এপ্রিলের শুরুতে এভারেস্ট অভিযানে যাচ্ছেন কুন্তল আর সাহাবুদ্দিন

0

মধুমন্তী চট্টোপাধ্যায়

কলকাতা: শীত ফুরোলে শিমূল, পলাশ আর কোকিলের ডাক যখন আমাদের মনে করিয়ে দেয় ‘বসন্ত এসে গেছে’, ওঁরা তখন শারীরিক ভাবে, মানসিক ভাবে প্রস্তুত করেন নিজেদের। প্রস্তুতি স্বপ্ন ছোঁয়ার, হাজার বাধা পেরিয়ে একটু একটু করে ওপরে ওঠার। এই বসন্তেও ছবিটা একই রকম। পদে পদে বাধা, অনিশ্চয়তার মাঝেই তৈরি হচ্ছেন ওঁরা। হাওড়ার কুন্তল আর ইছাপুরের শেখ সাহাবুদ্দিন। এভারেস্ট চুড়োয় পা রাখার স্বপ্ন নিয়ে দু’জনেই রওনা হচ্ছেন এপ্রিলের শুরুতে, এখনও পর্যন্ত সে রকমই ঠিক আছে।

শুধু এভারেস্ট (৮৮৪৮মি) নয়, ৮০০০ মিটার উচ্চতার ওপর যে কোনো শৃঙ্গে ওঠার জন্যই চাই প্রচণ্ড পরিমাণ শারীরিক দক্ষতা। প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ থাকাও জরুরি। মনের জোরের কথা নতুন করে নাই বা বললাম। আর এর প্রত্যেকটা থাকলেও নিশ্চিত হয় না শৃঙ্গ জয়। রয়েছে স্পনসরশিপের সমস্যা। হিমালয়ের আবহাওয়ার ওপর নির্ভর করা ছাড়া উপায় থাকে না পর্বতারোহীদের। প্রকৃতি সাথ দিলে, তবেই এগোনো যায়। বিগত কয়েক বছরে, কখনও ভূমিকম্প, কখনও তুষারঝড় পথ আটকে দিয়েছে বারবার।

বিজ্ঞাপন

এ বারের বসন্ত যেন কিছুটা বিষণ্ণ। ২০১৬-এর এভারেস্ট অভিযানে রাজ্যের তিন পর্বতারোহীকে হারিয়েছি আমরা। দুর্ঘটনা এড়াতে স্বাভাবিক ভাবেই রাজ্য সরকারের তরফ থেকে নির্ধারণ করা হয়েছে ন্যূনতম যোগ্যতা। যোগ্যতায় উতরোলে তবেই এভারেস্ট অভিযানের জন্য আবেদন করতে পেরেছিলেন পর্বতারোহীরা। চূড়ান্ত পর্যায়ের বাছাই এখনও বাকি থাকলেও সম্ভাব্য তালিকায় রয়েছেন কুন্তল কাঁড়ার আর সাহাবুদ্দিন। ওঁদের মুখ থেকেই শোনা গেল, এভারেস্ট যাওয়ার খরচ মোটামুটি ২২ থেকে ২৪ লক্ষ টাকা। এর মধ্যে রাজ্য সরকারের অনুদান হিসেবে মেলে ৫ লক্ষ টাকা। বাকি টাকা জোগাড় করতে রীতিমতো নাজেহাল হতে হয় পর্বতারোহীদের। 

ইছাপুরের ‘মেটাল অ্যান্ড স্টিল ফ্যাক্টরি’র কর্মী সাহাবুদ্দিনের পেছনে অবশ্য রয়েছে তাঁর দফতর। টাকার জোগানও তাঁরাই করছেন বেশ কিছুটা। বাকিটা হচ্ছে প্রভিডেন্ট ফান্ডের টাকা ভাঙিয়ে, বন্ধুদের থেকে ধার নিয়ে। পর্বতারোহণে তাঁর প্রায় ২২ বছরের অভিজ্ঞতা। ইতিমধ্যে ১৭টা শৃঙ্গ জয় করেছেন বছর ৩৫-এর সাহাবুদ্দিন।

হাওড়া ডিসট্রিক্ট মাউন্টেনিয়ারিং অ্যান্ড ট্রেকারস অ্যাসোসিয়েশনের সদস্য কুন্তলবাবুর কিন্তু স্পনসরশিপ জোগাড় করতে এখনও কাঠখড় পোড়াতে হচ্ছে। ব্যাঙ্ক থেকে ঋণ নিয়ে, বন্ধু-বান্ধবের থেকে ধার নিয়ে ব্যবস্থা করতে হচ্ছে সাড়ে ২৩ লক্ষ টাকার। ৪৪ বছরের কুন্তলবাবুর অভিজ্ঞতার ঝুলিটাও নেহাত কম নয়। তা সত্ত্বেও মেলেনি কোনো স্পনসরশিপ, জানালেন কুন্তলবাবু।

দীপঙ্কর ঘোষ

“পাড়ার ফুটবল ম্যাচ স্পনসর করতেও এগিয়ে আসে নানা বেসরকারি সংস্থা। অথচ সারা বিশ্বে ‘সুপ্রিম স্পোর্টস’-এর তকমা পাওয়া মাউন্টেনিয়ারিং-এ অর্থ ব্যয় করতে ইচ্ছুক নয় কোনো সংস্থাই। আমাদের রাজ্যের ছবিটা আরও মারাত্মক”, জানালেন এভারেস্টজয়ী দীপঙ্কর ঘোষ। দীপঙ্করবাবু নিজে এ বছর যাচ্ছেন ধবলগিরি (৮১৬৭মি) অভিযানে।

দেবাশিস বিশ্বাস

আমাদের রাজ্য থেকে মাউন্ট লোতসে (৮৫১৬মি) অভিযানে যাচ্ছেন অর্জুন পুরস্কার পাওয়া দেবাশিস বিশ্বাস। এপ্রিলের ১৭/১৮ তারিখ নাগাদ রওনা হচ্ছেন। দুর্ঘটনার ঝুঁকি কমাতে গত বছর থেকেই এভারেস্টে স্থায়ী ভাবে থাকছে রেস্কিউ টিম। এ ছাড়া এজেন্সির গাইডদের সঙ্গে যথাসাধ্য সহযোগিতা করলে বিপদ অনেকটাই এড়ানো যায়, বললেন এভারেস্টজয়ী দেবাশিসবাবু। তবে স্পনসরশিপের অবস্থা যে খুব খারাপ, স্বীকার করলেন প্রথমেই। বললেন, “পর্বতারোহণ এমন একটা অভিযান, যা মানুষের চোখের আড়ালে হয়, স্বাভাবিক ভাবেই মানুষের এতে উৎসাহ কম। আর যে খেলার জনপ্রিয়তা কম, সহজে তাতে টাকা ঢালতে রাজি হয় না কোনো সংস্থা”।   

সব প্রতিকূলতা পেরিয়ে ওদের স্বপ্ন সফল হোক। শৃঙ্গ জয় হোক বা না হোক, পাহাড়ের কোল থেকে ওরা যেন ফিরে আসে সুস্থ শরীরে। শুভেচ্ছা রইল।

বিজ্ঞাপন
loading...

মতামত দিন

Please enter your comment!
Please enter your name here