সন্ত্রাস উপেক্ষা করে কলন্দর শা’র মাজারে রোজ চলছে জোরদার ‘ধমাল’

0
192

হামলার ভয় উপেক্ষা করে লাল শাহবাজ কলন্দরের মাজারে নৃত্যশিল্পী, শীমা কেরমানির ‘ধমাল’।

nilanjan-duttaনীলাঞ্জন দত্ত:

পাকিস্তানে এক প্রতিবাদের উৎসব শুরু হয়েছে। বিস্ফোরণে তছনছ হয়ে যাওয়া এক সৌধে সন্ত্রাসী হামলার ভয় আর সাঁজোয়া পুলিশের রক্তচোখকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে ঢুকে পড়ে রোজ বিকেলে পায়ে পায়ে নাচের ঝড় তুলছে শ’’য়ে শ’য়ে মানুষ। নারী, পুরুষ, তরুণ, বৃদ্ধ, গ্রাম-গ্রামান্তর থেকে আসা লোকশিল্পীরা, শহুরে ছাত্র-ছাত্রী, সকলে মিলে সুরে আর রঙে ভরিয়ে তুলছে সেই চত্বর, যেখানে কয়েক দিন আগেই চার পাশে পড়ে ছিল শুধু ছিন্নভিন্ন দেহ, শোনা যাচ্ছিল কেবল আহতদের আর্তনাদ। এই না হলে কলন্দর শা’র কেরামতি!

সিন্ধ প্রদেশে করাচির উপকণ্ঠে সেহওয়ান শহরে লাল শাহবাজ কলন্দরের মাজারে ১৬ ফেব্রুয়ারি যে বিস্ফোরণ ঘটেছিল, তাতে নিহতের সংখ্যা এখনও পর্যন্ত ৯০, আহত কয়েকশো মানুষ। পাকিস্তানি সংবাদমাধ্যমের খবর, বৃহস্পতিবার সন্ধ্যার স্বাভাবিক ভিড়ের মধ্যে এই মারাত্মক আঘাত হেনেছিল ওই প্রদেশেরই হাফিজ ব্রোহি গোষ্ঠী, যারা দায়েশ বা ইসলামিক স্টেট-এর শাসন কায়েম করবার জন্য উঠেপড়ে লেগেছে।

দ্বাদশ-ত্রয়োদশ শতকের পীরের সমাধিক্ষেত্রে ১৩৫৬ সালে বানানো এই দরগা আজও উপমহাদেশের খোলা হাওয়ার সংস্কৃতির গর্বিত নিশান। ১৬ ডিসেম্বর ২০০৩ সকালবেলা পাহাড়তলির এই প্রাচীন শহরে এসে আমরা, ‘শান্তি ও গণতন্ত্রের জন্য পাক-ভারত গণমঞ্চ’-র কয়েক জন প্রতিনিধি, সে কথা খুব ভালোভাবেই বুঝেছিলাম। সে দিন লিখেছিলাম, “বিশাল গম্বুজওয়ালা মাজারের ভেতরে ঢুকে ধাঁধা লাগে। ভুল করে কৃষ্ণের মন্দিরে এলাম না তো? চার দিকে ছোটো বড়ো অসংখ্য ঝুলা বা দোলনা ঝুলছে – ঝুলেলালের প্রিয় আসন।”

বাগদাদের এক পীরের বংশে আফগানিস্তানের মারবন্দ-এ জন্ম নেওয়া মহম্মদ ওসমান মারবন্দি কী ভাবে শাহবাজ কলন্দর শাহ হয়ে গিয়েছিলেন, সে কাহিনি আমাদের নিশ্চিত করে জানা নেই। শুধু এইটুকু জানি, সিন্ধু অববাহিকায় এসে পাশতো, পার্শি, আরবি, সিন্ধি আর সংস্কৃতয় ভালোবাসার কথা শুনিয়ে আর এখানকার মানুষের ভালোবাসায় সিঞ্চিত হয়ে তিনি আরও এক আদরের নাম পেয়েছিলেন – ঝুলেলাল। এই নামেই এখনও বেশির ভাগ মানুষ তাঁকে ডাকে। এবং হিন্দু সিন্ধিরা সত্যিই বিশ্বাস করে, তিনি কৃষ্ণেরই এক রূপ। ধর্ম নির্বিশেষে সবাই তাঁর দরগায় এসে চার পাশের গাছে গাছে লাল সুতো বেঁধে দেয় মনোবাঞ্ছা পূর্ণ হওয়ার আশায়।

 

 

এই পীরের প্রিয় রং লাল। তাই ‘লাল সাঁই’ বলেও লোকে তাঁকে ডাকে। ‘লাল’ কথাটা বার বার ফিরে ফিরে এসেছে তাঁর উদ্দেশে আমির খসরুর লেখা আর বুল্লে শা’র গাওয়া ‘দমাদম মস্ত কলন্দর’ গানে। আবার জনগণের চেতনায় এতই ঝড় তুলেছে এই গান, যে এমনকি পাকিস্তানের কমিউনিস্ট বিপ্লবীরাও তাকে কেবল গ্রহণই করেনি, এখানে ‘লাল’ শব্দটিকেও নতুন অর্থ দিয়েছে। ‘লাল’ নামে যে গণসঙ্গীতের ব্যান্ড সম্প্রতি সে দেশের সাংস্কৃতিক আন্দোলনে বিশিষ্ট জায়গা করে নিয়েছে, তারা “দমাদম মস্ত কলন্দর/আলি দা পহেলা নম্বর”-এর মধ্যে নিজেদের কথা বসিয়ে দিব্যি গেয়ে ওঠে, “দমাদম মস্ত কলন্দর/মাও দা পহেলা নম্বর… লাল মেরি… লাল লাল লাল লাল কলন্দর…” – আর শ্রোতারা হাতে হাতে রক্তপতাকা দুলিয়ে সাড়া দিতে থাকে! কোনো সন্দেহ নেই, মৌলবাদী সন্ত্রাসীরা চিন্তাভাবনা করেই তাদের লক্ষ্যস্থল বেছেছিল।

ঘটনার পর পুলিশ মাজার বন্ধ করে দিয়েছিল। কিন্তু দু’দিন যেতে না যেতেই জনতার ক্ষোভ ফেটে পড়ল। “আমাদের নিরাপত্তা দিতে পারোনি যখন, সাঁইয়ের কাছে যেতে আমাদের আটকানোরও তোমাদের কোনো অধিকার নেই,” বলে তাদের ঠেলে সরিয়ে দিয়ে ঢুকে পড়ল শ’য়ে শ’য়ে শোকসন্তপ্ত মানুষ। আর ঢুকে তারা শুরু করল তুমুল ‘ধমাল’ – ভালোবাসার ভাবোন্মাদনার গান আর নাচ – যা এই উপমহাদেশ শিখেছে কলন্দর শাহ, বুল্লে শাহর মতো সুফিদের কাছে, চৈতন্যদেবের কাছে, লালন সাঁইয়ের কাছে। ঘৃণার বিরুদ্ধে, বিভেদের বিরুদ্ধে, অমানবিকতার বিরুদ্ধে এটাই তাদের চরম শক্তিশালী প্রতিবাদ।

আর এই প্রতিবাদের সমারোহের কেন্দ্রবিন্দুতে এসে দাঁড়ালেন পাকিস্তানের সবচেয়ে মানী শাস্ত্রীয় নৃত্যশিল্পী, শীমা কেরমানি। তিনি এবং তাঁর সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘তেহরিক-ই-নিসওয়ান’ নিজেরাই তাদের শাসন না মানা নাচ-গানের জন্য বার বার একদিকে সরকারি নিষেধাজ্ঞা, আরেক দিকে মৌলবাদীদের হুমকির শিকার হয়েছে। বহুকাল ধরেই তাদের আক্ষরিক অর্থে জীবন বাজি রেখে অনুষ্ঠান করতে হয়। এ হেন শিল্পী যখন বিধ্বস্ত দরগায় ত্রাসের রক্তচোখে চোখ রেখে লাল জামা পড়ে ধমাল করলেন, জনতার মনে যেন এক বিদ্যুৎতরঙ্গ খেলে গেল। দলে দলে মানুষ, বিশেষ করে অনেক মেয়েরা এসে ধামালে যোগ দিল, ক্ষ্যাপার মতো নাচতে নাচতে, গাইতে গাইতে সেই ধমাল মাজারের চৌহদ্দি থেকে বেরিয়ে নেমে এল রাস্তায়, এক স্বতঃস্ফূর্ত শোভাযাত্রায় পরিণত হল, আর কী আশ্চর্য, কারা যেন সেই সুর-ছন্দের চলমান প্রতিবাদকে অভিনন্দন জানাল পুস্পবৃষ্টি করে।

“সিন্ধ-এর মাটি সব সময়েই ঢোলের শব্দে, নাচের তালে আর সেই মহান সুফিসন্তদের কবিতায় অনুরণিত হয়েছে, যাঁরা আমাদের এই সব কিছু শিখিয়েছেন – আর আমি এই ধমাল করেছি সকলকে নিয়ে, আমার সমস্ত মন আর হৃদয় দিয়ে – যারা নিহত হয়েছে তাদের জন্য শোক যেমন আছে, তেমনই আছে এই আশা, যে জীবন চলতেই থাকবে সৌন্দর্য আর ভালোবাসা নিয়ে,” ফেসবুকে সবাইকে জানিয়েছেন শীমা।

শীমা কেরমানি ২০০৪ আর ২০০৯ সালে দু’বার পশ্চিমবঙ্গে ঘুরে গেছেন, তেহরিক-ই-নিসওয়ান নাচ-গান-নাটক করেছে কলকাতা, দুর্গাপুর আর বহরমপুরে, ‘শান্তি ও গণতন্ত্রের জন্য পাক-ভারত গণমঞ্চ’, নান্দীকার, আইসিসিআর ও যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের আতিথ্যে। সেই অনুষ্ঠানগুলি যাঁরা দেখেছেন, তাঁরা সহজেই বুঝবেন তাঁর এই জীবনবোধ আর শিল্পবোধকে। রবীন্দ্রনাথের ‘চিত্ত যেথা ভয়শূন্য’-র অনবদ্য নৃত্যরূপ দিয়ে তিনি তাঁর দেশের মৌলবাদীদের রোষানলে পড়েছেন, কিন্তু থামতে রাজি হননি। তাঁর দুঃসময়ে এ দেশের রবীন্দ্রভক্তরা কেউ তাঁর সমর্থনে একটা শব্দও খরচ করেননি, তাতে তাঁর কিছু আসে-যায় না।

কলন্দর শা’র দেখানো ভালোবাসার পথের পথিকদেরও কিছু আসবে-যাবে না “দমাদম মস্ত কলন্দর” গানের সঙ্গে যারা এখানে হাজার বার নেচেছে, তারা এই সঙ্কটের সময় পাশে না থাকলে। যারা একবার চিত্তকে ভয়শূন্য করতে পেরেছে, তারা ধ্বংসের মুখোমুখি দাঁড়িয়েও ধমাল করেই যাবে।

বিজ্ঞাপন
loading...

মতামত দিন

Please enter your comment!
Please enter your name here