ইতিহাস থেকে বর্তমান, বউবাজারের সোনামাখা পথে জেগে আছে কলকাতার মিষ্টান্ন বিলাস

0
1757
পায়েল সামন্ত

ভিড়ে ঠাসা মেট্রো, এখানে-ওখানে গজিয়ে ওঠা বহুতল আবাসন, রাস্তার মোড়ে মোড়ে রোল-মোমোর বাড়বাড়ন্ত— এটা কলকাতার চেনা ছবি। অথচ এ কলকাতার মধ্যেই লুকিয়ে আছে আরেক কলকাতা।

বহু পুরোনো আর সমৃদ্ধ এলাকা বউবাজার। সোনা দোকানের সারি ছেড়ে একটু ভেতরে আসুন। টানা রিকশা, পুরোনো বাড়ি, ছোটো অপরিসর গলি, একতলার অন্ধকার ঘরে খুপরি দোকান– এ সব দেখতে দেখতে হাঁটুন এ রাস্তায়। দেখবেন সামনে স্বর্গীয় কলকাতা, মিষ্টির কলকাতা, অনন্য কলকাতা। লালমোহনবাবু থাকলে বলতেন, বাঙালির কি সুগার হয় না?

সত্যিই ডায়াবেটিক শব্দটা আপনার ডিকশনারি থেকে মুছে যাবে এ তল্লাটে এলে। রাস্তার এপারে-ওপারে, ডাইনে-বাঁয়ে, এ গলি-ও গলি – সর্বত্র মিষ্টি আর মিষ্টি— কাঁচের বাক্সে ওই তো উঁকি মারছে রসগোল্লা, বোঁদে, মিহিদানা, গুজিয়া, ক্ষীরের চপ, চমচম, দই, দরবেশ, লাড্ডু, রসমালাই, হাজার রকমের সন্দেশ। সকাল-সন্ধে যখনই আসুন না কেন, মনে হবে কী মিষ্টি এ ….!

বিজ্ঞাপন

হাঁটছিলাম বহু পুরোনো রাস্তা নির্মল চন্দ্র স্ট্রিট ধরে। লাইন দিয়ে মিষ্টান্ন ভাণ্ডার। সবকটাই ডাকসাইটে প্রসিদ্ধ। জয়শ্রী, ভীম নাগ, নবকৃষ্ণ গুঁই, ভীমচন্দ্র মোদক। বাদ নেই তার থেকে একটু কম প্রসিদ্ধরাও— উদয় চন্দ্র ঘোষ, গুপ্তা স্ন্যাকস, আপনজন, পাল সুইটসও। আবার গলি ধরে এগোতেই হিদারাম ব্যানার্জি লেনে অন্নপূর্ণা মিষ্টান্ন ভাণ্ডার, আরেক নবকৃষ্ণ গুঁই। আরেকটু হাঁটলে ভূপতিচরণ রায়, রামপদ রায়, শ্রদ্ধাঞ্জলি। আরেকটু হাঁটলে জ্যোতির্ময় রায় ….। আরেকটু হাঁটলে …।

বহুদিন পর আবার এমন বিকেল দেখলাম, যে বিকেল ট্রামের ঘড়ঘড় শব্দ আর কচুরি, রাধাবল্লভী, সিঙ্গাড়ার গন্ধ মিলেমিশে এক হয়ে গিয়েছে। শেষ কবে এমন মোমো-হীন মুহূর্ত দেখেছি মনে পড়ে না। মোগলাই-চাউমিনে জর্জরিত খাদ্য সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এ রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে তাই নিজেকে বেশ বাঙালি বাঙালি মনে হচ্ছিল। কী আছে এ রাস্তায়? কী আছে ওই দোকানগুলোয়? দেড়শ, পৌনে দুশো বছরের পুরোনো দোকানগুলো তো জীবন্ত ইতিহাস।

ঘটনাচক্রে ফিরিঙ্গি কালিবাড়ির পুরোহিত অশোক ভট্টচার্যের সঙ্গে আলাপ জমে উঠল। শুনছিলাম এ অঞ্চলের গল্প। ভরপুর মাত্রায় বনেদি সুবর্ন বণিকের বাস এ তল্লাটে। তাঁরা মিষ্টি ছাড়া চলেন না। ঘুম থেকে উঠে ঠাকুরকে মিষ্টান্ন নিবেদন দিয়ে শুরু হয় তাঁদের মিষ্টি খাওয়ার পর্ব। রাত অবধি সেটাই চলে। আর বনেদি অঞ্চলের ঠাকুর-দেবতারা সে মিষ্টির আবহাওয়া থেকে বাদ পড়বেন কেন? কালি থেকে শীতলা বা রাধাকৃষ্ণ থেকে গৃহদেবতা তাই পার্বণের নৈবেদ্য থেকে নিত্যপুজোর গোলাকার চক্রে মিষ্টির স্বাদ পেয়ে থাকেন। জন্মাষ্টমীর বিকেলে চোখে পড়ল দোকানে দোকানে থরে থরে সাজানো মালপোয়া, তালের ফুলুরি, স্পেশাল সন্দেশ আর নাড়ুর অঢেল সম্ভার।

১৮৫ বছরের প্রাচীন দোকান নবকৃষ্ণ গুঁই-এর উৎপল দে বললেন, ‘অফিসপাড়া যখন ছিল, রমরমিয়ে চলত দোকানগুলো। এখন সেক্টর ফাইভের জন্য টেবিলের খদ্দের আর পাই না। তবে নিয়মিত খদ্দেরের জন্য কাউন্টার বিক্রি খারাপ হয় না।’

অবশ্য এখনও যে সমস্ত অফিস ফেরতারা হানা দেন, তাঁদের সংখ্যাটাও নেহাত কম না। এবিটিএ এর প্রফুল্ল আচার্য এখানে এসেছিলেন অফিস মিটিংয়ের জন্য গোটা পঞ্চাশেক প্যাকেট নিতে। তিনি জানালেন, বিদেশে নিয়ে যাওয়ার জন্য এখানকার মিষ্টির তুলনা নেই। প্রত্যেকটা দোকানের মিষ্টির আলাদা পরিচয়। নবকৃষ্ণ গুঁইয়ের বড় বোঁদে তো ভীম চন্দ্র মোদকের ক্ষীরের পুতুল। কড়া রসের মিষ্টিই নাকি এ তল্লাটে চলে। তাই পাত্তা পায় না জগৎ কাঁপানো স্পঞ্জ রসগোল্লার মতো ডাকসাইটে মিষ্টি। বেশিরভাগ ছানাই আসে তারকেশ্বর লাইন থেকে, অনেকে নিজেরা ছানা কাটিয়ে নেন। তারপর ছানার মুড়কি, সন্দেশ, আবার খাবো তৈরি হয়।

৬০ বছরের জয়শ্রীর বিকেলের রূপটা দেখার মতো। এই বয়সেও সে স্রেফ রাধাবল্লভী, নিমকি, ভেজিটেবিল চপ, খাস্তা কচুরি, হিঙের কচুরির ঢালাও বিক্রি দিয়ে পেছনে ফেলে দিতে পারে যে কোনও মোড়ের মোমো দোকানিকে। দু মিনিট দাঁড়িয়ে সেই অপূর্ব কচুরির শয্যাসঙ্গিনী আলুর তরকারির সুবাস নিন। মনে হবে, এ সেই শেঠ-বসাক-সাবর্ণদের কলকাতা। এখানের বাবুরা প্রাতঃরাশ থেকে নৈশভোজে এসবই আহার করেন।

আশেপাশের ওই অল্পখ্যাত দোকানগুলোরও যথেষ্ট বিক্রি নজরে পড়ার মতো। হিদারাম ব্যানার্জি লেনে আরেক স্বল্পখ্যাত নবকৃষ্ণ গুঁই রয়েছে। কাঁচের কেসে সেই রসগোল্লা, পান্তুয়া, সন্দেশের একই ছবি। স্বরূপ দে জানালেন, “খদ্দের এসবই পছন্দ করেন। গবেষণামূলক মিষ্টি আমাদের এখানে সেভাবে চলে কই? তবে ইদানীং নানারকম মিশেলে মিষ্টি খাওয়ার প্রবণতা বাড়ছে। তাই ক্যাডবেরি সন্দেশ বা প্যারাডাইস তৈরি করছি”।

যাদবপুরের অনিমা ঘোষ এ অঞ্চলে বাপের বাড়ির সূত্রে আসেন বটে তবে আসল টান যেন মিষ্টি। মিষ্টি কিনতে কিনতে তিনি স্পষ্ট বললেন, ‘যাদবপুরে এই স্বাদ কোথায়? দক্ষিণ কলকাতার ঝাঁ চকচকে দোকানের থেকে এসব সাবেকি দোকানই মানুষকে টানে বেশি।’

তবে ৯৩ বছরের ভূপতিচরণ রায়ের কর্ণধার রবীন্দ্রনাথ রায় এবং ১১৬ বছরের ভীমচন্দ্র মোদকের কারিগর খোকনচন্দ্র দে প্রায় একই সুরে দূষলেন এই প্রজন্মের পরিবর্তিত স্বাদকে। সত্যিই এখনকার বিকেলে কমে গিয়েছে এই তল্লাটের নোনতা খাওয়ার প্রবণতা। সেই হারে কচুরি, জিলিপি ভাজাও হয় না তাই। পাশাপাশি মিষ্টির দোকানের প্রচুর সমস্যার কথা জানালেন খোকনবাবু। কারিগরের অভাব, জিনিসের দাম বেড়ে যাওয়া থেকে শুরু করে হালফিলের জিএসটি সবই দীর্ঘশ্বাসের পরতে পরতে উঠে আসছিল যেন! অথচ একসময় এখানে কারিগর কত পাওয়া যেত!

হ্যাঁ, পুরোনো কারিগর এখানে বাজার ধরে রাখার আরেকটা কারণ। হাওড়া, হুগলি, বর্ধমানের বহু কারিগর এখানে প্রথম থেকেই বংশ পরম্পরায় রয়ে গিয়েছেন। ৩০-৪০ বছর ধরে তাঁরা এই অঞ্চলের মিষ্টি সাম্রাজ্যের বিশ্বস্ত সেনাপতির মতো দায়িত্ব পালন করেছেন। কিন্তু পরবর্তী প্রজন্ম আর মিষ্টি তৈরিতে জড়াতে চায় না। তাই আস্তে আস্তে যেন ক্ষয়ে আসছে মিষ্টির জগত।

ফ্ল্যাটের রাজত্ব থেকে অনেকটা দূরের এ তল্লাট ভুলিয়ে দেয় নাগরিক জীবনের গ্লানি। ইতিউতি চোখে পড়ে কয়েকজন জটলা করে তেলেভাজা কিনে খাচ্ছেন বা আড্ডায় মশগুল। তার মধ্যে সরু গলি, শ্যাওলা ধরা বাড়ি, খড়খড়ি দেওয়া দরজার পেছনে আটপৌরে মিষ্টির দোকান কখন যেন মনটা চুরি করে নিয়েছে।

হিদারাম ব্যানার্জি লেন, নটবর দত্ত রোড বা শশীভূষণ দে স্ট্রিটে অনেক ছোট বা মাঝারি দোকান আছে, আমরা কজন চিনি সে সব! কিন্তু চাই তারা টিকে থাক। অন্তত যতদিন বাঙালির পুজোআচ্চা, বিয়ে-অন্নপ্রাশন বা উপনয়নে লোক খাওয়ানোর রীতি থাকবে, এদের বিক্রিও থাকবে। তাঁদের সঙ্গে ঝাপসা চোখে জেগে থাকবে আরেক কলকাতা। মিষ্টির কলকাতা, বাঙালির সাবেক কলকাতা।

ছবি: লেখক 

বিজ্ঞাপন
loading...

মতামত দিন

Please enter your comment!
Please enter your name here