বন্ধ হয়ে গেল জলপাইগুড়ির দু’টি চা বাগান

0
468
closed gate of sylee tea estate
বন্ধ সাইলি চা বাগানের ফটক।

নিজস্ব সংবাদদাতা, জলপাইগুড়ি: ফের অশনি সংকেত চা শিল্পে। একই দিনে অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ হয়ে গেল জলপাইগুড়ি জেলার দু-দু’টি চা বাগান। অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মুখে আড়াই হাজারেরও বেশি শ্রমিক। মালবাজার ব্লকের সাইলি এবং নাগরাকাটা ব্লকের হিলা চা বাগানদু’টি সোমবার থেকে বন্ধ হয়ে গেল। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের উত্তরবঙ্গ সফরের মধ্যেই এই ভাবে দু’টি চা বাগান বন্ধ হওয়ায় শুরু হয়েছে রাজনৈতিক তরজা। চা-শ্রমিকদের মধ্যে তৈরি হয়েছে আশঙ্কার মেঘ।

সোমবার সকালে মালবাজারের সাইলি চা বাগানের শ্রমিকরা কাজে গিয়ে দেখতে পান বাগানের গেটে সাসপেনশন অফ ওয়ার্কের নোটিশ ঝোলানো। সেখানে জানানো হয়েছে, ৮ জানুয়ারি, সোমবার থেকে বাগানের কাজ অনির্দিষ্ট কালের জন্য বন্ধ থাকবে। এর পরেই ক্ষোভ তৈরি হয় শ্রমিকদের মধ্যে। তাঁরা খোঁজ নিয়ে জানতে পারেন, রবিবার রাত ১১টা নাগাদ সাসপেনশনের নোটিশ লাগিয়ে চুপিসারে বাগান ছেড়ে চলে যান বাগানের ম্যানেজার-সহ অন্যান্য আধিকারিক। বাগান কর্তৃপক্ষের তরফে নোটিশে দাবি করা হয়েছে, শ্রমিকরা বাগানে ঠিকমতো কাজ করেন না। যার ফলে আর্থিক ক্ষতির সন্মুখীন হচ্ছে বাগান। এই ভাবে বাগান বন্ধ হয়ে যাওয়ায় অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মুখে বাগানের ১৫২৮ জন শ্রমিক।

hilla tea estate
বন্ধ হিলা চা বাগান।

একই ভাবে লক-আউট ঘোষণা করা হয়েছে নাগরাকাটা ব্লকের হিলা চা বাগানে। শ্রমিকদের অভিযোগ, রবিবার রাতে বাগান ছেড়ে চুপিসারে পালিয়ে যায় মালিকপক্ষ। সোমবার কাজে গিয়ে বাগানের কারখানার গেটে তালা ঝোলানো দেখতে পান শ্রমিকরা। এক সময় বাগানটি রাজ্য সরকারের অধীনে ছিল। বছর তিনেক আগে সেটি বেসরকারি কোম্পানির হাতে তুলে দেওয়া হয়। মালিকপক্ষের দাবি, শ্রমিকরা ঠিকমতো কাজ না করায় বাগানটি আর্থিক লোকসানের মধ্য দিয়ে চলছিল। এই বাগান বন্ধের ফলে কর্মহীন হয়ে পড়ল প্রায় ১০০০ শ্রমিক।

চা বাগান মালিকদের সর্বভারতীয় সংগঠন ইন্ডিয়ান টি প্ল্যান্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের উত্তরবঙ্গের উপদেষ্টা অমিতাংশু চক্রবর্তীর অভিযোগ, শ্রমিকদের যে ভাবে কাজ করার কথা তা তাঁরা করেন না। তিনি জানিয়েছেন, সাইলি বাগানের ক্ষেত্রে তাঁরা একাধিক বার শ্রম দফতরে ত্রিপাক্ষিক বৈঠক করে শ্রমিকদের কাছে কর্মসংস্কৃতি ফিরিয়ে আনার অনুরোধ করেছেন। তাতে কোনো লাভ হয়নি।

যদিও এই দাবি মেনে নিতে নারাজ শ্রমিকরা। সাইলি চা বাগানের শ্রমিক অনুপ প্রধান জানিয়েছেন, ২০১৬ সালের তুলনায় ২০১৭ সালে ২০% চা বেশি উৎপাদন হয়েছে এই বাগানে। সে ক্ষেত্রে মালিকপক্ষ শ্রমিকদের কাজ না করা নিয়ে যে অভিযোগ তুলেছে তা ভিত্তিহীন। হিলা চা বাগানের শ্রমিকরা জানিয়েছেন, আদতে এই শীতের সময় চা বাগানে পাতা তোলার কাজ তেমন থাকে না। প্রুনিং, আগাছা পরিষ্কার, নর্দমা সংস্কারের মতো কিছু কাজ থাকে। সেই কাজের জন্য যাতে স্থায়ী শ্রমিকদের বেতন না দিতে হয়, সে জন্যই শ্রমিকদের ওপর দায় চাপিয়ে বাগান বন্ধ করে দিয়েছে মালিকপক্ষ। শ্রমিক নেতারা একে হঠকারী সিদ্ধান্ত বলেছেন। শ্রমিকদের আরও অভিযোগ, এর আগেও ২০১৫ সালের ডিসেম্বর মাসে একই ভাবে বাগান বন্ধ করে চলে গিয়েছিল মালিকপক্ষ।

এ দিকে এই ঘটনা নিয়ে ইতিমধ্যেই শুরু হয়েছে রাজনৈতিক তরজা। তিন দিনের উত্তরবঙ্গ সফরে এ দিনই শিলিগুড়ি পৌঁছেছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সেখানে তিনি চা-শ্রমিকদের জন্য উন্নয়নের বার্তা দেন। যদিও বিরোধী দলের নেতাদের বক্তব্য, মুখে বললেও কাজের কাজ কিছুই করছে না সরকার। বামপন্থী শ্রমিক নেতা জিয়াউল আলম অভিযোগ জানিয়েছেন, মালিকপক্ষের জুলুমবাজিকে বারবার প্রশয় দিচ্ছে রাজ্য সরকার। শুধু এই দু’টি নয়, উত্তরবঙ্গের ছোটোবড়ো মিলিয়ে প্রায় কুড়িটি বাগান বন্ধ থাকলেও সেগুলি খোলার জন্য রাজ্য সরকারের কোনো উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না। তিনি জানিয়েছেন, যে ভাবে এই মরশুমে কিছু টাকা বাঁচানোর জন্য বাগানমালিকরা বিভিন্ন অজুহাত দেখিয়ে বাগান বন্ধ করে দিচ্ছেন তাতে আখেরে এই শিল্পেরই ক্ষতি হচ্ছে।

বিজেপির উত্তরবঙ্গের আহ্বায়ক রথীন্দ্রনাথ বোস অভিযোগ করেছেন, কেন্দ্র চাইলেও রাজ্য সরকার সহযোগিতা না করায় বাগানগুলো দুরবস্থা দূর করা যাচ্ছে না।

তবে এ সব অভিযোগ মানতে চায়নি শাসকদলের শ্রমিক সংগঠন। আইএনটিটিইউসি’র জেলা সভাপতি মিঠু মোহন্ত বলেছেন, বিরোধী শ্রমিক সংগঠনগুলি শুধুমাত্র রাজনৈতিক ফায়দা তোলার জন্য অবাস্তব অভিযোগ করছেন। রাজ্য সরকার শ্রমিকদের জন্য অনেক কাজ করছে বলে দাবি তাঁর। শাসকদলের এই শ্রমিক নেতা জানিয়েছেন, প্রশাসনের সহযোগিতায় দ্রুত ত্রিপাক্ষিক বৈঠক করে বাগান দু’টি খোলার ব্যবস্থা করা হবে। জেলা শ্রম দফতর সূত্রে খবর, আগামী ১৩ জানুয়ারি সাইলি চা বাগান নিয়ে শ্রমিক মালিক এবং শ্রম দফতরের ত্রিপাক্ষিক বৈঠক রয়েছে মালবাজারে অতিরিক্ত শ্রম আধিকারিকের দফতরে। যদিও হিলা বাগান খোলা নিয়ে কবে বৈঠক তা এখনও জানা যায়নি।

তবে এই সব রাজনৈতিক চাপানউতোর বোঝেন না দরিদ্র শ্রমিকরা। কাজ হারিয়ে তাঁরা এখন অথৈ জলে। দু’টি বাগানের শ্রমিকরাই দ্রুত বাগান খোলার দাবি জানিয়েছেন, অন্যথায় আন্দোলনে নামার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন শ্রমিকরা। আগামী ২৪ জানুয়ারি উত্তরকন্যা অভিযান করবে চা-শ্রমিকদের যৌথ মঞ্চ। সেখানে শুধু এ দু’টি নয়, উত্তরবঙ্গের সমস্ত বন্ধ চা বাগান খোলার দাবি অগ্রাধিকার পাবে, জানিয়েছে যৌথ মঞ্চ।

এক ক্লিকে মনের মানুষ,খবর অনলাইন পাত্রপাত্রীর খোঁজ

loading...

মতামত দিন

Please enter your comment!
Please enter your name here