ময়দান পেরিয়ে: ফিরে আসার গল্প

0
323

himadri-edited-1হিমাদ্রিশেখর সরকার:

অবিশ্বাস্য, অকল্পনীয়, দুর্দান্ত! নেইমারের ফ্রি-কিকটা জার্মান গোলকিপার ট্রাপকে টপকে প্রথম পোস্ট দিয়ে জালে জড়িয়ে যেতেই উঠে বসলাম। আজ অন্য রকম গন্ধ পাচ্ছি। সত্যি বলছি, ব্যাপারটা এ রকম হতে পারে কল্পনাও করিনি। রাউন্ড অফ সিক্সটিনের ড্র দেখে সবাই বেশ আমোদ করেই বলেছিল, পরের রাউন্ডের দলগুলো এখনই নির্বাচন করে ফেলা যায়। তবুও বার্সেলোনা–প্যারিস সাঁ জাঁয় নজর ছিল গোটা ফুটবলপ্রেমী বিশ্বের। থাকবে না-ই বা কেন? লাতিন আমেরিকান ফুটবলের আজকের দিনের মুখ বলতে যাদের চেনেন সবাই তো উপস্থিত। মেসি, নেইমার, সুয়ারেজ, কাভানি, ডিমারিয়া, তিয়াগো সিলভা – কাকে চাই ? প্রেমদিবসের রাতে প্রেমের শহর প্যারিসে মুখোমুখি হল দুই দল এবং সবাইকে অবাক করে ৪-০ গোলে ম্যাচটা ছিনিয়ে নেয় ডি মারিয়া, ড্র্যাক্সলাররা। রাবিওত, মাতুইডি, ভেরাত্তিদের লড়াই সবাইকে বিস্মিত করে। স্বয়ং আন্দ্রে পিরলো নিজে ভেরাত্তিকে প্রশংসা করেন ইতালির ফুটবলের ভবিষ্যৎ বলে।

psg-beats-barcelona

এখনও অবধি কোনো দল যে ব্যবধান ঘুচিয়ে পরের রাউন্ডে যেতে পারেনি। সমীকরণ দাঁড়াল বেশ কঠিন। জেতার জন্য চাই ৫-০ জয় বা ৪-০ জয় এনে দিতে পারে আরও ৩০ মিনিট লড়াই করার সুযোগ। বিশ্বের ভয়ঙ্করতম আক্রমণত্রয়ী সেই লড়াইয়ে দলকে ফেরাতে পারে কিনা সেটাই দেখার ছিল।  হ্যাঁ, বার্সেলোনা পেরেছে। ৬-১ এ যখন ম্যাচ শেষ হল তখন প্যারিসের আইফেল টাওয়ার শুধু বিবর্ণই নয়, বিভ্রান্তও বটে।

 

ফেসবুক, টুইটারে উচ্ছ্বাস, ‘বিশ্বের শ্রেষ্ঠ প্রত্যাবর্তন’, সত্যি কি তাই ? চলুন তা হলে একটু স্মৃতিচারণ করে আসি।

লিভারপুল ৩ – মিলান ৩ চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ফাইনাল, ২০০৫

২০০৫-এর চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ফাইনালের এই ম্যাচটা ফুটবলপ্রেমীরা মিরাক‍্যল অফ ইস্তানবুল নামেই চেনেন। ম্যাচের শুরু থেকেই মিলান ছিল ফেভারিট। ডিডা, মালদিনি, নেস্তা, স্ট্যাম, কাফু, গাতুসো, পিরলো, রুই কোস্তা, কাকা, শেভচেঙ্কো ছিল টুর্নামেন্টের অন্যতম সেরা দল। প্রথমার্ধে ৩ গোলে এগিয়ে যায় মিলান। বিরতির পর ৫৪ মিনিটের মাথায় রিসের একটা নির্বিষ ক্রসে হেড দিয়ে গোল করল জেরার্ড। সেখান থেকে মাত্র ৬ মিনিটের ব্যবধানে ৩ গোল শোধ করে জেরার্ড, আলন্সো, স্মিসাররা। লিভারপুল গোলকিপার জের্জি ডুডেক, শেভচেঙ্কোর ডাবল স্ট্রাইক বাঁচিয়ে দলকে পেনাল্টি শুটআউটে নিয়ে যায় এবং সেখানে দু’টি পেনাল্টি সেভ করে দলকে চ্যাম্পিয়ান করে।

আরও পড়ুন: ময়দান পেরিয়ে: দুনিয়া জুড়ে ডার্বির রংমশাল

বার্সেলোনার মত দুর্দান্ত দল লিভারপুলের ছিল না। ছিল না নতুন করে ফিরে আসার সুযোগ। হাতে সময় ছিল মাত্র ৪৫ মিনিট এবং সঙ্গে ফাইনাল খেলার চাপ। কিন্তু সে দিন লিভারপুল সেই সব কিছুকে ছাপিয়ে যে কীর্তি স্থাপন করেছিল তা মিরাক‍্যলই বটে। ৬৫০০০ হাজার দর্শকে ঠাসা ইস্তানবুলের আতাতুর্ক স্টেডিয়াম সাক্ষী হয়ে থাকল ফুটবলের এই বিরল ইতিহাসের।

 

ডেপার্তিভো লা’কারুনা ৪ – মিলান ১,  চ্যাম্পিয়ন্স লিগ দ্বিতীয় লেগ কোয়ার্টার ফাইনাল,২০০৪

কোয়ার্টার ফাইনালের প্রথম লেগে সানশিরোতে খেলা শেষ হল ৪-১ গোলে। মিলানের আগুন ঝরানো টিম। ডিফেন্সে নেস্তা, মালদিনি, কাফুর মতো মহারথী, মাঝমাঠে পিরলো, সার্জিনহো, গাতুসো, সিডর্ফ, আক্রমণ ভাগে শেভচেঙ্কো, ইনজাঘি, টমাসনের মত তারকারা। রিয়াজোরের ফিরতি লেগ মোটামুটি নিয়মরক্ষার ম্যাচ হয়ে দাঁড়িয়েছে। স্পেনের মিডিয়াও নিশ্চিত আসন্ন পরাজয় সম্পর্কে। বাজির দর উঠতে শুরু হয়েছিল কতটা লজ্জাজনক হবে এই লেগের রেজাল্ট, তাই নিয়ে। কিন্তু, সে দিন ভাগ্য এবং জেদ দু’টোই এগিয়ে দেয় ডেপার্তিভোকে। বিশ্বাস করুন লিখতে বসে আমিও নামগুলো একবারে মনে আনতে পারিনি। উলটো দিকের টিমটার সামনে সে দিন ডেপার্তিভো ছিল নিতান্তই ডেভিড। টমাসনের সহজ সুযোগ মিস, তার পর আগের লেগের মতোই পান্দিয়ানির গোল দিয়ে ম্যাচ শুরু। ভিক্টর-ভালেরনের অসাধারণ যুগলবন্দি, ভালেরনের গোল এবং ম্যাচের শেষ ভাগে আলবার্ট লুকুর গোল। সংখ্যার হিসেবে এতেই ডেপার্তিভো পরের রাউন্ডে চলে যেতে পারত। কিন্তু তাতে যে গোলিয়াথ বধ হত না যে। ফ্রান কফিনের সেই শেষ পেরেকটি পোঁতে।
সে বছরের চ্যাম্পিয়ন্স লিগে এটাই ছিল সব থেকে বড় দুর্ঘটনা’। কিন্তু ‘দুর্ঘটনা’ শব্দটা হয়ত ম্যাচটার তাৎপর্য বা গভীরতা ব্যক্ত করতে পারল না।

 

আরও অনেকগুলো প্রত্যাবর্তনের কথাই মনে আসছে, যেমন ধরুন ২০১২ লিগ কাপে রিডিং এর বিরুদ্ধে আর্সেনালের ৫-৭ জয়। কিংবা, আর্সেনালের বিরুদ্ধে নিউক্যাসেল ইউনাইটেডের ৪-৪। ১৯৬৬-এর ইউসেবিওর কথা জানেন তো ? কোয়ার্টার ফাইনালে ৩-০ পিছিয়ে থেকে উত্তর কোরিয়ার বিরুদ্ধে ৫-৩ ছিনিয়ে এনেছিলেন পর্তুগালের কালোচিতা।

eusebio

 

আরেকটু পিছোব ? ১৯৫৪ সাল। বার্নের মাঠে পুসকাসের হাঙ্গেরি বনাম ওয়াল্টারের পশ্চিম জার্মানি মুখোমুখি হল বিশ্বকাপ ফাইনালে। খেলা শুরুর ৮ মিনিটের মধ্যে দু’গোল। তার প্রথমটি পুসকাস, পরেরটি জার্মান গোলকিপার  টনি টুরেকের মুহূর্তের গাফিলতিতে স্‌জাইবর (উচ্চারণটি সাইবর)। এর পর বাকি ম্যাচে টনিকে ১৩ বার চেষ্টা করেও আর পরাস্ত করতে পারেনি পুসকাসের বাহিনী। মর্লক ও রানের জোড়া গোলে কাপ জিতে নেয় পশ্চিম জার্মানি।

Ferenc-Puskas

উপরের ঘটনাগুলোর অনলাইন লিঙ্ক ইউটিউবে ভীষণ ভাবেই সহজলভ্য, তাই সেগুলো না হয় উৎসাহী পাঠকদের জন্যেই রইল।

আরও পড়ুন: ময়দান পেরিয়ে: ইডেনে অহংকারের লড়াইয়ে ভাজ্জির ম্যাজিক

আরও অনেক গল্প করব ভেবেছিলাম, শেষ করা গেল না। কারণ, ফুটবলের ইতিহাসে এরকম ঘুরে  দাঁড়ানোর গল্প অজস্র। তাই কোনটা শ্রেষ্ঠ, কোনটা নয় সেই তর্কে না গিয়ে কিছু বিখ্যাত ম্যাচের গল্পই করে গেলাম। আগামী কোনও পর্বে আবার এই নিয়ে আলোচনা করা যাবে। ততদিনে না হয় আপনারাও খুঁজে বের করে ফেলুন এরকম রোমহর্ষক জয়গাথার একটা লিস্ট। 

এক ক্লিকে মনের মানুষ,খবর অনলাইন পাত্রপাত্রীর খোঁজ

loading...

মতামত দিন

Please enter your comment!
Please enter your name here