শ্রীপঞ্চমীতে নানা দেশে নানা রূপে সরস্বতী আরাধনা

0
2779
saraswati puja
pankaj chattapadhyay
পঙ্কজ চট্টোপাধ্যায়

‘যা দেবী সর্বভূতেষু বিদ্যারূপেন সংস্থিতা – নমস্তস্যই, নমস্তস্যই, নমস্তস্যই, নমো নমো হঃ’ – চণ্ডীর রূপ যেখানে মহা সরস্বতী, সেই জ্ঞানদেবীকে প্রণাম জানিয়ে মার্কণ্ডেয় পুরাণের এই স্তোত্রমন্ত্র।

মাঘ মাসের শুক্ল পক্ষের পঞ্চমী তিথিতে দেবী সরস্বতীর শ্রীমূর্তির আরাধনা হয়। তাই ওই দিনটি বসন্তপঞ্চমী তথা শ্রীপঞ্চমী হিসাবে পরিচিত। সরস্বতী বৈদিক যুগের দেবী। তন্ত্রসাধনাতেও দেবী বাগেশ্বরী প্রাচীন কালে পূজিতা হতেন। দাক্ষিণাত্যের চোল বংশের রাজত্বকাল থেকে দেবী সরস্বতী পূজিতা। রাজস্থানেও দেবীর পূজা হয় বিরাট মহা সমারোহে। ভারতবর্ষের উত্তরে পঞ্জাবে বসন্তপঞ্চমী থেকে ‘বসন্ত্‌ পঞ্চমী’ উৎসবে দেবীর পূজা শুরু হয়। শেষ হয় বসন্ত উৎসব দোলে। মহারাষ্ট্র, গোয়া, হিমাচল প্রদেশেও ‘সরস্বতী-আবাহন’ দিয়ে মাঘ মাসের পঞ্চমী তিথি থেকে দেবীপূজা শুরু হয়। কর্নাটকে ‘মহীশুর দশেরা’ উৎসব নামে এই পূজা বিখ্যাত। ভক্তবৃন্দ দেবীর বিভিন্ন মূর্তি তৈরি করে আর এই প্রক্রিয়াটিকে বলা হয় ‘গোম্বে করিসাভুদু’। এই দিনে বাদ্যযন্ত্র, বই পুজো করা হয়। কেরলে দেবী সরস্বতীর পূজা হয় পঞ্চমী থেকে দশমী তিথি পর্যন্ত। তামিলনাড়ুতে ‘আয়ুধা’ পুজোর সঙ্গে সঙ্গে দেবী সরস্বতীর আরাধনা করা হয়। ওই দিন দেবীর কাছে বাদ্যযন্ত্র, বই এমনকি অস্ত্রাদিও পুজোর জন্য রাখা হয়। অন্ধ্রপ্রদেশে বসন্তপঞ্চমীতে সরস্বতী পুজোর নাম ‘পুজা ইদুপ্পু’। এই দিনেই বাংলার তথা ভারতের অন্যান্য জায়গার মতো এখানেও ছোটোদের হাতেখড়ি দেওয়া হয়। হাতেখড়ির এই প্রথাকে অন্ধ্রপ্রদেশে ‘ইজিথিনিরুথু’ আর প্রথম স্কুলে যাওয়ার প্রথাকে ‘বিদ্যারম্ভম’ বলা হয়।

উত্তর-দক্ষিণ-মধ্য ভারতের মতোও পূর্ব ভারতের বাংলা, বিহার, ওড়িশা, ত্রিপুরা, অসম, ঝাড়খণ্ডেও বিদ্যাদেবীর উপাসনা হয় ‘বসন্তপঞ্চমী’ বা ‘শ্রীপঞ্চমী’ নামে। দেবীর সামনে বই, লেখনী, বাদ্যযন্ত্র রেখে পূজা করা হয়। অবশ্যই পূজার উপকরণে থাকে বাসন্তী রঙের গাঁদা ফুল, অভ্র-আবির, মাটির দোয়াত, খাগের কলম, আমের মুকুল, যবের শিষ ইত্যাদি। নানা বয়সের সবাই মিলে এই পূজায় অংশগ্রহণ একটা বড়ো অঙ্গ। বিদ্যালয়, পাড়া, মহল্লা, বাড়িতে দেবী সারদার পূজা বাঙালি তথা ভারতবর্ষের অন্যতম এক পরম্পরা, যা প্রাচীনকাল থেকে বহমান।

বিজ্ঞাপন

সরস্বতী বন্দনা ভারতবর্ষের বাইরেও অত্যন্ত সুপ্রাচীন যুগ থেকে হয়ে আসছে। এশীয়-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে দেবী বিপুল প্রভাবে প্রতিষ্ঠাতা, সেই খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চম, চতুর্থ, তৃতীয় শতক থেকে। বৌদ্ধ ধর্মেও দেবীর প্রভাব বিদ্যমান। দেবী এখানে ‘বজ্র সরস্বতী’ হিসেবে আরাধিতা। আজ তিনি তিব্বতে এই নামে পূজিতা। মায়ানমারের প্রাচীন রাজধানী পাগানে বিভিন্ন প্রত্নলিপিতে দেবীর উল্লেখ পাওয়া যায়। বৌদ্ধ পুঁথি-গ্রন্থাদিতে সরস্বতী ‘দেবী থুরাথাড়ি’ রূপে অভিষিক্তা। সপ্তম ও অষ্টম শতাব্দীতে কম্বোডিয়ায় সরস্বতীকে দেবী ‘বাগীশ্বরী’ রূপে দেখা যায়। থাইল্যান্ডে তিনি বাক ও বিদ্যার দেবী ‘সুরতসরী’ রূপে আসীন। জাপানে সেই দ্বিতীয়-তৃতীয় শতাব্দী থেকে দেবীর আরাধনা হয়। সেখানে দেবীর নাম হল ‘বেন জাইতেন’। জাপানের টোকিও, কামাকুয়া, নাগোরার বহু মন্দিরে তাঁর মূর্তি পূজিত হয়। তাঁর হাতে জাপানের প্রাচীন বাদ্যযন্ত্র ‘বিবা’ রাখা আছে। চিন দেশে দেবী সরস্বতী ‘বিয়ান চাইতেং’ নামে পূজিতা। দক্ষিণ আফ্রিকার কিছু অঞ্চলে, ত্রিনিদাদ-টোবাগোয়ও সরস্বতী পূজা হয়। ইন্দোনেশিয়ার বালিতেও দেশে সরস্বতী দেবীর আরাধনা হয়। বৈদিক যুগের এই দেবী সুফি সমাজেও সমাদৃতা। সুফি সমাজে বসন্তপঞ্চমী উৎসব পালিত হয়, তা দেশেই হোক বা বিদেশেই হোক। দ্বাদশ শতাব্দীতে ‘চিশতি’ ধারার সুফি সন্ত নিজামুদ্দিন আউলিয়া বিশাদগ্রস্ত হলে তাঁর মন ভালো করতে বিখ্যাত কবি আমির খসরু এই বসন্তপঞ্চমীর দিনেই বাসন্তী রঙের পোশাক পরে অমর শায়েরি সৃষ্টি করে শুনিয়েছিলেন নিজামুদ্দিনকে। সামনে ছিল এক দেবী মূর্তি। সেই থেকে সুফি সমাজে এই উৎসবের শুরু।

এখানে প্রাসঙ্গিক ভাবে উল্লেখ্য, ভারত বিশেষজ্ঞ এইচ ডি গ্রিসওয়ার্ল্ড তাঁর ‘রিজিয়ন অফ দ্য রিগবেদা’ গ্রন্থে লিখেছেন — ‘হরপ্পা সভ্যতা তথা মানুষের আদি সভ্যতার ভরকেন্দ্র ছিল সরস্বতী নদী। এই নদীর তীরে বসেই সৃষ্টি হয় পৃথিবীর প্রথম জ্ঞান সমৃদ্ধ ঋগ্বেদের আদি স্তোত্রগুলি। তাই মানুষের আদি সভ্যতাই হল সরস্বতী সভ্যতা।

বিজ্ঞাপন
loading...

মতামত দিন

Please enter your comment!
Please enter your name here