‘এক বার পাওয়ার জন্য বহু বিখ্যাত মানুষ তখন পাগল’, অকপট মিস শেফালি

0
461

papya_mitraপাপিয়া মিত্র:

এসে গেল বাৎসরিক উদযাপন, আন্তর্জাতিক নারী দিবস। এখন কয়েক দিন নারীর অধিকার, নারীর ক্ষমতায়ন ইত্যাদি নিয়ে সেমিনার, আলোচনাসভা হবে। কিন্তু আমি এমন এক জন নারীর কথা শোনাব, যিনি তাঁর সময়ের চেয়ে অনেক এগিয়ে ছিলেন।     

যশোর রোডে তাঁর এক চিলতে ফ্ল্যাটে বসে ক্যাবারে নৃত্যশিল্পী ও অভিনেত্রী মিস শেফালির কাছেই শুনছিলাম তাঁর জীবনযুদ্ধের কথা। অকপটে বলছিলেন সব কিছু। শুরু করলেন শৈশব থেকেই।

যখন সে আরতি…

আর পাঁচ জনের মতো সে-ও ছিল আদরের কন্যা। নাম, আরতি। কিন্তু আদরের সেই বালিকা, কিশোরী হওয়ার আগে বুঝতে শুরু করেছিল সুখের পথ থেকে মুখ ঘুরিয়ে নিয়েছে তাদের জীবন। ও-পার বাংলা থেকে ছোট্টো আরতি চলে এসেছিল এই বাংলায়। বাবা-মা আর ঠাকুমা’র হাত ধরে। নানা ঘাটের জল খেয়েছে আরতিরা, এমনকি রেললাইনের ধারেও থেকেছে। প্রথমে উঠেছিল উত্তর কলকাতার আহিরীটোলায়। পরে বাবা রামকৃষ্ণ দাসের বন্ধুর বাড়িতে। কলকাতায় জন্ম হল এক ভাইয়ের। সেই ভাইয়ের ‘দিদি’ আরতি কবে যে তার ‘মা’ হয়ে গিয়েছিল তা সে নিজেই জানতে পারেনি। এক নিরন্তর সংগ্রামের মধ্যে দিয়ে জীবনকে কোন পর্যায় নিয়ে গিয়েছিল সেই বালিকা থেকে কিশোরী হয়ে ওঠা আরতি, তার সাক্ষী শুধু সে সময়ের কলকাতা।

বছর ছয়েকের বালিকাটি বারবার ছুটে যেত আউট্রাম ঘাটে। ঘাট আর জল দেখতে দেখতে মনে পড়ে যেত পূর্ব বাংলার নারায়ণগঞ্জের কথা। সেখানে সমৃদ্ধি ছিল, আর এখানে দারিদ্র। চোখের সামনে দেখতে পেত সমবয়সিরা নানা খাবার খাচ্ছে, রকমারি ফ্রক পরছে, আরতিরও খুব ইচ্ছে করত ভালো পোশাক পরতে, ভালো খাবার খেতে। কিন্তু বাড়ি ফিরে ছোট্টো আরতি দেখত শুধুই দৈন্যতা। শোভাবাজারে এক ফলের দোকানে কাজ জুটেছে বাবার। অভাবের সংসারে বয়স গড়িয়ে যখন এগারোর ঘরে, তখন ওরা চলে এল নতুন বাসায়, উলটোডাঙায়। কিন্তু দারিদ্র সহ্য হয় না কিশোরী আরতির। সেখানকার এক দিদিকে দেখত প্রতি সন্ধ্যায় সেজেগুজে বেরিয়ে যেতে। সাহস করে আরতি সেই বাণীদিকে এক দিন বলেই ফেলল কাজের কথা। মায়ের (সুভাষিনীদেবী) মত নিয়ে খাওয়াপরার কাজে লেগে গেল চাঁদনিতে। এই চাঁদনিই কেমন করে যেন বদলে দিল আরতির জীবন।

ষাটের দশকে কি শিশুশ্রম-বিরোধী আন্দোলন ছিল? ভাগ্যিস ছিল না! তাই তো পেলাম এমন এক নৃত্যশিল্পীকে। যিনি পেটের জন্য, সংসার চালানোর জন্য বেশ্যাবৃত্তির পথ বেছে না নিয়ে হয়ে উঠলেন শিল্পী। তাঁর কথায়, “আমার রোজগারের টাকায় সংসার চলত। তাই আমি নানা প্রলোভন থেকে দূরে থাকতাম। নিজেকে কী ভাবে আরও ভালো করে তৈরি করব সেই চেষ্টায় থাকতাম।”

পরিচারিকা থেকে নৃত্যশিল্পী…

বাংলার কন্যা, বুদ্ধিমতী হতেই হবে। চাঁদনি চকের যে বাড়িতে পরিচারিকার কাজে লেগেছিল আরতি, সেটি ছিল এক অ্যাংলো ইন্ডিয়ানের বাড়ি। সেখানে প্রতি দিন সন্ধ্যায় নাচাগানা, খানাপিনা চলত। আর সেই সন্ধ্যাগুলোতে আরতির কাজ ছিল অতিথিদের কাছে কাছে স্ন্যাক্স পৌঁছে দেওয়া। ওদের কথা বুঝত না, কিন্তু আদবকায়দা সব দেখত, আর সেগুলো মনে মনে গেঁথে রাখত। বাড়িতে যখন কেউ থাকত না, তখন ওদের হিলজুতো পরে সেই সব নাচ প্র্যাকটিস করত আর সঙ্গে তাদের কাছ থেকে শোনা ইংরিজি আর হিন্দি বুলি রপ্ত করত। সেই বাড়িতেই কাজ করতে করতে শুনে ফেলল ‘রক অ্যান্ড রোল’, ‘রাম্বা সাম্বা’, ‘ট্যুইস্ট’, ‘ওয়ালস’, ‘হুলা’, ‘চা-চা-চা’, ‘ব্লুজ’, ‘জ্যাজ’ ইত্যাদি নাচের নাম। ওই বাড়ির পার্টিতে ভিভিয়ান হ্যান্ডসান আসতেন গান গাওয়ার জন্য। উনি মোকাম্বো রেস্তোরাঁয় গাইতেন। সুযোগ এসে গেল তাঁকে কিছু বলার। ভিভিয়ান এক দিন জিগগেস করলেন, “তুম ডান্স কর সকতে হো?” ভাঙা হিন্দিতে ইচ্ছে প্রকাশ করায় ভিভিয়ান তাকে জামাকাপড় গুছিয়ে ট্রামলাইনের ধারে দাঁড়াতে বললেন। কিন্তু দুর্ভাগ্য পিছু ছাড়ল না। পালাতে গিয়ে আরতি ধরা পড়ে গেল মালকিনের হাতে।

আরতিকে অবশ্য আটকে রাখা যায়নি। এই শহর জানে এক রাতে তার পালানোর কথা। ভিভিয়ানের সঙ্গে রাতের অন্ধকারে উঠল শান্তি নামে এক নেপালি মহিলার বাড়িতে। সেই এগারো বছরের অঙ্গে উঠল শাড়ি, চলল মেয়ে নাচতে। গ্র্যান্ডে নিয়ে গিয়েও ভিভিয়ান ফিরিয়ে নিয়ে গেলেন অন্য একটা জায়গায়, নাম ফিরপোজ। সেখানে কথা সেরে আরতির থাকার জায়গা হল গ্রেট ইস্টার্ন-এর পাশে বাংলো টাইপের এক বাড়িতে। বিশাল ঘরের আলোর ঝাড়ে, বাজনার সরঞ্জামে কিশোরী-বুকে তোলপাড় শুরু হল। ট্রেনিং চলল। “কয়েক দিনের মধ্যেই শুরু হল আমার পারফরম্যান্স, হাততালিতে ফেটে পড়ল ঘর। কী নাচ করেছিলাম মনে নেই। চাকরি পাকা হল। মাইনে হল সাতশো, আমি তখন হাওয়ায় উড়ছি।” উত্তেজনায় কাঁপছে আরতি। লাইসেন্সের জন্য লালবাজারে নিয়ে যাওয়া হলে শেখানো মিথ্যে কথায় ছাড়পত্র মিলল। সেখান থেকে ফেরার পথে মায়ের সঙ্গে দেখা করার সুযোগ হল। মা আর কলকাতার রাত ছাড়া সে দিন রাতে কেউ তার কান্না শোনেনি।

আরতি থেকে মিস শেফালি…

shefali-1সেই সময় মাত্র দশ-বারো জন অ্যাংলো ইন্ডিয়ান ডান্সার নাচছে ফিরপোজ ও গ্র্যান্ডে। বাঙালি মেয়ের কদর ছিল বেশি। কিন্তু হলে কী হবে? ফ্রি স্কুল স্ট্রিট থেকে যে পোশাকটি এল তার একটি হাত ও একটি পা নেই। “সেটি পরে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে কেঁদে ফেললাম। এক হাতে চোখ মুছে ভাবলাম, কাঁদছি কেন? আমার ওপর তো সংসারের দায়িত্ব। আমি তো ডান্সার!” তাই আরতি শিখতে লাগল কত্থক, ভারতনাট্যম, কথাকলি, ফোক-সহ ফ্লোর ডান্স। একটা করে নাচ দিত বলে খুব খারাপ লাগত তার। তৃপ্তি হত না তার। বিশ্রামের দিন ছিল সোমবার। তাই সুযোগ বুঝে এক সোমবার বস রামনাথ কপুরের কাছে দুঃখের কথা বলে ফেলল আরতি। বাংলো টাইপের বাড়িটার কোথাও বলল। বলল, ওই বড়ো ঘরটায় তার খুব ভয় করে। সব কথা শুনে রামনাথ ম্যানেজারকে বলে ২০ নম্বর সার্কাস অ্যাভিনিউয়ের ফ্ল্যাটটি দিলেন।

দিন বদলের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের রুচি কতটা বদলেছে তা নিয়ে আজও প্রশ্ন তোলা যায়। সেই সব মানুষ আজকের সমাজে কোথাও কোথাও হয়তো আছে। এই সমাজ এক দিন তাঁকে ‘বিষকন্যা’, ‘অচ্ছুতকন্যা’ ইত্যাদি নাম দিয়েছিল। এই সব ‘উপাধি’ পাওয়ার আগে আরও এক নাম এসেছিল জীবনে। ফিরপোজের ম্যানেজার মিস্টার ডেভিড ও এক কর্তা মিস্টার ভ্যালে নাম রাখলেন তাঁর ‘লিটিল ফ্লাওয়ার’, মিস শেফালি। আহিরীটোলা থেকে উলটোডাঙা, চাঁদনি চক থেকে ট্রামলাইন হয়ে লালবাজার, সেখান থেকে ফিরপোজ, গ্র্যান্ড। সেই আরতি যে নাচ শেখার বাসনায়, জীবনে কিছু করার তাগিদে রাতের অন্ধকারে মালকিনের বাড়ি থেকে পালিয়ে গিয়েছিল, সেই আরতি হোটেলের বার কাঁপিয়ে রাতের অতিথিদের ঘুম কেড়ে নিয়ে হলেন মিস শেফালি। পৌঁছে গেলেন খ্যাতির চূড়ায়। ষাটের দশকের গোড়ার দিক থেকে যে লড়াই তাঁকে চালাতে হয়েছিল তা মোটেই মসৃণ ছিল না তখনকার সমাজে – “সার্কাস অ্যাভিনিউয়ের ফ্ল্যাটে অনেকেই আসতেন নানা উপহার আর সম্পর্কের কথা পাড়তে। এমন কেউ ছিলেন না যে শেফালিকে চায়নি। আমার ফিগার, আমার বয়স, আমার স্কিন, আমার চুল ‑ একবার পাওয়ার জন্য বহু বিখ্যাত মানুষ তখন পাগল। আমার ছিল সাফ কথা – দেখছ দেখো, প্রাণ ভরে দেখো। কিন্তু ছুঁয়ে দেখার সাহস করো না, হাত বাড়িও না আমার দিকে।” (চলবে) 

এক ক্লিকে মনের মানুষ,খবর অনলাইন পাত্রপাত্রীর খোঁজ

loading...

মতামত দিন

Please enter your comment!
Please enter your name here