ভালোবাসি, ভালো থেকো, ভালো রেখো…

0
123

pankajপঙ্কজ চট্টোপাধ্যায়:

প্রেম, বসন্ত এবং মনের কথার বা অভিব্যক্তির প্রথম প্রকাশ বিদর্ভরাজ ভীষ্মকের একমাত্র কন্যা রাজকুমারী রুক্মিণীর একটি চিঠিতে। অপরূপা রুক্মিণী মনপ্রাণ সঁপে দিয়েছিলেন দ্বারকাপতি শ্রীকৃষ্ণকে। কিন্তু রুক্মিণীর বিয়ে ঠিক হয়েছে চেদিরাজ শিশুপালের সঙ্গে। ঠিক করেছেন রুক্মিণীর বড়ো ভাই রুক্মী কুমার। রুক্মিণী তাঁর না- দেখা, শুধু কানে শোনা নানা কাহিনির নায়ক শ্রীকৃষ্ণকে একটি চিঠি লিখলেন এবং সুনন্দ নামে এক বিশ্বস্ত দূতের মাধ্যমে তা পাঠালেন শ্রীকৃষ্ণের কাছে। সেই চিঠিতে রুক্মিণীহরণের যাবতীয় কলাকৌশল স্বয়ং রুক্মিণীই বলে দেন শ্রীকৃষ্ণকে এবং বিনা রক্তপাতে বড়ো ভাই বলরামকে সঙ্গে নিয়ে রুক্মিণী হরণ করে দ্বারকায় নিয়ে আসেন শ্রীকৃষ্ণ। তার পর যদিদং হৃদয়ং তব….। কালটা ছিল এই বসন্তঋতু।

দ্বাপর যুগের কাহিনি দিয়ে শুরু করেছিলাম, এ বার এলাম সাড়ে চার হাজার বছরের পুরোনো তথ্যে। প্রত্নতত্ত্ববিদরা পৃথিবীর প্রাচীনতম প্রেমলিপিটি আবিষ্কার করেছেন এক খণ্ড পাথরে। মেসোপটেমিয়ার (অধুনা পশ্চিম এশিয়া) ক্যালাডিয়া নামে এক জায়গায় ছিল অতি সমৃদ্ধ এক সভ্যতা, যা ব্যাবিলনীয় সভ্যতা নামে খ্যাত। সেখানকার লোকেরা হিব্রু, আরবি, অ্যারামাইক ইত্যাদি ভাষায় কথা বলত। সেখানকার পাথরে লেখা ছিল এক প্রেমলিপি। খ্রিষ্টপূর্ব আড়াই হাজার বছর আগে টাইগ্রিস নদীর তীরে বসবাসকারী এক তরুণ তাঁর প্রেম নিবেদন করেছেন ইউফ্রেটিস নদীতীরের শহর শিপায়রার এক তরুণীকে, যাঁদের মধ্যে দেখা হয়নি কোনো দিনই। এ যেন মহাকবি কালিদাসের বিরহী যক্ষের প্রেমলিপিখানি বসন্তবাতাসে ভর দিয়ে মেঘদূতের হাত দিয়ে ভেসে ভেসে চলে যায় প্রেমময়ীর কাছে। রবীন্দ্রনাথ বলে ওঠেন যেন, ‘প্রেম এসেছিল নিঃশব্দ চরণে…’। 

ভ্যালেন্টাইন, বসন্তকাল এবং প্রেম নিয়ে ইংরিজি ভাষায় প্রথম চিঠি ১৪৪৭ সালে। ইংল্যান্ডের নরফোক কাউন্টির সম্ভ্রান্ত প্যাস্টান পরিবারের জন প্যাস্টানকে লেখা তাঁর প্রেমিকা মিস মার্গারি ব্রিউস-এর চিঠি। চিঠির সম্বোধনে লেখা “মাই রাইট ওয়েল-বিলাভইড্‌ ভ্যালেন্টাইন…”। ভ্যালেন্টাইন নিয়ে প্রথম সাহিত্য বা কবিতা পাওয়া যায় বিখ্যাত ইংরেজ কবি জিওফ্রে চসারের চোদ্দো শতকের শেষের দিকে লেখা ‘পার্লিয়ামেন্ট অব ফাউলস্‌’-এ। ভ্যালেন্টাইন ডে-র উল্লেখ পাই ষোলো শতকের শেষে লেখা উইলিয়াম শেক্সপিয়ারের ‘হ্যামলেট-এ ওফেলিয়ার বেদনায়। প্রেমিকের হাতে বাবা পোলোনিয়াস খুন হওয়ার পর কন্যা ওফেলিয়া পাগল হয়ে যায়, বেদনায়-কান্নায় গুমরে উঠে বলে – “ টুমরো ইজ সেন্ট ভ্যালেন্টাইন ডে,/অল ইন দ্য মর্নিং বিটাইম,/অ্যান্ড আই আ মেড অ্যাট উইন্ডো,/টু বি ইওর ভ্যালেন্টাইন…”।

ভ্যালেন্টাইন ডে উদযাপন শুধুমাত্র প্রেমিক-প্রেমিকাদের জন্য নয়। বাইবেলের মহাঅধ্যায়ে সেন্ট ভ্যালেন্টাইনের বিবৃতিই ছিল, বসন্তের এই মায়াময় সময়ে প্রিয়জনের প্রতি প্রিয়জন হোক দরদী। হোক সে প্রেমিক-প্রেমিকা, মা-বাবা, ভাই-বোন, বন্ধু-বান্ধব, এমনকি আতুর-আর্ত, অসহায় মানুষ, কিংবা অন্য কোনো জীব। ভ্যালেন্টাইন মানে শুধু একটাই – ভালোবাসি, ভালো থেকো, ভালো রেখো।

বিজ্ঞাপন
loading...

মতামত দিন

Please enter your comment!
Please enter your name here