। সঙ্গে থাকা দুই সিভিক ভলান্টিয়ার চেষ্টা করেও তাঁকে ক্ষান্ত করতে পারেননি। এর পরেই ক্ষিপ্ত ২৮ জন পর্যটক ওই অফিসারকে ঘিরে ধরে তাঁকে আটকে রাখেন। আটকে রাখা হয় দুই সিভিক ভলান্টিয়ারকেও। দিনের আলো ফুটলে তাঁদের দেখে নেবেন, এই হুমকি দেন মদ্যপ ওই অফিসার, অভিযোগ পর্যটকদের।

aggrieved-tourists describing the incident
ঘটনার বিবরণ এনে দিচ্ছেন ক্ষুব্ধ পর্যটকরা।
বিজ্ঞাপন

খবর পেয়ে ছুটে আসেন রিসোর্টের মালিক দীপঙ্কর দত্তও। স্থানীয় থানার নম্বর না থাকায় যোধপুর গার্ডেনের বাসিন্দা রাজুবাবু যোগাযোগ করেন ভবানী ভবনের সঙ্গে। ভবানী ভবনের তরফে জেলা পুলিশ মারফত স্থানীয় ক্রান্তি ফাঁড়িতে খবর যায়। রিসোর্টে ছুটে আসেন ক্রান্তি ফাঁড়ির ওসি খেসাং লামা। ততক্ষণে জানা গিয়েছে, ওই কীর্তিমান অফিসারের পরিচয়। গোপালচন্দ্র রায় নামে ওই এএসআই ক্রান্তি ফাঁড়িতেই কর্তব্যরত। মালবাজার থানার অধীন ক্রান্তি ফাঁড়ির ওপরে রয়েছে লাটাগুড়ির রিসোর্টগুলির দেখাশোনার ভার। সুরক্ষার খাতিরেই প্রতি রাতেই পুলিশকর্মীরা রিসোর্টগুলিতে নিয়ে খোঁজখবর নেন। কিন্তু পর্যটকদের হেনস্থার এ রকম ঘটনা আগে ঘটেনি, জানালেন রিসোর্টের মালিক দীপঙ্কর দত্ত। রাতেই ক্রান্তি ফাঁড়ির ওসির কাছে অভিযোগ দায়ের করেন পর্যটকেরা।

ততক্ষণে নেশার ঘোর কেটেছে মদ্যপ ওই পুলিশ অফিসারের। গলদ বুঝে হাতজোড় করে পর্যটকদের কাছে ক্ষমাও চান তিনি। কিন্তু ততক্ষণে যা হওয়ার হয়ে গিয়েছে।

রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যখন ডুয়ার্সের পর্যটনকে বিশ্বের মানচিত্রে তুল ধরতে নানা পরিকল্পনা নিচ্ছেন, তখন এই ধরনের ঘটনা পর্যটনশিল্পে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন পর্যটনশিল্পের সঙ্গে যুক্তরা। লাটাগুড়ি রিসর্ট ওনার্স ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনের সম্পাদক দিব্যেন্দু দেব জানিয়েছেন, তাঁরা ক্রান্তি ফাঁড়ি থেকে অনেক সহযোগিতা পান। কিন্তু এই ঘটনা পুলিশের সম্পর্কে খারাপ ধারণা তৈরি করবে বাইরে থেকে আসা পর্যটকদের মধ্যে।

যদিও এটিকে বিচ্ছিন্ন একটি ঘটনা বলেছেন জেলা পুলিশসুপার অমিতাভ মাইতি। তিনি জানিয়েছেন, ঘটনা জানার সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। অভিযুক্ত এএসআইকে সাসপেন্ড করা হয়েছে। তাঁর বিরুদ্ধে শুরু হয়েছে বিভাগীয় তদন্ত। পুলিশ সুপার জানিয়েছেন, যদি এই ঘটনায় আরও উচ্চপদস্থ কোনো আধিকারিকের গাফিলতি ধরা পড়ে, তা হলে তাঁদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তা%র দাবি, এটা একটা বিক্ষিপ্ত ঘটনা মাত্র। আখেরে পুলিশ পর্যটকদের সহযোগিতার জন্যই কাজ করে। একই আশা প্রকাশ করেছেন পর্যটন ব্যবসায়ীরাও। এই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হবে না, পুলিশের কাছে এই আশ্বাসই দাবি করেছেন তাঁরা।

বিজ্ঞাপন
loading...

মতামত দিন

Please enter your comment!
Please enter your name here