মকরের উৎসবেই প্রমাণ ভারতের মূল মন্ত্র ‘বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্য’

0
4501
makar sankranti
শম্ভু সেন

সাধুসন্ত, পুণ্যকামী মানুষজন ভিড় জমাতে শুরু করেছেন গঙ্গাসাগরে। আর দিন চারেক। আগামী রবিবার মকর সংক্রান্তি। মতান্তরে সোমবার। রবি বা সোম, যা-ই হোক, মকর সংক্রান্তির প্রস্তুতি শুরু হয়ে গয়েছে। সাধুসন্তরা চলেছেন সাগরসঙ্গমে পুণ্যস্নানে। শুধু গঙ্গাসাগর কেন, কলকাতা, হরিদ্বার, প্রয়াগ, বারাণসী-সহ গঙ্গাতীরবর্তী সব শহরেই চলবে এই স্নান। লাখ লাখ মানুষ গঙ্গাস্নান করে পুণ্য অর্জন করবেন। মকর সংক্রান্তিতে নাকি ‘গঙ্গাস্নান’ করতে হয়, ব্রাহ্মণ্যতন্ত্রের এই বিধান। কিন্তু যেখানে গঙ্গা নেই, সেখানে? সেখানকার মানুষ কি এই পুণ্য থেকে বঞ্চিত থাকবেন? না, তাঁদেরও উপায় আছে। নিয়ম আছে, নিয়মের ব্যতিক্রমও আছে। ব্রাহ্মণ্যতন্ত্রেরই বিধান, গঙ্গা নেই তো কী! স্থানীয় যে কোনো নদী, খাল এমনকি জলাশয়কে গঙ্গা ভেবে নিয়ে ডুব দাও। পুণ্যার্জন হয়ে যাবে। তাই ডুব দে রে মন গঙ্গা বলে।

মকর সংক্রান্তি কী? সাধারণত ১৪ জানুয়ারি বা তার আশেপাশের কোনো একটি দিনে এই তিথি আসে। বঙ্গাব্দ অনুসারে পৌষ মাসের শেষ দিনটিতে মকর সংক্রান্তি পালিত হয়। রাশিচক্রের বিচারে সূর্য এই তিথিটিতে মকর রাশিতে প্রবেশ করে। আসলে এই দিনটির সঙ্গে আরও অনেক কিছু জড়িয়ে আছে। এই সময়েই ঘরে ঘরে নতুন ফসল ওঠে। এই সময় থেকেই সূর্যের উত্তরায়ণ শুরু হয়। শীতের জড়তা কাটতে শুরু করে।

patisapta in poush parbon
পৌষ পার্বণের পাটিসাপটা।

দেশ জুড়ে নানা ভাবে নানা নামে মকর সংক্রান্তি উৎসব পালিত হয়। আরাধনা করা হয় কোথাও লক্ষ্মীর, কোথাও বা সূর্যের, কোথাও বা পূজিত হন সরস্বতী। কিন্তু পূজা বা প্রসাদের উপকরণ মূলত এক – নতুন ফসল। আমাদের এই পশ্চিমবঙ্গে এই উৎসব পৌষ সংক্রান্তি, পৌষপার্বণ বা নবান্ন। তামিলনাড়ুতে এই উৎসব ‘পোঙ্গল’ নামে পরিচিত। কর্নাটকে একে ‘মকর সংক্রমনা’ বা ‘ইল্লু বিল্লা’ বলা হয়। অন্ধ্রে আর কেরলে এই উৎসব মকর সংক্রান্তি নামেই পরিচিত। রাজস্থান ও গুজরাতে এই উৎসবের নাম ‘উত্তরায়ণ’, মহারাষ্ট্রে ‘তিলগুল’, মধ্যপ্রদেশে সুকরাত, কাশ্মীরে শায়েন-ক্রাত। উত্তর ভারতের পঞ্জাব, হরিয়ানা, হিমাচল, জম্মুতে এই উৎসব ‘লোহরি’ নামে চালু। ‘মাঘী’ উৎসবও বলা হয়। বিহার, উত্তরপ্রদেশ ও ঝাড়খণ্ডের বিভিন্ন জায়গায় এই উৎসব ‘খিচড়ি পরব’। পূর্ব ভারতের অসমে এই উৎসবের পরিচিতি ‘ভোগালি বিহু’ নামে।

বাঙালির কাছে এই উৎসব মূলত নতুন ফসলের। গ্রামবাংলার ঘরে ঘরে ওঠে নতুন ধান, নতুন অন্ন। তাই এই উৎসব বাঙালির কাছে ‘নবান্ন’। পৌষ সংক্রান্তি শস্যোৎসব। খেতের পাকা ধান প্রথম ঘরে ওঠা উপলক্ষে পালিত হয় এই উৎসব। পাকা ধানের শিষ এনে নির্দিষ্ট কিছু আচার-অনুষ্ঠান পালন করা হয়। দু’-তিনটি খড় এক সঙ্গে লম্বা করে পাকিয়ে তার সঙ্গে ধানের শিষ, মুলোর ফুল, সরষে ফুল, আমপাতা ইত্যাদি বেঁধে ‘আউনি বাউনি’ তৈরি করা হয়। এই ‘আউনি বাউনি’ ধানের গোলা, খড়ের চাল, ঢেঁকি, বাক্স-প্যাঁটরায় গুঁজে দেওয়া হয়।

বাংলায় পৌষপার্বণের প্রধান অঙ্গ হল পিঠে খাওয়া। এই সময়ে নতুন ধানের পাশাপাশি বাংলার গ্রামে গ্রামে খেজুর গাছে রস আসে, তৈরি হয় নতুন গুড়, খেজুর গুড়। তাই নতুন চালের গুঁড়ো, নতুন গুড়, নারকেল আর দুধ দিয়ে তৈরি করা হয় নানা ধরনের পিঠে। তাই পৌষপার্বণের আরেক নাম পিঠেপার্বণ।

অসমেও এই সময়টা নতুন ধানের। তাই ‘ভোগালি বিহু’তে যেমন আছে উপবাস, তেমনই আছে ভোজ, অবশ্যই যার প্রধান অঙ্গ নতুন ধান।

বাংলাদেশে, বিশেষ করে ঢাকায়, পৌষ সংক্রান্তির দিন পালিত হয় সাকরাইন উৎসব। এ দিন শহরের বিভিন্ন এলাকায় ঘুড়ি ওড়ানো হয়। অবশ্য দুই বাংলার বহু জায়গাতেই পৌষ সংক্রান্তির দিন ঘুড়ি ওড়ানোর রেওয়াজ আছে।

kite festival in uttarayan
উত্তরায়ণে ঘুড়ি উৎসব।

ঘুড়ি ওড়ানো কিন্তু গুজরাতে মকর উৎসবের একটা প্রধান অঙ্গ। এখানে এই উৎসবের নাম ‘উত্তরায়ণ’। এই উৎসবের ব্যাপক ধুম। এই উৎসব আদতে সূর্যদেবের আরাধনা। মানুষ ঘুড়িকে প্রতীক হিসাবে ব্যবহার করে সূর্যদেবতার কাছে নিজেদের আকুতি পৌঁছে দেয়। গুজরাতে ‘উত্তরায়ণ’ উপলক্ষে দু’দিন ছুটি থাকে। রাজ্যের বিভিন্ন শহরে আন্তর্জাতিক ঘুড়ি প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়।

তামিলনাড়ুর পোঙ্গল উৎসবেও সূর্যের আরাধনা করা হয়। কৃষিকাজে শক্তি সরবরাহ করেন সূর্যদেব। তাই তাঁর আরাধনা। চার দিনের উৎসব। গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার অনুসারে কখনও ১৩ জানুয়ারি থেকে ১৬ জানুয়ারি কখনও বা ১৪ থেকে ১৭ জানুয়ারি পর্যন্ত এই উৎসব চলে। আসলে তামিল মাস মারগাঝির শেষ দিন থেকে পরের মাস থাই-এর তৃতীয় দিন, এই চার দিন ধরে চলে উৎসব। তামিল ক্যালেন্ডারের দশম মাস ‘থাই’। আর ‘পোঙ্গল’ মানে উৎসব। অবশ্য ‘পোঙ্গল’ শব্দের যথাযথ অর্থ হল ‘প্রাচুর্য’ বা ‘উপচে পড়া’। ‘পোঙ্গল’ একটি খাওয়ার পদও — চাল, মুগ ডাল, দুধ, ছোট এলাচ, কিসমিস, তালের গুড় দিয়ে তৈরি মিষ্টি পদ। সুসজ্জিত রঙিন মাটির পাত্রে সূর্যালোকে খোলা উঠোনে ‘পোঙ্গল’ তৈরি করে সূর্যকে নিবেদন করে ওই দিন খাওয়া হয়।

চারদিনব্যাপী উৎসবের প্রথম দিনকে বলা হয় ‘ভোগী’। পঞ্জাবের ‘লোহরি’ বা অসমের ‘ভোগালি বিহুর’ মতোই ওই দিন ভোরে কাঠকুটো জড়ো করে আগুন জ্বালিয়ে সেই আগুনে পুরোনো বাতিল জিনিসপত্র আহুতি দেওয়া হয়। জীর্ণ পুরোনোকে বিসর্জন দিয়ে নতুনকে আহ্বান। বাড়ি রঙ করা হয়, সাজানো হয়। অন্ধ্রেও এই দিন ওই উৎসব পালন করা হয়, নাম ‘ভোগী পাল্লু’।

দ্বিতীয় দিন পালিত হয় মূল উৎসব ‘থাই পোঙ্গল’। ওই দিন একটি পাত্রে দুধ ফোটানো হয়। দুধ যখন উথলে ওঠে তখন তাতে নতুন চাল ও অন্যান্য সামগ্রী দেওয়া হয়। সবাই তখন শাঁখ বাজিয়ে ‘পোঙ্গালো পোঙ্গল’ বলে চিৎকার করে ওঠে। সবাই বলে ওঠে ‘থাই পিরান্ধাল ভাড়ি পিরাক্কুম’ (থাই মাসের সূচনায় নতুন সুযোগসুবিধার পথ প্রশস্ত হোক)। এ বার বড়া, মুরুক্কু আর পায়সমের সঙ্গে সেই ‘পোঙ্গল’ পদ বিতরণ করা হয়। কলাপাতা আর আম্রপল্লব দিয়ে ঘরদোর সাজানো হয়। কোলম তথা আলপনা আঁকা হয় প্রতিটি বাড়িতে।

pongal
পোঙ্গল।

তৃতীয় দিন পালিত হয় ‘মাতু পোঙ্গল’। এই দিনে স্নান করে ঘরের গবাদি পশুদের মালা পরানো হয়। শিং আঁকা হয়, মাথায় সিঁদুর, তেল, কুমকুম পরানো হয়। খাওয়ানো হয় পোঙ্গল, তালের গুড়, মধু আর কলা। সন্ধ্যায় গণেশের পূজা করা হয়। এই দিনেই রাজ্যের ঐতিহ্যবাহী ‘জাল্লিক্কাট্টু’ তথা ষাঁড়-মানুষে লড়াই হয়।

শেষ দিনে ‘কানুম পোঙ্গল’। এটা অনেকটা বাঙালির বিজয়ার মতো। আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধবদের মধ্যে দেখা সাক্ষাৎ হয়, শুভেচ্ছা বিনিময় হয়, উপহার বিনিময় হয়, খাওয়াদাওয়া হয়।

অন্ধ্রে এই দিনটি পালিত হয় ‘মুক্কুনুমা’ নামে। এ দিন গোধনের পূজা করা হয়। আমিষভোজীরা এই দিনটি সাড়ম্বরে পালন করে। কারণ মকর উৎসবের প্রথম তিনটি দিন নিরামিষ দিবস, তাই শেষ দিনে আমিষ খাওয়ার রেওয়াজ।

এই শীতেই ওঠে তিলের ফসল। আর আখের গুড়ও মেলে প্রচুর। তাই ভারতের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে মকর সংক্রান্তিতে তিলের নাড়ু খাওয়া রেওয়াজ। গুড় দিয়ে তৈরি এই নাড়ু বিলি করাও হয় এই উৎসবে। মহারাষ্ট্রে তো তাই এই উৎসবের নাম ‘তিলগুল’। বাড়িতে অতিথিদের তিলের নাড়ু দিয়ে বলা হয় ‘তিলগুল ঘায়া, গোড় গোড় বলা’ (তিলনাড়ু খাও, আর মিষ্টি মিষ্টি কথা বলো’)।

sweet made of coconut
নারকেল নাড়ু।

তবে মজার কথা হল, পশ্চিমবঙ্গ এবং কেরলে তিল বা আখ, কোনোটাই বিশেষ হয় না। এখানে হয় নারকেল। তাই উৎসবে-পার্বণে নারকেল নাড়ু খাওয়ার রেওয়াজ এই দুই রাজ্যে, মকরের উৎসবেও তার ব্যতিক্রম হয় না। হাজার যোজন দূরত্বে থাকা আর্দ্র জলবায়ুর দুই রাজ্যের মধ্যে কেমন মিল খাদ্যাভ্যাসে ! গোটা উত্তর ভারতে এই সময় তিল, গুড়, দুধের মিষ্টির সঙ্গে চাল, ডাল আর সবজি দিয়ে খিচুড়ি খাওয়া হয়। তাই সেখানে মকর উৎসব হল ‘খিচড়ি পরব’। এই সংক্রান্তিতে উৎসব পালন করে ভারতের জনজাতিরা। পশ্চিমবঙ্গের সাঁওতাল আদিবাসী অধ্যুষিত পুরুলিয়া-বাঁকুড়া-বীরভূম-পশ্চিম বর্ধমান-পশ্চিম মেদিনীপুরে পালিত হয় ‘টুসু উৎসব’।

ভারতের সীমান্ত ছাড়িয়ে অন্যত্রও মকর সংক্রান্তি পালিত হয়। হিমালয়ের কোলে নেপালে পালিত হয় ‘মাঘে’। এক সময় ভারতীয় সংস্কৃতির বিস্তার ঘটেছিল পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে। সেই ঐতিহ্যের ধারা আজও বহমান। তাই মকর সংক্রান্তিতে তাইল্যান্ডে পালিত হয় ‘সোংক্রান’, কাম্বোডিয়ায় ‘মোহা সোংক্রান’, মায়ানমারে ‘থিংইয়ান’ আর লাওসে উদযাপিত হয় ‘পি মা লো’ উৎসব। এ ছাড়াও যে সব দেশে ভারতীয়রা চালান হয়েছেন বা সাগরপাড়ি দিয়েছেন, যে সব দেশে ভারতীয়রা সংখ্যায় বেশ বড়ো গোষ্ঠী, সেখানেই পালিত হয় এই মকর সংক্রান্তির উৎসব।

ভারত বহুত্ববাদী দেশ। ‘বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্য’ই যে এ দেশের মূল মন্ত্র, মকরের উৎসবেই তার প্রমাণ ও প্রকাশ।

এক ক্লিকে মনের মানুষ,খবর অনলাইন পাত্রপাত্রীর খোঁজ

loading...