পুঁজিলাঞ্ছিত কারুবাসনার পরাজয়-কাব্য

0
223

prasenjitপ্রসেনজিৎ চক্রবর্তী

বাংলা বিরামচিহ্ন নিয়ে একটা বই পড়া শুরু করেছি দুএক দিন হল। তার মধ্যেই রবিবারের সকালে হাজির হতে হল অ্যাকাডেমি চত্বরে। হাতে সময় থাকায় ফাঁকা নন্দন প্রাঙ্গণে ঢুঁ। অনেকদিন পর গেলাম ওই এলাকায়, তাই ‌থমকে গেলাম। নন্দনের টিকিট কাউন্টার স্থান পাল্টে নিয়েছে। নন্দন চত্বরের পেছনের দরজা থেকে সরে এসে, সে এখন নন্দন সিনেমায় ঢোকার দরজা-সংলগ্ন। দাঁড়িয়ে যেতেই হল, দেখবার জন্য। যতি চিহ্ন চর্চার হাতে কলমে শিক্ষা যেন। তবু সেখানেই কি শেষ! যে নাটকটি দেখতে যাওয়া, টিকিটে তার নাম মুদ্রিত- ‘মিত্রকে নিয়ে কি করিতে হইবে’।

কেমন উচ্চারণ হবে এর ? হ্যাঁ বা না-য়ে উত্তর হলে ‘কি’ বানান হয় জানি। কিন্তু উত্তর বিস্তৃত হলে তো ‘কী’ বানান হয়। অথচ নামের শেষে কোনো যতি চিহ্ন নেই। তাহলে ? ইহা কি নেহাতই স্টেটমেন্ট, সংবাদ শিরোনাম-ন্যায়?

দর্শকদের ওপর সন্ত্রাসের অবশ্য এখানেই শুরু নয়। তারও আগে। থিয়েটার ফর্মেশন পরিবর্তক প্রযোজিত, বাজেশিবপুর আর্ট অ্যান্ড কালচার নিবেদিত এই নাটকের টিকিটের কোনো দাম নেই। দর্শক নাটকটি দেখার আগেই যা ভালো মনে হবে, কাউন্টারে দেবেন। আসন নম্বরও নেই। টিকিটে বা অন্য কোথাও পরিচালকের নামও নেই। শুধু জানা যায়, ‘নাটক: রাজীব নায়েক’।

পরে বোঝা গেল, নাটকটা টিকিট থেকেই শুরু হয়ে গেছে। নাটক জুড়ে ‘মিত্র’ চরিত্রটির একটি পূর্ণাঙ্গ অবয়ব গড়ে তোলা হয়েছে। তাঁর উপস্থিতি-কর্মকাণ্ড, কী ভাবে দুজন মানুষের সম্পর্কে জটিলতা তৈরি করছে(যারা স্বামী-স্ত্রী), তার ভারী মায়াময় বিবরণ মঞ্চস্থ করা হয়েছে। কিন্তু মিত্র-কে নিয়ে নানা কিছু করার সম্ভাবনা তৈরি করা হলেও, সে পথ শেষ অবধি নিরুচ্চারিতই থেকে গেছে। বদলে, বিকল্প পথ দেখিয়ে, ‘জনগণই ইতিহাসের চালিকা শক্তি’, সেই ওল্ড ফ্যাশনড সত্যিটা দৃঢ়তার সঙ্গে মঞ্চে স্থাপন করেছেন, আম আদমির ঘোষিত প্রতিনিধি সালমা চরিত্রটি।

ওল্ড ফ্যাশনের এখানেই শেষ নয়। সফল পেশাদার অ্যাড ফিল্ম মেকার অভয়ের কারুবাসনা, খ্যাতি ও পুরস্কার-লিপ্সা, অস্তিত্বের সংকট ও বিপরীতে তাঁর অধ্যাপক স্ত্রীর সরল জীবনের চাহিদার দ্বন্দ্ব প্রতিটি দৃশ্যের শেষে (নাটকের শেষেও) মিলে গেছে সেই বহুচর্চিত ভালবাসার কিংকর্তব্যবিমূঢ় শিশির বিন্দুতে। যে ভালবাসার শক্তিই অভয়কে শেষ পর্যন্ত খ্যাতির মোহে দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়তে বাধা দেয়। ’৫৬ ইঞ্চি ছাতি’-র প্রেরণার প্রয়োজন হয় না।

ঘণ্টা দেড়েকের নাটক। দুটি চরিত্র। একটিই সেট। বসার ঘর। নাটকের নব্বই শতাংশ জুড়ে একই রকম আলো। আর শুধু কথা আর কথা। টানটান। ‘বোর’ হওয়ার বিন্দুমাত্র সম্ভাবনা নেই। ইরানের ফিল্মের মতো। যেখানে পারফর্মিং আর্টে হিউম্যান ডকুমেন্টের থেকে বড়ো ঈশ্বর নেই। অভয়ের চরিত্রে জয়রাজ ভট্টাচার্য ও সালমার চরিত্রে দামিনী বেণী বসু যে অভিনয়টা করেছেন, তাকে আধুনিক অভিনয়ের মানদণ্ড বলে অনায়াসেই চিহ্নিত করা যেতে পারে। তবু দৃশ্যের অপটু আলোচনায় যাওয়ার সাহস করলে, মনে পড়ছে সেই দৃশ্যটাই, যেখানে দর্শকদের দিকে পেছন ফিরে একটানা আত্মবিশ্লেষণ করছেন জয়রাজ এবং তাঁর দিকে নির্নিমেষ চেয়ে আছেন দামিনী।

সেই ছোটো থেকেই তো শুনছি, খাদ না থাকলে সোনা হয় না কিংবা চাঁদের কলঙ্কের কথা। তাই শেষ করার আগে বলে যেতে ইচ্ছা হয়, যার সংস্থার টার্নওভার দশ কোটি টাকা, তাঁর মুখে ‘শ্রেণি সংগ্রাম’ শব্দটা যেন কেমন কেমন। আর সালমার মতো প্রাণোচ্ছ্বল, স্বতস্ফূর্ত অধ্যাপক নিশ্চয় বাস্তবে আছেন। তবে, অমন শক্তিশালী চরিত্রটিকে আরেকটু জীবন্ত করতে হয়তো তাঁর পেশাগত পরিচয়টা কিছুটা আম আদমি-সুলভ করা যেতে পারতো।

ও হ্যাঁ। আর একটা কথা। সালমার কান্নার দৃশ্যটি যে ব্যঞ্জনা তৈরি করেছে, অভয়ের কান্নার জায়গাটা ততটা ব্যঞ্জনাময় ঠেকেনি এই আলোচকের। কিছুটা হলেও যেন প্রক্ষিপ্ত। হয়তো দৃশ্যটি আর একটু গড়ে তোলার প্রয়োজন ছিল। তবে কি, কান্নার ব্যাপার তো। সে বড়ো আপন জিনিস আমাদের। তা নিয়ে সমালোচনা করতে নেই। অভয়কে মাফ করে দেওয়াই যায়।

(ছবি ফেসবুক থেকে)

এক ক্লিকে মনের মানুষ,খবর অনলাইন পাত্রপাত্রীর খোঁজ

loading...

মতামত দিন

Please enter your comment!
Please enter your name here