২১ বছরের ক্যালেনের মুখ নিয়ে নতুন করে বাঁচছেন মিনেসোটার অ্যান্ডি

0
123

মুখমণ্ডল প্রতিস্থাপনের পর অ্যান্ডি স্যান্ডনেস

মিনেসোটা (মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র): ডাক্তার যখন তাঁর মুখের সামনে আয়নাটা ধরলেন, কী বলবেন ভেবে পাচ্ছিলেন না অ্যান্ডি। তিনি অভিভূত। এতটা তিনি আশা করেননি। তাঁর মুখমণ্ডল একেবারে নতুন হয়ে গিয়েছে। তবে সেখানে বসেছে অন্য লোকের মুখ। হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে তিনি। কিছু বলতে চান, কিন্তু বলতে পারছেন না। নার্স একটা স্পাইরাল নোটবুক এগিয়ে দিলেন। কাঁপা কাঁপা হাতে তাতে লিখলেন, “যা আশা করেছিলাম, তার চেয়ে অনেক বেশি।”

অ্যান্ডি স্যান্ডনেস-এর মুখমণ্ডলে এখন ক্যালেন রস-এর মুখ। মুখমণ্ডল প্রতিস্থাপনের পর নতুন করে বাঁচার আনন্দ খুঁজে পেয়েছন অ্যান্ডি।

কী ঘটেছিল এঁদের জীবনে?

পিছিয়ে যাওয়া যাক বছর দশেক।

২০০৬-এর খ্রিস্টমাসের দু’ দিন আগে বেদম নেশার ঝোঁকে জীবনকে শেষ করে দেওয়ার চেষ্টা করেন অ্যান্ডি। রাইফেল থেকে গুলি করে বসেন নিজেকে। পরক্ষণেই বুঝতে পারেন, মারাত্মক ভুল করে ফেলেছেন তিনি। ঘটনাস্থলে পুলিশ আসে। অফিসারটি আবার তাঁর বন্ধু। বন্ধুর হাত এমন ভাবে ধরে থাকেন অ্যান্ডি, যেন বলতে চান, “দয়া করে আমাকে মরতে দিও না। আমি মরতে চাই না।”

মা ছুটে আসেন। যে মা চট করে ভেঙে পড়েন না, সেই মা ছেলেকে দেখে বেদনার্ত হয়ে ওঠেন। একটা বুলেট এফোঁড়ওফোঁড় করে দিয়েছে মুখ। জ্ঞান ফেরার পর ছেলে কাগজের ওপর পেন দিয়ে আঁচড় কেটে ক্ষমা চায়।

কিন্তু বাঁচতে চায় অ্যান্ডি। ভালো ভাবে বাঁচতে চায়। কিন্তু কেমন করে তা সম্ভব?

সাক্ষাৎ হয় প্লাস্টিক সার্জন ডাঃ সমির মারদিনির সঙ্গে। তিনি তাঁকে আশ্বস্ত করেন। তেমন ভরসা পান না অ্যান্ডি। কারণ মুখ বলে তো তাঁর প্রায় কিছুই নেই – নেই নাক, নেই চোয়াল, ঠোঁট নেই বললেই চলে, মাত্র দু’টি দাঁত, বাঁ চোখে দৃষ্টি অনেকটাই গেছে, গোড়ার দিকে খাওয়া আর নিঃশ্বাস নেওয়ার জন্য টিউব লাগত।

তবু ডাঃ মারদিনি আশ্বাস দেন, তিনি যথাসাধ্য করবেন।

আটটা অস্ত্রোপচারের পর অ্যান্ডি ছোট্টো শহর ওয়াওমিং-এ তাঁদের ঘরে ফিরে যান। কাজ করতে শুরু করেন। লজে কাজ করেন, তেলের কূপে কাজ করেন, ইলেক্ট্রিশিয়ানের অ্যাপ্রেন্টিস হিসাবে কাজ করেন। কিন্তু কোনো কিছু যেন স্বাভাবিক নয়। কারও মুখের দিকে চোখ তুলে তাকাতে পারতেন না, বিশেষ করে শিশুদের দিকে। তারা তাঁর বীভৎস মুখ দেখে ভয় পেয়ে যাবে যে!

ফিরে পাওয়া জীবনে একটু একটু করে অভ্যস্ত হতে শেখেন তিনি। মুখগহ্বরটা মাত্র ১ ইঞ্চি। একটা চামচ পর্যন্ত ঢোকানো যায় না। তাই যে কোনো খাবার একেবারে টুকরো টুকরো করে কেটে খেতে হয়। কৃত্রিম নাকটা প্রায়ই খুলে পড়ে যায়। তাই সঙ্গে আঠা রাখতে হয়। পড়ে গেলে তা তুলে লাগিয়ে নেওয়ার জন্য। মাঝেমাঝেই নাকটাকে চামড়ার রঙের সঙ্গে মিলিয়ে রঙ করে নিতে হয়।

তার পর ২০১২-তে আশার আলো জাগে। মিনেসোটার রচেস্টারের মেয়ো ক্লিনিক থেকে ডাঃ মারদিনি ফোনে জানান, তাঁর ক্লিনিক মুখমণ্ডল প্রতিস্থাপনের কর্মসূচি নিয়েছে। সে ক্ষেত্রে তিনি অ্যান্ডির মুখমণ্ডল প্রতিস্থাপন করতে পারেন।

andy-bhetor
অপারেশনের আগে অ্যান্ডি।

তা তো হল। কিন্তু দাতা পাওয়া যায় কোথায়?

২০১২ থেকে ২০১৬ – চার বছরের প্রতীক্ষা। জুটে যায় দাতা। মিনেসোটারই ২১ বছরের ক্যালেন রস। একটা জায়গায় অ্যান্ডির সঙ্গে রসের মিল। দু’ জনেই আত্মহত্যার চেষ্টা করেছিলেন। অ্যান্ডি ব্যর্থ, কিন্তু ক্যালেন সফল।

ক্যালেনের  ১৯ বছরের স্ত্রী লিলি জানান, মৃত্যুর আগে ক্যালেন তাঁর অঙ্গপ্রত্যঙ্গ দান করার ইচ্ছা প্রকাশ করে গিয়েছেন। সেইমতো তাঁর হার্ট, লাং, লিভার আর কিডনি দান করা হয়। কিন্তু ক্যালেনের দেহ পরীক্ষা করে দেখা যায়, আরও কিছু দান করতে পারেন তিনি। তাঁর মুখমণ্ডল মেয়ো ক্লিনিকে চিকিৎসাধীন অ্যান্ডির মুখমণ্ডলে প্রতিস্থাপন করা যায়।

“আমি প্রথমে খুব একটা রাজি ছিলাম না। আমি চাইনি পথ চলতে গিয়ে হঠাৎ দেখব আমার স্বামী ক্যালেন ঘুরে বেড়াচ্ছে” – বলছিলেন লিলি।

তবে চিকিৎসকরা তাঁকে আশ্বাস দেন, স্যান্ডনেসের চোখ ও কপাল তাঁর নিজেরই থাকবে, চোখের নীচে থেকে বাকিটা প্রতিস্থাপন করা হবে। তাই হুবহু তাঁর স্বামীর চেহারা অ্যান্ডি পাবেন না।

মিনোসোটার রচেস্টারে মেয়ো ক্লিনিকে গত বছর জুন মাসে এই বিরল ও জটিল অস্ত্রোপচার করেন ডাক্তার সামির মারদিনি, যিনি মুখমণ্ডল পুর্নগঠন বিষয়ে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক। ৫৬ ঘণ্টার ম্যারাথন অপারেশন, যা দেখতে পাশের কক্ষে ভিড় জমিয়েছিলেন প্রায় ৬০ জনের একটি দল, যার মধ্যে ছিলেন সার্জন, নার্স,  অ্যানেস্থেটিস্টস ও আরও অনেকে।

অ্যান্ডি এখন ধীরে ধীরে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার জন্য প্রশিক্ষিত হচ্ছেন। মুখের মাসলগুলো একটু একটু করে শক্ত হচ্ছে। নতুন মুখগহ্বর আর চোয়াল নিয়ে জিভ ব্যবহার করে কী করে কথা বলা যায় তার জন্য স্পিচ থেরাপি চলছে। আবার গন্ধ পাচ্ছেন, স্বাভাবিক ভাবে শ্বাস নিচ্ছেন আর এক দশক ধরে যে খাবারগুলো ধরাছোঁয়ার বাইরে ছিল, সেই আপেল, পিৎজা, স্টিকের স্বাদ নিচ্ছেন।

৩১ বছরের অ্যান্ডি আবার ফিরে যাবেন ওয়াওমিং-এ। ইলেক্ট্রিশিয়ানের কাজ করবেন, বিয়ে করবেন।

মাঝে একটা আইস হকি ম্যাচ দেখতে গিয়েছিলেন। পপকর্ন খেতে খেতে খেলা দেখছিলেন। দেখলেন, কেউ তাঁর দিকে ভয়ে ভয়ে বা আড়চোখে তাকাচ্ছে না, কেউ তাঁকে দেখে ফিশফিশ করছে না।

আহ! কী স্বস্তি!

অ্যান্ডি তাঁর দাতার স্ত্রী লিলিকে দেখেননি। কিন্তু তাঁকে ভোলেননি। চিঠি লিখে তাঁকে অকুণ্ঠ ধন্যবাদ জানিয়েছেন। তাঁর নতুন জীবন তো ক্যালেন-লিলিরই সৌজন্যে পাওয়া।

বিজ্ঞাপন
loading...

মতামত দিন

Please enter your comment!
Please enter your name here