৬৬ বছর ধরে লুকিয়ে রাখা প্রেমের স্বীকারোক্তি, জন্মদিনে নবনীতা দেব সেনকে অভিনব উপহার বুদ্ধদেব গুহর

0
4379
navaneeta
anirban chaudhury
অনির্বাণ চৌধুরী

উপলক্ষ নবনীতা দেব সেনের আশির ঘর ছুঁয়ে ফেলা। জন্মদিনের প্রাক্কালে তাই অভ্যাগতরা উপস্থিত। সুধীজনে পূর্ণ রবীন্দ্র সদনের প্রেক্ষাগৃহ। মঞ্চের পর্দা ওঠার পর একে একে আসন গ্রহণ করেছেন নবনীতা দেব সেন, শঙ্খ ঘোষ, বুদ্ধদেব গুহ এবং দে’জ পাবলিশিং-এর কর্ণধার সুধাংশুশেখর দে। এমন সময়েই সবাইকে সচকিত করে জীবনের অকপট স্বীকারোক্তিতে সরব হলেন বুদ্ধদেব। অনেকটা সারপ্রাইজ গিফ্টের আদলে লেখিকা তো বটেই, সঙ্গে সবাইকে জানিয়ে দিলেন ৬৬ বছর ধরে নবনীতার প্রতি লুকিয়ে রাখা একতরফা ব্যর্থ প্রেমের কথা!

“মনে আছে, সেটা ১৯৫২ সালের কথা। গড়িয়াহাট থেকে ৮ নম্বর বাসে করে আমি যাচ্ছিলাম। বাসে উঠেই দেখলাম, বসে আছে নবনীতা। আমিও ওর পাশেই বসলাম। সেই যে আলতো করে ঊরুতে ওর ছোঁয়া লাগা, তাতেই আমি ভাসতে ভাসতে বাড়ি ফিরলাম। আনন্দে আমার এমন অবস্থাই হয়েছিল”, কোনো রাখঢাক না করেই জানিয়েছেন তিনি।

“আসলে সেই সময় আমাদের ছেলেদের মধ্যে নবনীতার একটা সাঙ্ঘাতিক ক্রেজ ছিল। খুব অন্যরকম করে, ঢঙ করে কথা বলত তো! বরাবরই ও খুব ঢঙি ছিল! তা, নবনীতা অবশ্য আমাদের কাউকে পাত্তাই দিত না। সেই সময় সেন্ট জেভিয়ার্সের ছেলেদের প্রেসিডেন্সি কলেজের মেয়েরা বেশ হেয় করেই দেখত। ফলে, আমারও কোনো আশা ছিল না”, হাসতে হাসতে জানিয়েছেন বুদ্ধদেব।

আরও পড়ুন: স্মৃতিচারণার জলতরঙ্গে, গল্পে-গানে বুদ্ধদেব গুহ

“এর পরেই নবনীতা একটা সাঙ্ঘাতিক কাণ্ড করল। তাতে আমার আশা একেবারেই চলে গেল। ও বিয়ে করে ফেলল অমর্ত্য সেনকে। ভাবা যায়! তখন হাজার হাজার মেয়ে অমর্ত্যকে বিয়ে করার জন্য পাগল। তাদের সবাইকে টপকে নবনীতা অমর্ত্যকে বিয়ে করে ফেলল। তবে আমি হাল ছাড়িনি। আমি নবনীতাকে চিঠি লিখেই যেতাম। দয়া করে তার একটা-দুটোর উত্তরও ও দিত। আমি শুধু ভাবতাম, অমর্ত্য যদি এই চিঠিগুলোর কথা জেনে ফেলে, তাহলে কী হবে! অবশ্য ওরা তো শিক্ষিত দম্পতি, তাই স্বামী-স্ত্রী একে অপরের চিঠিতে হাত দিত না বলেই এখন মনে হয়”, খোলাখুলি জানিয়েছেন লেখক।

লেখকের এই স্বীকারোক্তি, রসিকতা হলেও নবনীতা দেব সেনের আশিতে পা রাখার জন্মদিনের উৎসবকে একটা আলাদা মাত্রা দিয়েছে। এক দিকে যেমন বুদ্ধদেব গুহ এ ভাবে অপ্রস্তুতে ফেললেন লেখিকাকে, তেমনই বাদ গেলেন না শঙ্খ ঘোষও। বর্ষীয়ান এই লেখক অনুষ্ঠানের মাঝেই এক সময় মঞ্চ ছেড়ে চলে গেলেন। ফিরে এসে কিছুক্ষণ পরে জানালেন, তাঁকে চলে যেতে হয়েছিল ‘এক ষড়যন্ত্রে যোগ দেওয়ার জন্য’। যে ষড়যন্ত্রের হোতা স্বয়ং লেখিকার কন্যা অন্তরা। জন্মদিনে তিনি কাছের মানুষদের দিয়ে মায়ের প্রতি লিখিয়ে নিয়েছেন কবিতা। তার পর সেই সব কবিতার মূলের পাশাপাশি নিজের অনুবাদ নিয়ে প্রকাশ করেছেন একটি গ্রন্থ। যা শঙ্খ ঘোষ তুলে দিলেন লেখিকার হাতে।

অবশ্য এটাই একমাত্র বই নয়। শুক্রবারের সন্ধ্যা সাক্ষী রইল দেজ পাবলিশিংয়ের প্রকাশনায় নবনীতা দেব সেন রচনাবলির প্রথম খণ্ড প্রকাশেরও। শ্রীকুমার চট্টোপাধ্যায়ের সম্পাদনায় সাত-আট মাসের অক্লান্ত পরিশ্রমে তৈরি হয়েছে বইটি। পরবর্তী খণ্ডগুলি রয়েছে যথাসময়ে প্রকাশের অপেক্ষায়।

এ ছাড়া অনুষ্ঠানটিকে আলাদা মাত্রা দিয়েছিল শ্রীজাত বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘আদর’-নামা।  নবনীতা দেব সেনকে উৎসর্গ করে লেখা এই কবিতা নিঃসন্দেহে অনুষ্ঠানের বড়ো প্রাপ্তি। তেমনই রঙ্গন চক্রবর্তীর কথায় আর দোহার-এর সুরে ‘জয় জয় নবনীতা, জয় দেবসেন’ থিম-সঙ্গীতটি অনেক দিন মনে থেকে যাবে।

স্বাভাবিক ভাবেই নবনীতা আপ্লুত ছিলেন এই সম্মাননায়। অনুষ্ঠানের এক পর্বে অনিতা অগ্নিহোত্রী এবং শমীক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে আলোচনাচক্রের মাধ্যমে তিনি জানালেন, এই সন্ধ‌্যায় তাঁকে অনেক কিছু দিল। যার জন্য তিনি কৃতজ্ঞতাজ্ঞাপন করেছেন দে’জ-এর কাছে, তেমনই উপস্থিত অভ্যাগতদেরও দিয়েছেন জনে জনে ধন্যবাদ।

শুভ জন্মদিন, নবনীতা! আপনার লেখনী আমাদের মননকে নিরন্তর সমৃদ্ধ করে চলুক- জন্মদিনে এই কামনাই করি!

এক ক্লিকে মনের মানুষ,খবর অনলাইন পাত্রপাত্রীর খোঁজ

loading...

মতামত দিন

Please enter your comment!
Please enter your name here