কেরলের সঙ্গে সোমালিয়ার তুলনা করে বড়ো ভুল করলেন মোদী

0
105

খবর অনলাইন: ফের ‘ভুল’ করে ফেলল বিজেপি, ‘ভুল’ করে ফেললেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। আঁতে ঘা দিয়ে ফেললেন। বিহারে নির্বাচনী প্রচারে গিয়ে নীতীশ কুমার ও বিহারবাসীদের আঁতে ঘা দিয়ে ফেলেছিলেন মোদী ও তাঁর শাগরেদরা। বিহার যে সে-সব মন্তব্য ভালো ভাবে নেয়নি তা বুঝিয়ে দিল হাতেনাতে। নির্বাচনে বিজেপির স্বপ্নভঙ্গ হল। ফের একই ‘ভুল’ কেরলে। তিরুঅনন্তপুরমে এক নির্বাচনী জনসভায় ভাষণ দিতে গিয়ে কেরলকে সোমালিয়ার সঙ্গে তুলনা করে ফেললেন মোদী। বললেন, কেরলে আদিবাসী শিশুদের অবস্থা সোমালিয়ার চেয়েও ‘খতরনাক’।

উপলক্ষ ছিল একটা ছবি। কান্নুরের পেরাভুরে একটা আবর্জনার স্তূপে দু’টি শিশু। সম্ভবত খাবার খুঁজছে। ওই ছবির সূত্র ধরেই প্রধানমন্ত্রীর মন্তব্য।

ঠিক কী বলেছিলেন প্রধানমন্ত্রী?

মোদী বলান, “ইহাঁ কেরল কি জন্‌জাতি, জন্‌তা, এসটি শিডিউলড্‌ ট্রাইব, উসমে জো চাইল্ড হেলথ্‌ রেশিও হ্যায়, সোমালিয়া সে ভি স্থিতি খতরনাক হ্যায়…. অভি কুছ দিন পহলে….মিডিয়া মেঁ দর্দনাক চিত্র দেখনে কো মিলা…. জো কমিউনিস্ট পার্টি কো কিলা মানা যাতা হ্যায়, জহাঁ উহ হমেশা জিততি হ্যায়, উস পেরাভুর মেঁ শিডিউলড্‌ ট্রাইব কে বালক কুদে কে ধের মেঁ ভোজন তলাশ কর রহে হ্যায়ঁ, ইয়ে মিডিয়া মেঁ প্রকাশিত্‌ হুয়া হ্যায়….” (এখানে এই কেরলে জনজাতি, জনতা, তফশিলি উপজাতিদের মধ্যে শিশুমৃত্যুর যে হার তা সোমালিয়ার থেকেও ভয়ঙ্কর। কিছু দিন আগে সংবাদমাধ্যমে একটা মর্মান্তিক ছবি অনেকেই দেখেছেন। যে পেরাভুরকে কমিউনিস্ট পার্টির দুর্গ বলা হয়, যেখানে তারা সব সময়েই জেতে, সেই জায়গায় তফশিলি উপজাতির বালক একটা আবর্জনা স্তূপ থেকে খাবার খুঁটে খাচ্ছে, এই ছবি খবরের কাগজের বেরিয়েছে….)।

দু’ দিক থেকে ‘ভুল’ করেছেন মোদীজি। প্রথমত যে ছবিটির তিনি কথা বলেছেন, তা নিয়ে যথেষ্ট তোলপাড় হওয়ার পর আসল বিষয়টি প্রকাশ পেয়েছে। জনসভায় বক্তব্য রাখার আগে তাঁর হোমওয়ার্কটা করে নেওয়া উচিত ছিল। আর সোমালিয়ার সঙ্গে কেরলের তুলনা টানা। এটা যে কত বড়ো ভুল তা বোধহয় তিনি টের পাবেন ফল প্রকাশের দিন।

প্রথমে ছবিটির প্রসঙ্গে আসা যাক। এটি প্রকাশিত হয় ‘মাত্রুভূমি’ পত্রিকায় ২০১৫ সালের ৪ নভেম্বর। খবরটা ছিল, গ্রাম পঞ্চায়েত পরিচালিত এই আবর্জনাভূমি থেকে ৫০০ মিটার দূরের একটি আদিবাসী কলোনিতে এই শিশুগুলি বাস করে। ‘মাত্রুভূমি’র যে সাংবাদিক এই খবরটি করেছিলেন তিনি জানান, ওই আবর্জনাভূমির দুই কর্মী তাঁকে খবরটা দিয়েছিলেন। তিনি খবর পেয়ে সেখানে যান। পাঁচিল টপকে আবর্জনাভূমিতে লাফিয়ে পড়ে শিশুরা, তারা আবর্জনা খুঁটতে থাকে, তিনি ছবি তোলেন এবং তা কাগজে প্রকাশিত হয়। সেই ছবি প্রকাশিত হওয়ার পর সরকার তদন্ত করতে বাধ্য হয়।

যে ট্রাকটি আস্তাকুঁড়েতে রোজ আবর্জনা নিয়ে আসে তার চালক টি বিজেশ বলেন, ওই স্তূপে হোটেল ও বেকারির পচা খাবার ফেলা হয়। এর মধ্যে থাকে ফল, পেস্ট্রি, সামোসা ইত্যাদি। বাচ্চাগুলো রোজ পাঁচিলের বাইরে অপেক্ষা করে। ট্রাক আসার পর তারা পাঁচিল টপকে লাফিয়ে পড়ে আবর্জনায়। তার পর আবর্জনা ঘাঁটাঘাঁটি শুরু করে। এরা ময়লাকুড়ানি।

গোটা ব্যাপারটির তদন্ত করে গত ১৮ ফেব্রুয়ারি তফশিলি উপজাতি উন্নয়ন দফতরের ডিরেক্টর যে রিপোর্ট দেন তাতে বলা হয়েছে, “এই শিশুগুলির বিরুদ্ধে স্কুল ক্লাস পালানোর অভিযোগ রয়েছে। আবর্জনাভূমির কর্মীরা বারবার সতর্ক করে দেওয়া সত্ত্বেও এরা বিনা অনুমতিতে সেখানে ঢোকে। এদের বাবা-মায়েরা কৃষিজমিতে মজুরের কাজ করে। এঁরা নিয়মিত কাজ পান। তাই এদের পরিবারদের খাবার বা অন্যান্য প্রয়োজনীয় জিনিস জোগাড় করতে কষ্ট করতে হয় না। দু’টি পরিবারকেই একটি সরকারি খামারে আদিবাসী পুনর্বাসন কেন্দ্রে এক একর করে জমি দেওয়া হয়েছে। কিন্তু তারা সেই জায়গায় যায়নি।”

স্থানীয় থানার অফিসার বলেছেন, এই শিশুদের স্কুলে নিয়ে যেতে নিখরচায় গাড়ির ব্যবস্থা থাকলেও এরা বেশির ভাগ দিন স্কুলে যায় না।

জেলাশাসক পি বালকিরণ জানান, আবর্জনা খুঁটে খাওয়ার যে ছবি ছাপা হয়েছে তা ‘মিথ্যা’। এদের ঘরে খাবারের কোনও অভাব নেই। এদের বাবা-মায়ের কোনও অভিযোগ নেই। জেলাশাসক আরও জানান, ঘটনাটির পর তাদের ওয়েনাড়ের একটি আবাসিক স্কুলে ভর্তি করে দেওয়া হয়। কিন্তু সেখান থেকেও তারা পালিয়ে যায়। আপাতত তাদের বাড়ির কাছে একটি স্কুলে ভর্তি করে দেওয়া হয়েছে।

সুতরাং গোটা ঘটনা থেকে পরিষ্কার আবর্জনায় অন্য ধরনের খাবারের লোভেই ছেলেদু’টি সেখানে আসত। এটা তাদের অভ্যাসে পরিণত হয়ে গিয়েছিল। তা ছাড়া তাদের পোশাকআশাক দেখেও মনে হয়, খুব একটা দুঃস্থ ঘরের সন্তান নয় তারা।

এর পর আসা যাক সোমালিয়ার সঙ্গে কেরলের তুলনার প্রসঙ্গ। মানুষ কেমন আছেন তা বোঝাতে একটি সূচক ব্যবহার করা হয় – মানব উন্নয়ন সূচক (এইচডিআই)। প্রথমেই জানিয়ে রাখা যাক, এই সূচকের নিরিখে কেরল ভারতের শীর্ষতম রাজ্য। ২০১১-এর জনগণনা অনুযায়ী কেরলের এইচডিআই ০.৯২০, যা বিশ্বের অনেক উন্নত দেশের চেয়ে বেশি। ভারতের এইচডিআই ০.৫৪৩। আর যার সঙ্গে মোদীজি কেরলের তুলনা করেছেন সেই সোমালিয়ার ০.২৮৫। নবজাতক শিশুমৃত্যুর হার কেরলে প্রতি হাজারে ১২, সারা ভারতে ৪০ আর সোমালিয়ায় ৯০। এ ক্ষেত্রে কেরলের সঙ্গে বিজেপিশাসিত দু’টি রাজ্য গুজরাত ও মধ্যপ্রদেশের তুলনা করা বোধহয় অপ্রাসঙ্গিক হবে না – গুজরাতে প্রতি হাজারে ৩৬ এবং মধ্যপ্রদেশে ৫৭।   আর পাঁচ বছরের শিশুর ক্ষেত্রে মৃত্যুর হার কেরলে হাজারে ১৪, ভারতে ৬৯ এবং সোমালিয়ায় ১৪৬।

আসলে কেরলে বিধায়কসংখ্যার নিরিখে বিজেপির উপস্থিতি জোরদার করার প্রয়াসে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী বাড়াবাড়ি করে ফেলেছেন। আরও মারাত্মক ভুল করেছেন সোমালিয়ার সঙ্গে তুলনা করে। দলমত নির্বিশেষে কেরল এখন প্রতিবাদমুখর। প্রধানমন্ত্রীর সমালোচনায় এখন এক সুর মুখ্যমন্ত্রী ওমেন চান্ডির আর সিপিএম নেতা প্রকাশ কারাতের। দু’ জনেই বিবৃতি প্রত্যাহারের পাশাপাশি দাবি করেছেন, কেরলের মানুষের কাছে প্রধানমন্ত্রীকে মার্জনা চাইতে হবে। মোদীর সমালোচনার বন্যায় ভেসে যাচ্ছে সোশ্যাল মিডিয়া। এ ক’দিন টুইটারে একটাই দাবি ‘পো মনে মোদী’। ‘পো মনে’ কেরলে একটি জনপ্রিয় শব্দগুচ্ছ। কেরলের জনপ্রিয় তারকা মোহনলাল অভিনীত একটি ব্লকব্লাস্টার ফিল্ম থেকে নেওয়া। এর অর্থ, ‘পুত্র, তুমি বরবাদ হয়ে গেছ, ভালো হয়, বাড়ি যাও’।

নিজের বিবৃতি থেকে সরে এসে বা তা ব্যাখ্যা করে এখনও পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রীর তরফে নতুন কোনও বিবৃতি জারি করা হয়নি। সামাজিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে সাফল্যের ব্যাপারে ভারতের সর্বাধিক শিক্ষিত রাজ্য কেরল খুবই স্পর্শকাতর। প্রধানমন্ত্রীকে চূড়ান্ত জবাবটা তাঁরা হয়তো ১৬ মে-ই দেবেন।

সৌজন্যে: মাত্রুভূমি, দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস, ডেলি ও, দ্য হাফিংটন পোস্ট

বিজ্ঞাপন
loading...

মতামত দিন

Please enter your comment!
Please enter your name here