বিএমডব্লু এলে কি বাংলার শিল্পায়নের সাধপূরণ হবে

0
138

nilanjan-duttaনীলাঞ্জন দত্ত

বিএমডব্লুর অতিথি আপ্যায়ন সত্যিই অসাধারণ। তাতেই ভুললেন না তো পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী-সহ শিল্পসন্ধানী দলের সদস্যরা? প্রশ্নটা মাথার মধ্যে ঘুরপাক খেতে শুরু করেছিল এই খবরটা দেখার পর থেকেই, যে তাঁরা জার্মানির মিউনিখে গিয়ে বৈঠক করে জানিয়েছেন, এই গাড়ি কোম্পানি বাংলায় কারখানা গড়তে আগ্রহী। তার পর থেকে অনেকে বলছেন, ওরা এলে এখানে শিল্পায়নে একটা ঐতিহাসিক ঘটনা ঘটবে। অনেকে আবার মনে করিয়ে দিচ্ছেন, এ কোনো ভুঁইফোঁড় কোম্পানি নয়, এর একটা ঐতিহ্য আছে।

দেখলাম রাজ্যের শিল্পমন্ত্রী ৬ সেপ্টেম্বর টুইট করেছেন – All options open for BMW to invest in #Bengal। মনে হল, আগে কোথায় যেন শুনেছি কথাটা!

শুনেছিলাম বিএমডব্লুর মিউনিখ কারখানাতেই বসে, ২৬ বছর আগে। পশ্চিমবঙ্গ-সহ ভারতের যে কোনও জায়গায় বিনিয়োগের ‘অপশন’ খোলা আছে, বলেছিলেন এই কোম্পানিরই আন্তর্জাতিক অপারেশনস-এর কর্তা। তাঁদের কারখানার বিস্তীর্ণ জমির মাঝখানে এক টাওয়ারের চুড়োয় বসে ‘রোস্টেড ডাক’ সহযোগে লাঞ্চ সারতে সারতে।

আপ্যায়ন সত্যিই ছিল মুগ্ধ করে দেওয়ার মতো। কিন্তু ততক্ষণে একপাক ঘুরে এসে একটা প্রশ্ন মনে জাগছিল – এত বড়ো কারখানায় এত কম শ্রমিক দেখলাম কেন? উত্তরটা সহজ – এখানকার অনেক কাজই যে যন্ত্রই করে দেয়। অতঃপর আর একটা প্রশ্নও মনে উঁকি দিয়ে গিয়েছিল – তাহলে আমাদের মতো দেশে এরা এলে মানুষের চাকরির কি সুরাহা হবে?

যেখানেই সুযোগ সেখানেই বিনিয়োগ, কজন চাকরি পেল তাতে কিছু আসে যায় না। সেদিন ওই কোম্পানি কর্তা বলেছিলেন, তাঁরা অপেক্ষা করছেন শুধু ভারত তার অর্থনীতিতে, বিশেষত অটোমোবাইল সেক্টরে, বিদেশি বিনিয়োগের পক্ষে আরও অনুকূল নীতি নেওয়া পর্যন্ত। আরও বহু দিন অপেক্ষা করতে হয়েছে। অবশেষে বছর দশেক আগে বিএমডব্লু এ দেশে পুরোদমে কাজ শুরু করে দিয়েছে। তার ফলে অবস্থাটা কী দাঁড়িয়েছে?

গুড়গাঁওতে তার সদর দপ্তর, চেন্নাইতে মূল কারখানা, মুম্বাইতে অটো পার্টসের গুদাম। এই সব কিছু নিয়ে কর্মিসংখ্যা মাত্র ৬৫০। আর ডিলার ও সার্ভিস নেটওয়ার্কে আরও ১,২০০ জন।

এই কোম্পানি প্রিমিয়াম অটোমোবাইল সেক্টরে যেমন পৃথিবীতে এক নম্বর, তেমনি কর্মসংস্থানের হিসেবে সবার পেছনে। সেই যে কবে মিউনিখে গিয়ে দেখেছিলাম, যন্ত্র কীভাবে তার কারখানায় মানুষকে হঠিয়ে দিয়েছে, আজ সেই প্রক্রিয়া বহুদূর এগিয়ে গেছে। আমরা ঐতিহ্যের কথা বলছিলাম না? হ্যাঁ, বিএমডব্লু এবছর তার শতবার্ষিকী উদযাপন করছে। এক সময়, ১৯৩০-৪০-এর দশকে, সেখানে হাজার হাজার দাস-শ্রমিক কাজ করত। তারা আসত নাৎসিদের বন্দিশিবির থেকে। হিটলারের উত্থানের পেছনে যে জার্মান কোম্পানিগুলির হাত ছিল, বিএমডব্লু তাদের মধ্যে অন্যতম। এখন তো আর দাস-শ্রমিক পাওয়া যায় না। তাই তাদের প্রযুক্তি গবেষণার মূল লক্ষ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে, কীভাবে শ্রমিক কমানো যায়।

ফলও মিলেছে চমৎকার। এমনকি এরা রোবটিক্সের এক মূল নীতিকেই উলটে দিয়েছে, যে মানুষের খুব কাছাকাছি রোবটরা কাজ করবে না। ২০১৩ থেকে একই অ্যাসেম্বলি লাইনে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে সেখানে মানুষ আর রোবট দিব্যি একই কাজ করছে।

তবে হ্যাঁ, মানুষই হোক বা রোবট, তাকে কিন্তু মাটিতে দাঁড়িয়েই কাজ করতে হয়। তাই কারখানা করতে এখনও জমি লাগে। আর গাড়ির কারখানায় অনেক জমি লাগে। বিএমডব্লুর মিউনিখ কারখানা দাঁড়িয়ে আছে ৫ লক্ষ বর্গমিটার জায়গার ওপর।

এখানেও জমি লাগবে। ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায় যাঁরা জমি দেবেন, এই কারখানায় তাঁদের বা তাঁদের সন্তানদের ঠাঁই হবে কি? রোবটদের পাশাপাশি যে কজন মানুষ কাজ করবেন, তাঁদের হতে হবে অত্যাধুনিক প্রযুক্তিতে অতি দক্ষ শ্রমিক। তাঁদের যেখান থেকেই পাওয়া যাক সেখান থেকেই আনা হবে। মিউনিখ কারখানায় এখন যে ৭,৭০০ জন কাজ করেন, তাঁরা এসেছেন ৫০টি দেশ থেকে।

যাঁরা শিল্পায়ন করে বাংলার উন্নয়ন করতে চান, তাঁরা এসব কথা ভেবেছেন তো?

বিজ্ঞাপন
loading...

মতামত দিন

Please enter your comment!
Please enter your name here