নীলাঞ্জন দত্ত

এবার গোহাটা বন্ধ। হালের বলদ বেচতে অবশ্য কোনও বাধা নেই, কাটার জন্য গরু কেনাবেচাই কেবল নিষিদ্ধ। কিন্তু হাটে নিয়ে যাওয়ার সময় প্রমাণ দিতে পারবেন, এই প্রাণীটিকে কপালে কী আছে? হাল টানা না জবাই হওয়া? কে হলফ করে বলবে, ক্রেতা কৃষক না কসাই? আধার কার্ড দেখলেই কী আদত পরিচয় পাওয়া যাবে? মাঝরাস্তায় গোরক্ষকরা (কবে থেকে যে ‘গৌরক্ষক’ হল জানি না – ‘গৌবৎস’ ‘গৌদুগ্ধ’ খায় বলে তো শুনিনি কোনওদিন) এসে যদি ধরেন, তাঁরা যা বলবেন তাই মেনে নিতে হবে। তারপর রাখলে রাখবেন, মারলে মানবেন।

কাগজে দেখলাম, বিজেপির সাধারণ সম্পাদক মুরলিধর রাও বলেছেন, “এই আইন ভারতীয় আত্মা ও সংস্কৃতির অনুরূপ (প্রতিরূপ বলতে চেয়েছেন কী?)। পশুধনকে মাংস হিসেবে দেখার বিকৃতি এর ফলে দূর হবে।”

গুরুগম্ভীর কথা সন্দেহ নেই। কিন্তু এই সব নেতারা বিনায়ক দামোদর সাভারকরের মূর্তিতে মালা দেওয়ার আগে বা পরে তাঁর রচনাবলী একটু উল্টেপাল্টে দেখলে ভাল করতেন। রাজনৈতিক হিন্দুত্ববাদের এই আদিপুরুষ সেই ১৯৩৫ সালেই লিখেছেন:

“…কোনও জিনিস তখনই খাদ্য হয়ে ওঠে যখন তা মানুষের পক্ষে ভাল। তার সঙ্গে ধর্মীয় গুণ যোগ করলে তা দেবত্বের পর্যায়ে উঠে যায়। এই ধরনের কুসংস্কারগ্রস্ত মানসিকতা জাতির বুদ্ধিবৃত্তিকে ধ্বংস করে। (সমগ্র সাভারকর বাঙ্ময়, ১৯৩৫, খণ্ড ২, পৃঃ ৫৫৯)

সাভারকর চেয়েছিলেন, “…ধর্মীয় কুসংস্কার না ছড়িয়ে, গোরক্ষা আন্দোলন সুস্পষ্ট এবং পরীক্ষামূলক অর্থনৈতিক ও বৈজ্ঞানিক নীতির ওপর প্রতিষ্ঠিত ও প্রচারিত হোক। তবেই আমরা আমেরিকানদের মত সত্যিকারের গোরক্ষা করতে পারবো। (সমগ্র সাভারকর বাঙ্ময়, ১৯৩৪, খণ্ড ৩, পৃঃ ১৭১)

সাভারকরে যদি প্রত্যয় না থাকে, স্বামী বিবেকানন্দর কথা শুনুন। ‘স্বামী-শিষ্য-সংবাদ’ থেকে একটা গল্প শোনা যাক। ১৮৯৭ সাল, ফেব্রুয়ারি মাসের শেষ সপ্তাহ। স্বামীজী সবে বিলেত থেকে ফিরেছেন। তিনি কলকাতার বাগবাজারে রাজবল্লভপাড়ার প্রিয়নাথ মুখোপাধ্যায়ের বাড়ি এসেছেন শুনে শিষ্যরা দলে দলে আসতে থাকলেন। আরও নানান জন এলেন নানান আবদার নিয়ে। তাঁদের মধ্যে ছিলেন “গোরক্ষিণী সভার জনৈক উদ্যোগী প্রচারক”। তিনি গোমাতার একটি ছবি স্বামীজিকে উপহার দিয়ে তাঁকে তাঁদের সভার উদ্দেশ্য বোঝাতে লাগলেন। বললেন, তাঁরা দেশের বিভিন্ন জায়গায় গোমাতাদের কসাইয়ের হাত থেকে বাঁচান। রুগ্ন, অকর্মণ্য এবং কসাইয়ের হাতে তুলে দেওয়া গরুদের পিঁজরাপোলে রেখে প্রতিপালন করেন।

স্বামীজিকে তিনি বললেন, “দয়াপরবশ হইয়া আপনাদের ন্যায় মহাপুরুষ যাহা কিছু দেন, তাহা দ্বারাই সভার ওই কার্য নির্বাহ হয়”। এই তথ্যও গোপন করলেন না যে, “মারোয়াড়ী বণিকসম্প্রদায়” তাঁদের “বিশেষ পৃষ্ঠপোষক” এবং তাঁরা “এই সৎকার্যে বহু অর্থ দিয়াছেন”।

সেই সময় মধ্য ভারতে দারুণ দুর্ভিক্ষ হয়ে গেছে। সরকারি হিসাবেই মারা গেছে ন’লক্ষ মানুষ। স্বামীজী জানতে চাইলেন, “আপনাদের সভা এই দুর্ভিক্ষকালে কোনো সাহায্যদানের আয়োজন করেছে কি?” প্রচারক বললেন, “আমরা দুর্ভিক্ষাদিতে সাহায্য করি না। কেবলমাত্র গোমাতাগণের রক্ষাকল্পেই এই সভা স্থাপিত।” স্বামীজী বিস্মিত হয়ে বললেন, “যে দুর্ভিক্ষে আপনাদের জাতভাই লক্ষ লক্ষ মানুষ মৃত্যুমুখে পতিত হল, সামর্থ্য সত্ত্বেও আপনারা এই ভীষণ দুর্দিনে তাদের অন্ন দিয়ে সাহায্য করা উচিত মনে করেননি?” প্রচারক জানালেন, না, কারণ লোকের পাপে এই দুর্ভিক্ষ হয়েছিল এবং তাদের কর্মফলেই তারা মরেছে।

শিষ্য বর্ণনা করেছেন, এই কথা  শুনে স্বামীজির মুখ লাল হয়ে গেল, চোখ দিয়ে যেন আগুন বেরোতে লাগল। তিনি সোজা বলে দিলেন, “যে সভা-সমিতি মানুষের প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করে না নিজের ভাই অনশনে মরছে দেখেও তার প্রাণরক্ষার জন্য এক মুষ্টি অন্ন না দিয়ে পশুপক্ষী রক্ষার জন্য রাশি রাশি অন্ন বিতরণ করে, তার সঙ্গে আমার কিছুমাত্র সহানুভূতি নেই; তার দ্বারা সমাজের বিশেষ কিছু উপকার হয় বলে আমার বিশ্বাস নেই।”

কর্মফলে মানুষ মরছে — স্বামীজির মতে এসব কথা বললে আর কোনও কিছুর জন্য কিছু করাই অর্থহীন হয়ে যায়। “আপনাদের পশুরক্ষার কাজটাও বাদ যায় না। ঐ কাজ সম্বন্ধেও বলা যেতে পারে — গোমাতারা নিজ নিজ কর্মফলেই কসাইদের হাতে যাচ্ছেন ও মরছেন, আমাদের ওতে কিছু করবার প্রয়োজন নেই।”

প্রচারক আমতা আমতা করে বললেন, হ্যাঁ, তা বটে, “কিন্তু শাস্ত্র বলে — গরু আমাদের মাতা”। এইবার বিবেকানন্দর বহুবিদিত বিদ্রূপের কষাঘাত নেমে এল: সহাস্যে তিনি মন্তব্য করলেন, “হাঁ, গরু আমাদের যে মা, তা আমি বিলক্ষণ বুঝেছি — তা না হলে এমন সব কৃতী সন্তান আর কে প্রসব করিবেন?” (স্বামী-শিষ্য-সংবাদ ১, স্বামী বিবেকানন্দ সমগ্র, খন্ড ৯)

বিধিসম্মত সতর্কীকরণ: “বীর সন্যাসী”-র গল্প শুনে অনুপ্রাণিত হয়ে গিয়ে বর্তমান সময়ে এর পুনরাবৃত্তি করতে চাইলে কিন্তু রিস্ক আপনার।

এক ক্লিকে মনের মানুষ,খবর অনলাইন পাত্রপাত্রীর খোঁজ

loading...

মতামত দিন

Please enter your comment!
Please enter your name here