প্রান্তিক নারীর শিল্পবোধের রঙে রঙিন জঙ্গলমহলের শীতযাপন

0
1923
মৃণালকান্তি মাহাত

— এ বেটা দাঁড়া, টুকুন থির মার।

জেঠিমার ডাকে বাইক থামালাম। – এ বেটা দেখন হামার গীতটা কেমন লাইগছে।

আমার জেঠিমা গান ধরে,

‘-অ টুসু তুই করিস কেনে আড়ি

গরিব লকে কথা পাব শাড়ি’

আমি বাকরুদ্ধ। কোথা থেকে আসে এসব কথা? জেঠিমা কোনদিন স্কুলের চোকাঠ পেরোননি। জানেন না নামসই। তবুও এসব ভাবনা তথাকথিত আম শিক্ষিতের থেকে অনেক উচ্চমার্গের। আমার জেঠিমার মতো সামান্য এক শখের টুসু শিল্পীর ভাবনাতেও কবিত্ব। সৌজন্যে অবশ্যই জঙ্গলমহল উৎসব।এই উৎসবেই জঙ্গলমহলের গরিব গুর্বো আদিবাসি রমণীদের মুখে তুলে দিয়েছে ভাষা, গলায় সুর আর হাতে কলম।তাই আমার বৃদ্ধা জেঠিমাও নিজের দলের জন্য নতুন গান বাঁধতে শুরু করে দিয়েছেন।

ঘটনাটা খুলেই বলি। জঙ্গলমহলের ব্লকে ব্লকে এখন জঙ্গলমহল উৎসব চলছে। ব্লকে উত্তীর্ণ হলে জেলা, তারপর রাজ্য।তাই আশ্বিন মাস পড়লেই পাড়ায় পাড়ায় শুরু হয়ে যায় রিহার্সাল। হেমন্তের সন্ধ্যায় ভেসে আসে টুসু, ঝুমুর, কিংবা লাগড়ে।ডুবকা ভেদ করে ছুটে আসে তিরিংরিঞা ধমসা -মাদলের বোল। ডুংরির চূড়ায় তখন বাঁশি বাজিয়ে সুর বসায় আড়বাঁশি শিল্পী। একটা সাজ সাজ রব পড়ে যায় ঝাড়গ্রাম থেকে ঝালদা, মেদিনীপুর থেকে মানবাজারের মধ্যে। সন্ধ্যের মধ্যে রান্নার কাজ সেরে ফেলেন মহিলারা। মহড়ায় যেতে হবে যে।যে যার নিজস্ব দল টুসু, পাতা, ঝুমুর নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। ঘন্টার পর ঘন্টা চলে নিজেদের শিল্প নিয়ে কাটাছেঁড়া।নতুন নৃত্য বা গান তোলার মধ্যে অদ্ভুত এক তৃপ্তি বোধ করেন তারা। মাধ্যমিক ফেল যে বধূটি সারাদিন শালপাতা সেলাই করে জীবন জীবিকা অতিবাহিত করে, সন্তান ঘুমোলে  গভীর রাতে তুলে নেয় কলম। নিজেদের টুসু দলের জন্য নতুন নতুন গান বাঁধতে হবে যে। অবশ্যই সময়োপযোগী হওয়া চাই। না হলে যে প্রাইজ পাওয়া যাবে না। গ্রাম্যবধূটির অপটূ হাতে গান হয়ে উঠে আসে কন্যাশ্রী, পণপ্রথা, স্বচ্ছ ভারত এর মতো ইস্যু।

শালবনি জঙ্গলমহল উৎসবে দেখা হল পঞ্চাশোর্ধ্ব রতন মাহাত-র সঙ্গে। তাঁরা পাতা নাচের দল নিয়ে এসেছেন। “কি করব বাপ!সারাবছর কাজকাম নিয়ে পড়ে থাকি, এই কটা দিন টুকু ফুর্তি করে নিই”। একই সুর লালগড়ের ছোটোপেলিয়ার পানমনি সরেনের গলায়।“আমাদের তো বাড়ির বাইরে যাওয়ার খুব একটা সুযোগ থাকে না। সংসারের কাজ নিয়েই পড়ে থাকি, এই রকম গানবাজনার সুযোগ আলে বেশ ভালই লাগে। জঙ্গলমহলের চার জেলায় এইরকমের হাজার হাজার পানমনি, রতনরা ছড়িয়ে রয়েছে। যাদের কাছে লোকপ্রসার প্রকল্পের ভাতাটা বড়ো কথা নয়। গুরুত্বপূর্ণ নয় উৎসবের পুরস্কার মূল্যও। সংসারের জোয়াল নামিয়ে কটা দিন মুক্তির আনন্দটাই বড় হয়ে দাঁড়ায় তাদের কাছে। ঝাড়গ্রাম জঙ্গলমহল উৎসবে কথা হচ্ছিল পশ্চিমাঞ্চল উন্নয়ন পর্ষদের বিশিষ্ট আধিকারিক নীলেশ চক্রবর্তীর সঙ্গে, তিনি বলেন, চার জেলায় এখনও পর্যন্ত লোকপ্রসার প্রকল্পের আওতায় যতজন শিল্পী এসেছেন তাদের প্রায় চল্লিশ শতাংশ শিল্পী মহিলা। আদিবাসী মহিলাদের মধ্যে অদ্ভূত একটা আগ্রহ লক্ষ্য করছি ইদানীং। প্রতিবছরেই শয়ে শয়ে মহিলা নতুন করে নাম নথিভুক্ত করছেন। শালবনি পঞ্চায়েত সমিতি থেকে পাওয়া একটা সূত্র থেকে জানা যাচ্ছে, এ বছর প্রায় ৩৫০০শিল্পী প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করেছিলেন, তাদের মধ্যে ১৬০০ জনেই মহিলা।মোটকথা লোকপ্রসার প্রকল্প চালু হয়ার পর থেকে লোকসংগীত, লোকনৃত্যে একটা জোয়ার এসেছে জঙ্গলমহল জুড়ে। অজপাড়া গায়ের প্রান্তিক মহিলারাও শিল্পী হওয়ার স্বপ্ন দেখছেন।এর আগে এদের অনেকেই যারা নিজের জেলা শহরটিকেই ভাল করে চেনেননি।তারাই এখন রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে গিয়ে শিল্প প্রদর্শন করছেন।

লোকপ্রসার প্রকল্প সম্পর্কে যত রাজনৈতিক বিতর্কই থাক, এটি ক্ষয়িষ্ণু লোকসংস্কৃতিকে পুনর্জন্ম দিয়েছে।বলছিলেন ঝাড়গ্রাম মহকুমার বিশিষ্ট লোকসংস্কৃতি গবেষক ভূপেন মাহাত।তিনি বলেন, “যে মহিলা শিল্পীরা আগে অপরিচিত মানুষদের সঙ্গে কথা বলতে জড়তা অনুভব করতেন, তারাই আজ বিভিন্ন সরকারি অনুষ্ঠানের মঞ্চ কাঁপাচ্ছেন। ঘন্টার পর ঘন্টা গান গাইছেন, নৃত্য প্রদর্শন করছেন।নিজেদের মতো করে নতুন নতুন গান বাধছেন সময়পোযোগী। এর চেয়ে বড় ‘ ওমেন এমপাওয়ারমেন্ট’ আর কি হতে পারে”? প্রকৃতই এই ক’টা দিন জঙ্গলমহলের আদিবাসী নারীরা হয়ে ওঠেন বিদূষী। অনায়াসে পোঁছে যান সব পেয়েছির দেশে।

ছবি: লেখক

এক ক্লিকে মনের মানুষ,খবর অনলাইন পাত্রপাত্রীর খোঁজ

loading...

মতামত দিন

Please enter your comment!
Please enter your name here