কোরআন পাঠে, নমাজের আহ্বানে রয়েছে সুর ও কবিতার ছন্দ

0
358

গালিব ইসলাম

এই লোকবাদ্য যন্ত্রটির নাম রবাব। একটি কাগজে এই বাদ্যযন্ত্রটিকে উনিশ শতকের শেষ দিকে আলজিরিয়া-মরক্কোয় প্রচলিত ছিল বলে উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু আমার যতদূর ধারণা, প্রাক-ইসলাম এবং ইসলামি যুগে আরবে এই রবাব বাদ্যযন্ত্রটি খুবই জনপ্রিয় লোকবাদ্য হিসেবে বহুলপ্রচলিত ছিল।

রবাবের সুর খুবই প্রিয় ছিল নবী হজরত মুহাম্মদের। তা ছাড়া, রাষ্ট্রীয় কাজ ছাড়াও জনগণের বিনোদনমূলক অনুষ্ঠানে, নৃত্যগীত ও কবিতাপাঠ প্রতিযোগিতা-সহ আরবীয় সামাজিক অনুষ্ঠানে গানবাজনা একটি প্রচলিত বিনোদন ছিল।

ইসলাম কেন, কোনো ধর্মেই সুর নিষিদ্ধ ছিল না। আজান দিয়ে নমাজে আহ্বান করা হয়। সেটি কী? বিশুদ্ধ সাংগীতিক আহ্বান। সকাল, দুপুর, সন্ধ্যার বিভিন্ন রাগ সন্নিবিষ্ট রয়েছে। ভোরের ‘আসসালাতো খয়রুম মিনান নৌম’, এই বন্দেশটি তো ভৈরবীতেই বাঁধা। যখন প্রার্থনায় আহ্বানের প্রয়োজন দেখা দিয়েছিল, তখন হজরত নবী অনেকের মতামত নিয়েছিলেন। পরে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় নবী বলেছিলেন, “আমি স্বপ্নে দেখেছি একটা বাঁশি।” সিদ্ধান্ত হয় সুরের মধ্য দিয়ে নমাজে ডাকা হবে।

আরও পড়ুন: মৌলবাদীদের ফতোয়া উপেক্ষা করে গান চালিয়ে যাওয়ার সংকল্প অসমের নাহিদের

একটু যদি ভাবি, দেখব, বাঁশি আরব-জাতির জনজীবনের প্রচলিত বাদ্যযন্ত্র ছিল না। আরবে নয়, বাঁশি ছিল ভারতের বহুল প্রচলিত বাদ্যযন্ত্র। হিন্দু ধর্মীয় মিথে অবতার শ্রীকৃষ্ণের ঠোঁটে বিরাজ করে। হজরতের পক্ষে এটা জানার সুযোগ হয়েছিল, তার কারণ ভারতের সঙ্গে আরবের বাণিজ্য-সম্পর্ক। আরব তখন বাণিজ্যে অগ্রণী একটি দেশ আর হজরত নবী নিজে ছিলেন খাদিজা নাম্নী এক অসামান্যা ব্যবসায়ীর সিইও।

হজরত যখন বিজয়ের পর মক্কাধামে প্রবেশ করেন, তখন তাঁকে যে গণ-সংবর্ধনা দেওয়া হয়েছিল, সেখানে তাঁর এই প্রিয়বাদ্য যন্ত্র রবাব ছিল।

এখানে উল্লেখ্য, প্রতিটি জনগোষ্ঠীর নৃতাত্ত্বিক বিভিন্নতার মধ্যেও রয়ে গেছে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অভিন্নতা।

আর একটি কথা না বললেও চলে তা হল, আরবীয় ট্রাইবাল সমাজই ছিল ইসলামের আবির্ভাবের মূল ভিত। আরব জাতির ইতিহাসের প্রাচীনতা ফুঁ দিয়ে ওড়ানো যায় না। ভারতের যে প্রাচীন জনগোষ্ঠীর অন্যতম আদিবাসী, তাদের ইতিহাস, কিংবা হরপ্পা-মহেঞ্জোদরোর ইতিহাস, প্রত্যেক জায়গায় আমরা দেখি সমাজের কৃষিভিত্তি ও সাম্যযাপন। এ সব প্রাক সামন্ততান্ত্রিক অথবা ভুমিস্বার্থের সঙ্গে শ্রমশক্তির সরল সমীকরণের ভেতর সামাজিক মেধার বিকাশও স্বাভাবিক ছিল।

তাই ভারতের সভ্যতা উন্নতও। সব সভ্যতাই সমাজের ক্রমবিকাশের ঊর্ধ্বমুখ হিসেবেই চিহ্নিত। এই সমাজ কারওরই, এমনকি, কোনো একক ব্যক্তির অবদান নয়। সমাজই ব্যক্তির মধ্যে পারসোনিফিকেশন ঘটায়। আর সেই ব্যক্তি হজরত নবি মহম্মদ হলে তিনি যদি বলেন, “আমি তোমাদের মতোই এক জন মানুষ”, তখন তিনি দেবত্বের আড়াল থেকে এক দিকে কৃষি ও অন্য দিকে রুক্ষ মরুর সমন্বিত সংস্কৃতির প্রতীক হয়ে ওঠেন।


জাতিগত বৈশিষ্ট্যের কারণেই সুর ও নুরের চর্চার মেলবন্ধন ঘটাতে পেরেছিল আরব। তাই কোরআন পাঠে সুর, নমাজের আহ্বানে আবশ্যিক ভাবে রয়ে গিয়েছে সুর ও কবিতার অনন্য ছন্দের অখণ্ডতা।


তাই সেই সময়ের বিনোদনের সব চেয়ে বড়ো মাধ্যম ছিল কবিতাপাঠ প্রতিযোগিতা। মেলা, পরবর্তীতে যা হজব্রত অনুষ্ঠান, যেখানে ব্যবসাবাণিজ্যই ছিল মুখ্য ব্যাপার।

আর তাকেই কেন্দ্র করে ছিল সাংস্কৃতিক বিনোদন। প্রত্যেক গোষ্ঠীর এক জন করে কবি থাকত। সুতরাং কবিতা ছিল আর ছিল নৃত্য ও সুরের বৈভব।

আরবীয় জীবনে সামন্ততান্ত্রিক কেন্দ্রিকতাই সুর ও শিল্পকলার বিরুদ্ধতার কারণ। বিশেষত সাংস্কৃতিক স্থিতিকে আঘাত করেছিল যুদ্ধ।

ইসলামের সব চেয়ে সম্মানিত গ্রন্থ কোরআন শরিফ চোদ্দোটি সুরে পড়ার কৌশল শেখার জন্য কবি ও অঙ্কবিদ ওমর খৈয়ামের কাছে গিয়ে পাঠ নিতেন বিশ্ববন্দিত রক্ষণশীল দর্শনিক ইমাম গাজ্জালি, যিনি গ্রিক দর্শন, বিশেষত সক্রেটিস অ্যারিস্টটল প্লেটোদের দর্শন আরবিতে অনুবাদ করেন। ইউরোপ উন্নত গ্রিক দর্শনের সংস্পর্শে আসে আরবীয় পণ্ডিতদের মাধ্যমে। এবং আরবের কৃষি ও পেটি-বুর্জোয়া পুঁজির সমন্বয় দেখা গিয়েছিল তাদের বাণিজ্যনীতির মধ্যে।

জাতিগত বৈশিষ্ট্যের কারণেই সুর ও নুরের চর্চার মেলবন্ধন ঘটাতে পেরেছিল আরব। তাই কোরআন পাঠে সুর, নমাজের আহ্বানে আবশ্যিক ভাবে রয়ে গিয়েছে সুর ও কবিতার অনন্য ছন্দের অখণ্ডতা।

এক ক্লিকে মনের মানুষ,খবর অনলাইন পাত্রপাত্রীর খোঁজ

loading...

মতামত দিন

Please enter your comment!
Please enter your name here