দু:স্থ পড়ুয়াদের স্বপ্নপূরণ, পাশে পেল ফুলিয়ার চার যুবককে

0
four youths of fuliya
srila pramanik
শ্রীলা প্রামাণিক

নদিয়া: কিশোরী পড়ুয়াদের দু’চোখে শুধু স্বপ্ন। সেই স্বপ্নউড়ানে যদিও বাধ সেধেছিল দারিদ্র্য। অভাবের সংসারে মাধ্যমিক পাস করার স্বপ্ন কার্যত ভেঙে যেতে বসেছিল চার পড়ুয়ার। দশম শ্রেণিতে উঠলেও মাধ্যমিকের পাঠ্যবই কেনার ক্ষমতা নেই পরিবারের। আর তাই বাধ্য হয়েই পরিস্থিতিকে মেনে নিয়েছিল কিশোর-মন। স্কুলের সহপাঠীদের সঙ্গে এক্কাদোক্কা খেলা, ক্লাসঘর, স্কুলফেরত আমগাছে ঢিল – কৈশোরের যাবতীয় চপলতার সাথে ছিল পড়াশোনা করে বড়ো হওয়ার স্বপ্ন। যাবতীয় স্বপ্নে অবশ্য দাঁড়ি পড়ে গিয়েছিল এক লহমায়।

কিন্তু একটু অন্য রকম ভেবেছিলেন ফুলিয়ার চার যুবক। চার পড়ুয়ার কথা কানে গিয়েছিল ফুলিয়ার বাসিন্দা ভানুদয় মণ্ডল, অপুর্ব রায়মজুমদার, গোবিন্দ দত্ত এবং বাবুসোনা ঘোষের। এঁদের মধ্যে ভানুদয় একটি প্রাথমিক স্কুলের শিক্ষক এবং অপুর্ব একটি প্রাথমিক স্কুলের প্রধান শিক্ষক। নিঃশব্দে অ্যাকশন বলে উঠেছিল তাঁদের বিবেক। সব কথা শুনে তাঁরা এগিয়ে এলেন ওই পড়ুয়াদের সাহায্যে। নিজেদের উদ্যোগে এবং নিজেদের টাকায় মাধ্যমিকের যাবতীয় পাঠ্যপুস্তক শনিবার তাঁরা তুলে দিলেন এই পড়ুয়াদের হাতে। কোনো সভা অনুষ্ঠান নয়, সবার অলক্ষ্যে তাঁরা প্রত্যন্ত গ্রামে এক অন্য আঁধার কাটানোর কাজ করলেন নি:শব্দে। সবার অজান্তেই এক অন্য নজির তৈরি করলেন তাঁরা।

নদিয়ার শান্তিপুর ব্লকের আরবান্দি ১ পঞ্চায়েতের প্রত্যন্ত গ্রাম সর্দারপাড়া। এই এলাকারই বাসিন্দা ওই চার কিশোরী স্কুলপড়ুয়া। তাদের বাবা-মা দিনমজুর। চার জন ভিন্ন পরিবারের। এই বছর দশম শ্রেণিতে উঠেছে আরবান্দি নেতাজি হাইস্কুলের এই পড়ুয়ারা। সামনে মাধ্যমিক। পরীক্ষা দিয়ে মাধ্যমিক পাশের স্বপ্নে যখন তারা বিভোর তখনই গ্রাস করেছিল দু:স্বপ্ন। হতদরিদ্র পরিবারে পাঠ্যবই কিনে দেওয়ার ক্ষমতা নেই তাদের বাবা-মায়ের। ফলে পড়াশোনা বন্ধই করে দিতে হচ্ছিল তাদের।

বিজ্ঞাপন

অভাবের তাড়নায় পড়াশোনা বন্ধের সিদ্ধান্ত এক প্রকার নিয়েই ফেলেছিল তাদের পরিবার। সেই খবর কানে আসে ভানুদয়, অপুর্ব, গোবিন্দ, বাবুসোনাদের। সর্দারপাড়া থেকে বেশ কিছুটা দুরে শান্তিপুর ব্লকেরই ফুলিয়ার বাসিন্দা তাঁরা। দ্রুত সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেন তাঁরা, পাশে দাঁড়াতে হবে ওই পড়ুয়াদের। নিজেদের টাকায় কিনে ফেলেন মাধ্যমিকের পাঠ্যবইয়ের চার চারটি সম্পুর্ণ সেট। যার জন্য খরচ হয়েছে প্রায় ৩৯০০ টাকা। শনিবার বিকেলে তাঁরা সর্দারপাড়া এলাকায় গিয়ে পড়ুয়াদের হাতে তুলে দিয়ে আসেন সেগুলো। নতুন বই হাতে পেয়ে হাসি ফুটেছে পড়ুয়াদের মুখে। তাদের কথায়, কাকুগুলো খুব ভালো। ওদের জন্য আবার পড়াশোনা করতে পারব। আর তাদের অভিভাবকরা বলছেন, “ওনাদের ধন্যবাদ জানানোর ভাষা নেই আমাদের। বাচ্চাগুলোর বই কিনে দিতে পারিনি। ক্ষমতা নেই আমাদের। তবে ওদের পড়ানোর ইচ্ছা ছিল। ওনারা যে ভাবে পাশে দাঁড়ালেন তা ভুলব না।”

আর ভানুদয়, অপুর্ব, গোবিন্দ, বাবুসোনা বলছেন, “কথাটা কানে আসার পরেই ঠিক করে ফেলেছিলাম ওদের পাশে দাঁড়াতেই হবে। বাচ্চাগুলো পড়াশোনা করতে পারবে এটা ভেবেই আমরা খুশি।” তবে এখানেই থেমে না থেকে আগামী দিনে অন্যান্য দু:স্থ পড়ুয়াদের পাশে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তাঁরা। প্রত্যন্ত এলাকায় এই ধরনের যে সমস্ত পড়ুয়া আছেন তাদের তালিকা তৈরির কাজ শুরু করেছেন নিজেরাই। এ রকম যাদের প্রয়োজন তাদের পাশে দাড়ানোর শপথ নিয়েই নিয়েছেন তাঁরা।

বিজ্ঞাপন
loading...

মতামত দিন

Please enter your comment!
Please enter your name here