সরস্বতীর পরে অসময়ের দুর্গা আসেন যে গ্রামে

0
364
durga puja at kurit
payel samanta
পায়েল সামন্ত

মণ্ডপে লক্ষ্মী, গণেশ, কার্তিক আছেন। আছেন বীণাপাণি সরস্বতীও। আছেন তাঁদের মা-ও। ভাবছেন দুর্গাপুজো নিয়ে আবার কেন? সে তো চুকে গেছে অনেক দিন হল!

এ বারের শ্রীপঞ্চমী তিথি চলে যাওয়ার পর পাড়ায় পাড়ায় যখন ম্লান হয়ে গেল সরস্বতী পুজোর মণ্ডপ, তখনই দূরে এক অজ গাঁয়ে জ্বলে উঠল সরস্বতীর মুখের হাসি। মায়ের সঙ্গে তাঁরা চার জনাও যে দাঁড়িয়ে আছেন পুজোমণ্ডপে। গ্রামের নাম কুরিট। সেখানেই খবর অনলাইন পৌঁছে গিয়েছিল এই অসময়ের দুর্গার সন্ধানে।

মাঘের শ্রীপঞ্চমী তিথির পর থেকেই শুরু হয়ে যায় ষষ্ঠী, সপ্তমী, অষ্টমীর দুর্গোৎসব। একেবারে জাঁকজমক করে দুর্গাপুজো যাকে বলে! হাওড়া জেলার আমতার প্রত্যন্ত কুরিট গ্রামে শারদীয়ার বাজনা বাজে না। জনশ্রুতি অনুযায়ী, গ্রামে দেবী চণ্ডীর অধিষ্ঠান। তাই শারদীয় দুর্গা পুজো হয় না। মাঘের শীতে আঠারো হাতের দুর্গাই পুজো পান এখানে। মণ্ডপে প্রতিমার সামনে ঋষি কাত্যায়ন বসে আছেন। পুরাণ মতে, তিনিই এই দুর্গাপুজো প্রচলন করেছিলেন। প্রশ্ন জাগল, মাঘের শীতে ঢাক বাজিয়ে কেন এখানে এই দুর্গাপুজো?

durga puja fair at kurit৩৫ বছর আগের এক কাহিনি শোনা গেল গ্রামের বর্ষীয়ান বাসিন্দা উত্তম কোলের কাছে। কৃষিনির্ভর এই গ্রামে আগে বৃষ্টির অভাবে চাষবাস হত না। আর্থ-সামাজিক অবস্থা ছিল নিম্নমুখী। তান্ত্রিক বিশ্বনাথ চক্রবর্তীর উপদেশে শুরু হয়েছিল এই গ্রামের অষ্টাদশভুজা দুর্গা ওরফে দেবী মহালক্ষ্মীর পুজো। গ্রামের বাসিন্দাদের দাবি, এই পুজো চালু হওয়ার পর থেকে গ্রামের শ্রীবৃদ্ধি ঘটেছে অনেক। মাঝখানে পুজো সাময়িক স্থগিত থাকলেও এখন আবার পুজো ঠিকঠাকই হচ্ছে।

পুজো উপলক্ষে বসেছে গ্রামীণ মেলা। তেলেভাজা, ফুচকা, আইসক্রিম, জিলিপি, পাঁপড়ের পাশে ছোটোখাটো নাগরদোলার সমারোহ চোখে পড়ার মতো। গ্রামীণ মেলা বিশেষ করে শীতের মেলা কৃষিজীবী মানুষের কাছে বিনোদনের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। তাই আশেপাশের গ্রাম বলরামপুর, কোটালপাড়া, ছোটোমোহরা, বড়োমোহরা, চাকপোতা থেকে আসা মানুষের ভিড় বেশ নজর কাড়ে। শোনা গেল, এ সময় সবাই কর্মস্থল থেকে ছুটি নিয়ে বাড়িতে থাকেন। বাড়িতেও অতিথিদের আনাগোনা চোখে পড়ার মতো। মেলাতে কোনো কর্পোরেট দেখনদারি নেই। চট পেতে কেউ কেউ চপ-মুড়ির দোকান দিয়েছেন। কৃষিকাজের পাশাপাশি এ তাঁদের বাড়তি রোজগার। পুজো কমিটির সদস্য অভিষেক সাধুখাঁ জানালেন, “এ বার পুজোর ভিড় অন্যান্য বারের তুলনায় কম। শীতের প্রকোপ তো আছেই। রয়েছে ভোটের একটা হাওয়া। তবে সামনের বছর আমাদের রজতজয়ন্তী। প্রচুর ভিড় হবে।” মনে পড়ে গেল, প্রয়াত সাংসদ সুলতান আহমেদের উলুবেড়িয়া কেন্দ্রের অন্তর্গত এই গ্রাম। শহুরে থিম সংস্কৃতি বা ঐতিহ্যের গুমোর না রেখে এ পুজো একদমই গ্রামের প্রাণের দুর্গোৎসব। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, যাত্রা, নাটক, গান – সবই চলে পুজোকে কেন্দ্র করে।

stall in kurit village fairবাংলার লোক-লৌকিকতা-সংস্কৃতি নাকি হারিয়ে যাচ্ছে! সব কিছু গ্রাস করে নিচ্ছে ইন্টারনেট, মেগাসিরিয়াল আর গ্লোবালাইজেশন। কিন্তু ভাবতে ভালো লাগে বাংলার গ্রামে গ্রামে আজও টিকে রয়েছে এমন গ্রামীণ মেলা, এমন মিলনমেলা যেখানে পুজো আক্ষরিক অর্থে মিলনস্থল হয়ে ওঠে। মণ্ডপের কাছেই প্রাচীন বটবৃক্ষের সামনে পঞ্চমুণ্ডির আসনে মন্ত্র পড়ে পুজো চলছিল। জানা গেল, এই পুজো চলে তন্ত্র মতে। ফুল বেলপাতাই এ পুজোর মূলে। আচার-উপাচার গৌণ। খেয়াল করে দেখলাম, এ পুজোর উদ্যোক্তা তারাময়ী আশ্রম। যে পঞ্চমুণ্ডির আসনে যজ্ঞ চলছে তা অতীতের শ্মশান ও সাধকস্থল। বেশ মাহাত্ম্য এ স্থানের। উপস্থিত সকলেই এক বার করে এ স্থানে মাথা ঠেকিয়ে যাচ্ছেন।

আজ দশমী। সি্ঁদুরখেলার দিন। মেলা জমে ওঠার শেষ দিন। বাঙালি রামচন্দ্রের অকালবোধন বা রাজা সুরথের বাসন্তীপুজো দেখতে অভ্যস্ত। মন্দ কি এ বার ঋষি কাত্যায়নের অষ্টাদশভুজা দুর্গার পুজো দেখলে! তাই ধর্মতলা থেকে আমতাগামী সিটিসি বাসে উঠে নিশ্চিন্তে পৌঁছে যান আমতায়। ওখান থেকে টো টো বা অটোতে কুরিট গ্রাম, সব মিলিয়ে খুব কম সময়। এ বার না পারলে সামনের বছরে চলুন। মনস্কাম থাকলে মহালক্ষ্মীর কাছে যান। শস্যশ্যামলা কুরিট গ্রামের মতো প্রার্থনা পূরণের এমন বড়ো উদাহরণ আর পাবেন নাকি!

এক ক্লিকে মনের মানুষ,খবর অনলাইন পাত্রপাত্রীর খোঁজ

loading...

মতামত দিন

Please enter your comment!
Please enter your name here