ইছামতীর টাকি, বিসর্জনের টাকি

0
8455
kuleshwari mandir
কুলেশ্বরী মন্দির।
papiya mitra
পাপিয়া মিত্র

মিনি সুন্দরবন থেকে ফিরে আসার সময় কয়েকটি খুদে পথ আটকাল। টোটো থেমে গেল। খুদেদের পিছনে তাদের মায়েরা। ছোট্টো ছোট্টো হাতে বিলবই এগিয়ে দিল। নদী থেকে ধেয়ে আসা শিরশিরে হাওয়া মনে করিয়ে দিল সরস্বতী পুজোর কথা। তারই প্রস্তুতি চলছে খুদেদের মধ্যে। শীতকালীন কাছেপিঠে ভ্রমণের মধ্যে এ বার টাকি, ইছামতীর টাকি, বিসর্জনের টাকি।

কথা ছিল, বায়নাও ছিল, কোথাও এক রাত কাটিয়ে আসার। তাই পাড়া থেকে পনেরো জনের দলটা বেরিয়ে পড়ল কুয়াশাঘেরা এক সকালে। গন্তব্য বসিরহাটের কাছে টাকি। এক প্রস্থ চা খেয়ে গাড়িতে উঠলেও বানতলার কাছে নামা হল ধুমায়িত চায়ের চাহিদায়। জাঁকিয়ে ঠান্ডা অনেক বছর পরে উপভোগ করা। তাই আনন্দের ঢেউ জেগেছে চার দিকে। গাড়ি ছুটেছে পিকনিক পার্টি নিয়ে। ভোরের ঘুম ভাঙিয়ে গান ছুটেছে গতির টানে। প্রাতরাশের প্যাকেট গাড়িতে শেষ করে হাসিঠাট্টায় মেতে ওঠা। বেলা কিছুটা হলেও গড়িয়েছে। গাড়ি থামল গেস্ট হাউসের দরজায়। লাগেজ নামিয়ে বেরিয়ে পড়া ইছামতীর ধারে।

ichhamati adjacent to mini sundarban
মিনি সুন্দরবনের কিনারে ইছামতী।

সার দিয়ে নানা পসার। তবে চা আর নানা খাবারের দোকান খিদে বাড়িয়ে দিল কয়েক গুণ। উলটো দিকে শিশু উদ্যান। ভিড় জমিয়েছে ছেলেবুড়ো সকলেই। টাকি পুরসভার উদ্যোগে ঘোষণা চলছে বেড়ানোর নানা জায়গার নাম। সঙ্গে সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের একটি গানের একঘেয়ে দু’টি কলি। দলের জন্য ভাড়া করা হল একটি ছোটো লঞ্চ। জোলো হাওয়ায় পতপত করে উড়ছে ভারতের পতাকা। চার দিকে ঘন কুয়াশার আস্তরণ কেটে সূর্য মাথার ওপর থাকলেও শিশুর মতো নরম আলোই প্রাপ্য থাকল। ইছামতীর বুক চিরে এগিয়ে চলল লঞ্চ, চোখে পড়ল কেয়াপাতার জঙ্গল। একটু এগিয়ে মোহনা – কালিন্দী, বিদ্যাধরী আর ইছামতী। কালিন্দী চলে গিয়েছে সুন্দরবনের দিকে, বিদ্যাধরী ক্যানিং আর ইছামতীতে ভেসে বেড়ানো। মাছরাঙা দ্বীপের গা দিয়ে ফেরিঘাটে ফিরে আসা। প্রতিবেশী দেশের গরু-ছাগল ও মানুষের নানা কাজও চোখে পড়ল। ঘন্টা দেড়েকের জলভ্রমণ শেষে এ বার মধ্যাহ্ন ভোজন।

a pair of shiva temples
জোড়া শিবমন্দির।

খানিক বিশ্রাম নিয়ে এ বার তিনটি টোটো ঠিক করা হল। প্রাচীন জোড়া শিবমন্দির টলটলে পুকুরের গায়ে, সংরক্ষণ করেছে পুরসভা। পথে প্রাক্তন সেনাপ্রধান জেনারেল শঙ্কর রায়চৌধুরীর বাড়ি দুর্গাদালান, ঘোরানো কল, ‘বিসর্জন’ সিনেমার শ্যুটিং-এর টালির বাড়িটি ও ‘বিশ্রাম কক্ষ’। টাকির নানা অতিথিনিবাস এখন শ্যুটিং-এর জন্য বিখ্যাত হয়ে উঠছে। বাহন গিয়ে দাঁড়াল জিরো পয়েন্টে। এখানে ভারতের নাগরিকের প্রমাণপত্র জমা দিতে হল। বিএসএফ দলের সংখ্যা গুণে খাতায় সই করাল। সেখান থেকে মিনি সুন্দরবনের পথে হাঁটা। জালালপুর এক নম্বর ওয়ার্ডের অধীনে আশি একর জুড়ে হেতাল, গরান, ক্যাওড়া প্রভৃতি ম্যানগ্রোভের ঘন জঙ্গল নিয়ে গড়ে উঠেছে মিনি সুন্দরবন। শেষ প্রান্তে বয়ে চলেছে ইছামতী, সূর্য তখন হেলে গিয়েছে অনেকখানি। কুয়াশার ঘোর নেমে আসছে চার পাশে।

durgadalan of ex general's house
প্রাক্তন সেনাপ্রধানের বাড়ির দুর্গাদালান।

টাকিবাজারের মাছের বাজারটি বেশ মনোরম। দলের কয়েক জন পরের দিন ভোরে ঘুরতে বেরিয়ে মাছের খবর আনল। সবাই আহ্লাদিত হয়ে ট‍্যাংরার কথা বলল। হাসনাবাদ থেকে আনা মাছের স্বাদ মনে থাকবে বেশ কিছু দিন। আর অতিথিশালার খাবারও বেশ ভালো। ততোধিক ভালো ছেলেরা। দল মাছ কিনে দিতে একটি উপাদেয় ঝোল রেঁধে দিল আমাদের নিরামিষ থালির সঙ্গে।

এ বার টাকির জমিদারবাড়ির দুর্গাদালানের খিলান পরখ করা। সারথি বলে দিচ্ছিল নানা কথা। এখানে ‘শঙ্খচিল’-সহ একাধিক সিনেমার শ্যুটিং হয়েছে। আছে কুলেশ্বরীর মন্দির, মহাদেবের মন্দির ও পটেশ্বরীদেবীর মন্দির। এক রাত দেড় দিনের ছোট্টো সফর সেরে ছুটির মেজাজ নিয়ে বাড়ি ফেরার কথাই আবার কথা পাড়ে নতুন ঠিকানার জন্য।

on the way to mini sundarban
মিনি সুন্দরবন যাওয়ার পথে।

কী ভাবে যাবেন

শিয়ালদহ থেকে হাসনাবাদ লোকালে টাকি রোড স্টেশন। দু’ ঘণ্টার পথ। স্টেশন থেকে ভ্যান রিকশা। কলকাতার এসপ্ল্যানেড বাসে সাড়ে তিন ঘণ্টার পথ। গাড়িতে বাসন্তী হাইওয়ে দিয়ে ঘটকপুর হয়ে কিংবা বারাসত, বেড়াচাঁপা হয়ে টাকি।

কোথায় থাকবেন

মিউনিসিপ্যালিটি গেস্ট হাউস ছাড়া টাকিতে অনেকগুলি বেসরকারি অতিথিশালা রয়েছে। গুগল থেকে সন্ধান পেয়ে যাবেন। মিউনিসিপ্যালিটি গেস্ট হাউসের সঙ্গে যোগাযোগ ০৩২১৭ ২৩৩ ৩২৪।

এক ক্লিকে মনের মানুষ,খবর অনলাইন পাত্রপাত্রীর খোঁজ

loading...

মতামত দিন

Please enter your comment!
Please enter your name here