শিক্ষাবিদ-গবেষক বেলা ভাটিয়া আক্রান্ত, বস্তার ছেড়ে চলে যেতে হুমকি

0
172

জগদলপুর (ছত্তীসগড়) : ছত্তীসগড়ের জগদলপুরের কাছে পারপা গ্রামে নিজের বাড়িতে আক্রান্ত হলেন বস্তারের শিক্ষাবিদ ও গবেষক বেলা ভাটিয়া। ছত্তীসগড়ের যে সব আদিবাসী মহিলা ধর্ষণ ও যৌন নিগ্রহের অভিযোগে পুলিশের বিরুদ্ধে এফআইআর করেছিলেন তাঁদের বিবৃতি রেকর্ড করতে কিছু দিন আগে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের দলকে সাহায্য করেছিলেন বেলা দেবী।

অভিযোগ, সোমবার সকালে মোটরগাড়ি ও মোটরবাইকে চেপে জনা তিরিশেক লোক তাঁর বাড়িতে আসেন এবং অবিলম্বে তিনি বস্তার ছেড়ে চলে না গেলে তাঁকে খুন করে তাঁর বাড়ি পুড়িয়ে দেওয়া হবে বলে হুমকি দেয়। তারা জোর করে বাড়ির মধ্যে ঢুকে পড়ে এবং তাঁর বাড়িওয়ালিকেও হুমকি দেয়। বলে, তিনি যদি বেলা দেবীকে থাকতে দেন তা হলে তার ফল ভালো হবে না। বেলা দেবী বস্তারের কালেক্টর অমিত কাটারিয়াকে ফোন করে তাঁর সাহায্য চান। আধ ঘণ্টা পরে পুলিশ আসে। কিন্তু ‘যুদ্ধং দেহি’ জনতাকে নিয়ন্ত্রণ করতে তারা কিছুই করেনি। বেলা দেবী আরও জানান, ওই জনতা যতক্ষণ তাঁর হেনস্থা করেন, গ্রামের সরপঞ্চ তা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছিলেন।

এই ঘটনার কথা জানিয়েছেন বেলা দেবীর স্বামী তাঁর স্বামী প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ জঁ দ্রেজেও। তিনি বলেছেন, “আক্রমণকারীরা তাঁর বাড়ি পুড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দেয়, তাঁর কুকুরকে মেরে ফেলারও হুমকি দেয়। বাড়িওয়ালিকেও শাসায়।”

বিজ্ঞাপন

এই হুমকির মুখে পড়ে বেলা দেবী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ঘর ছেড়ে দিতে রাজি হন। জনতা জোর করে একটা কাগজে বাড়িওয়ালি ও বেলা দেবীকে দিয়ে লিখিয়ে নেয় যে, পুলিশের সামনেই তিনি বাড়ি ছেড়ে চলে যাবেন।   

হোয়াটস অ্যাপে পাঠানো এক বার্তায় বেলা দেবী জানিয়েছেন, তাঁর বাড়িওয়ালা ও তাঁর ছেলেকে পুলিশ ডেকে পাঠায় এবং বেলা দেবী যাতে অবিলম্বে বাড়ি ছেড়ে দেন, সেই ব্যাপারটা সুনিশ্চিত করতে বলেন।

বেলা দেবীকে আক্রমণের সময় পুলিশি নিষ্ক্রিয়তা এবং বাড়িওয়ালাকে থানায় ডেকে পাঠানো, এই দু’টি ঘটনার মধ্য দিয়ে জনতার আক্রমণের সময় পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠে যায়।

যে সব মানবাধিকারকর্মী আদিবাসীদের উপর পুলিশি অত্যাচারের নানা ঘটনা সর্বসমক্ষে তুলে আনছেন, তাঁদের উপর আক্রমণের ঘটনা বস্তারে নতুন নয়। রমন সিংহের নেতৃত্বাধীন বিজেপি সরকারের আমলে পুলিশের আই জি (বস্তার অঞ্চল) এসআরপি কাল্লুরির নেতৃত্বে বস্তার পুলিশ মানবাধিকারকর্মী, রাজনৈতিক কর্মী, সাংবাদিকদের উপর আক্রমণের ক্ষেত্রে ছাড় পেয়ে আসছে।

জনতার এ ধরনের সক্রিয়তার ফলে এর আগে সাংবাদিক মালিনী সুব্রহ্মণ্যম, জগদলপুর লিগ্যাল এড গ্রুপের আইনজীবী শালিনী গেরা ও ঈশা খান্ডেলওয়াল এবং বহু মানবাধিকার কর্মী বস্তার ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন। বাইরে থেকে যে সব শিক্ষাবিদ, সমাজকর্মী বস্তারে আদিবাসীদের অবস্থা সরেজমিনে দেখতে গিয়েছেন, তাঁদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দেওয়া হয়েছে। পুলিশের বিরুদ্ধে স্বেচ্ছাচারিতার নানা অভিযোগ তোলা হলেও তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

কিন্তু বেলা ভাটিয়া কেন আক্রান্ত হলেন?

নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে আদিবাসীদের মহিলাদের ধর্ষণ ও যৌন নিগ্রহের অভিযোগের তদন্ত করে গত ৭ জানুয়ারি জাতীয় মানবাধিকার কমিশন একটি রিপোর্ট প্রকাশ করে। তা থেকে দেখা যায়, ২০১৫-এর অক্টোবর থেকে ২০১৬-এর মার্চ পর্যন্ত ছত্তীসগড় পুলিশ অন্ততপক্ষে ১৬ জন আদিবাসী মহিলাকে হয় ধর্ষণ আর না হয় যৌন নির্যাতন করেছে। এ ঘটনায় যাঁরা এফআইআর করেছিলেন তাঁদের বিবৃতি রেকর্ড করতে কমিশনকে সাহায্য করেছিলেন বেলা ভাটিয়া।

বেলা দেবীকে বস্তার ছেড়ে যাওয়ার হুমকি এই প্রথম যে দেওয়া হল তা নয়। ২০১৫-এর নভেম্বরে যখন তিনি যৌন নির্যাতনের অভিযোগে এক আদিবাসী মহিলাকে পুলিশের বিরুদ্ধে এফআইআর দায়ের করতে সাহায্য করেছিলেন তখনও তিনি আক্রান্ত হন। সেই সময় পারপার আর এক বাড়িওয়ালা বেলা দেবীকে ঘর খালি করে দিতে বলেন, যদিও তিনি এক বছরের জন্য বাড়িভাড়া আগাম দিয়ে রেখেছিলেন।

এ ধরনের আক্রমণের মূলে রয়েছে যারা, রাজ্যের মদতপুষ্ট সেই নজরদার বাহিনী ‘অগ্নি’র নেতা সুব্বা রাও ঠারেঠোরে বুঝিয়ে দিয়েছেন, বেলা দেবীকে আক্রমণে  তাঁর গোষ্ঠীই জড়িত। একটি হোয়াটস গ্রুপে একটি অস্বাক্ষরিত বিবৃতি পোস্ট করে তিনি বলেছেন, সোমবার সকালে তাঁর গ্রামের লোকেরাই ভাটিয়ার বাড়ি ঘেরাও করেছিল। ‘গ্রামবাসীদের’ ধারণা, ভাটিয়া ‘নকশাল কর্মকাণ্ডে’ জড়িত। তাই তাদের দাবি, ভাটিয়াকে গ্রাম ছেড়ে চলে যেতে হবে। বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘গ্রামবাসীদের’ অভিযোগ ভাটিয়ার স্বামী জঁ দ্রেজে এক জন ‘বিদেশি এজেন্ট’। উল্লেখ্য, বেলজিয়ামের মানুষ বিখ্যাত অর্থনীতিবিদ জঁ দ্রেজে ভারতের একজন বিশিষ্ট উন্নয়ন বিশেষজ্ঞ। মহাত্মা গান্ধী গ্রামীণ কর্মসংস্থান গ্যারান্টি প্রকল্প এবং খাদ্য নিরাপত্তা প্রকল্প রচনা ও রূপায়ণের ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা ব্যাপক ভাবে স্বীকৃত।

এখানে উল্লেখ করা যায়, ‘অগ্নি’র আগে ‘সামাজিক একতা মঞ্চ’ (এসইএম) একটি নজরদার বাহিনী ছিল। ওই গোষ্ঠীর সঙ্গে পুলিশকর্তাদের যে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ আছে, তা একটি স্টিং অপারেশনে ধরা পড়ার পর সরকার ২০১৬-এর এপ্রিলে ওই মঞ্চ ভেঙে দেয়। মানবাধিকার কর্মীদের অভিযোগ, ‘অগ্নি’ও ঠিক একই ভাবে ‘সামাজিক একতা মঞ্চ’র মতো পুলিশের ছত্রচ্ছায়ায় থেকে কাজ করছে।

ভাটিয়ার উপর আক্রমণের ঘটনার ব্যাপারে জেলা কালেক্টর অমিত কাটারিয়ার মন্তব্য পাওয়া যায়নি।

সৌজন্যে : দ্য অয়্যার  

বিজ্ঞাপন
loading...

মতামত দিন

Please enter your comment!
Please enter your name here