কাশ্মীরের মানুষের স্বাধীনতার জন্য লড়েছিল বুরহান, বললেন বাবা

0
104

গত ৮ জুলাই ভারতীয় নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে নিহত হন হিজবুল মুজাহিদিনের কমান্ডার বুরহান ওয়ানি। সেই মৃত্যুকে ঘিরে তখন থেকেই উত্তাল কাশ্মীর। সোমবার ‘টাইমস অফ ইন্ডিয়া’ পত্রিকায় প্রকাশিত  হয়েছে বুরহানের বাবা মুজফফর ওয়ানির সাক্ষাৎকার। খবর অনলাইনের পাঠকদের জন্য রইল সেই সাক্ষাৎকারের অনুবাদ।

প্রশ্ন-বুরহানের মৃত্যুর পর কেটে গেছে দু মাস। বিক্ষোভ থামেনি কাশ্মীরে। দায়ী কারা?

হুরিয়ত  কনফারেন্সের তরফ থেকে কোনও বন্ধের ডাক দেওয়া হয়নি। আমাদের কোনও ধারণাই ছিলনা বন্ধ এরকম হিংসাত্মক মোড় নিতে পারে। গত দু মাসে আমরা এত কিছু হারিয়েছি। আমাদের দরকার কিছু অঙ্গীকার। আমার মতো অন্য আরও অনেক পরিবার তাঁদের সন্তানকে হারিয়েছে।

প্রশ্ন-আপনার ছেলের মৃত্যুর পর আপনি কি চাইবেন  নিরাপত্তা বাহিনীর  বিরুদ্ধে কাশ্মীরের তরুণ প্রজন্ম হাতে বন্দুক তুলে নিক?

কখনওই নয়। ভারত পাকিস্তানের মধ্যে আলোচনাটা সবচেয়ে আগে দরকার।

ভারতে আর পাকিস্তানে, দুদেশেই শান্তি ফিরে আসুক। দুদেশের মানুষই আমাদের ভাই। আমরা কাশ্মীরিরা ভারতীয়দের যতটা ভালবাসি, পাকিস্তানিদেরও ততটাই।

প্রশ্ন-উরিতে ১৮ জন ভারতীয় সেনার মৃত্যু হয়েছে। এই ঘটনায় পাকিস্তানের হাত আছে বলে প্রমাণ পাওয়া গেছে। আপনি এই ঘটনাটিকে কীভাবে দেখছেন?

পাকিস্তানের হাত কীভাবে হয়?  জঙ্গি হওয়ার পর কাশ্মীরে প্রবেশ করা যে  কারোর পরিচয়, সে কাশ্মীরি। এমনকি হিন্দুস্তান থেকে কোনও মুসলিমও আসতে পারেন। এটা কাশ্মীরি জঙ্গিহানাও হতে পারে।

প্রশ্ন- পাঠানকোটের ঘটনায় সন্ত্রাসবাদীদের তাদের পরিবারের সাথে পাকিস্তানে ফোন কল করার খবর পাওয়া গেছিল। জইশ-ই-মহম্মদ ইতিমধ্যে ভারতীয় এজেন্সিকে নকল করে একটি অডিও প্রকাশ করেছে।

কাশ্মীর সমস্যার সমাধান না করলে এই ধরনের আক্রমণ চলতে থাকবে। কিন্তু এই জঙ্গিরা আসছে কোথা থেকে? সীমান্ত তো ভারতীয় সেনা সিল করে রেখেছে। তাহলে সেখান থেকে জঙ্গিরা পাম্পোর পর্যন্ত আসছে কিভাবে? আর জাইশের বিরুদ্ধে যদি প্রমাণ থাকে,তা নিয়ে তদন্ত করা উচিত।

প্রশ্ন- বুরহানের ঘর ছাড়ার খবর কিভাবে পেয়েছিলেন? পরিবারের সবাই কীভাবে নিয়েছিল এই ঘটনা?

২০১০ সালে ৫ অক্টোবর ঘর ছাড়ে বুরহান। যাওয়ার সময় মাকে বলে গিয়েছিল এক বন্ধুর সঙ্গে দেখা করতে যাচ্ছে। সন্ধেবেলা আর ফেরেনি বুরহান। পরে ওর জঙ্গিদলে যোগ দেওয়ার খবর পাই। বুরহানের মৃত্যুর মাস দুয়েক আগে অবধি ওকে বোঝানোর আপ্রাণ চেষ্টা করেছিলাম। ১৯৯৪ এ যখন বুরহান জন্মায়, কাশ্মীর তখন ভয়ঙ্কর অস্থির। ওর বড় হওয়াও ওই একই পরিবেশে। বয়স যখন বছর দশেক, বুরহান বলতো ও ভারতীয় সেনা বাহিনীতে যোগ দিতে চায়। ছদ্মবেশ নিতে ভারী ভালবাসত ছেলেটা। ক্রিকেট খেলতেও। দেশের হয়ে খেলতে চাইত। পাকিস্তানের নয়, ভারতের হয়ে।burhan

প্রশ্ন- বুরহানের ঘর ছেড়ে চলে যাওয়া, জঙ্গিদলে নাম লেখানো, এসব মেনে নেওয়া কতটা কঠিন ছিল?

সহজ ছিলনা একেবারেই, কিন্তু সময়ের সাথে সাথে এই অভাবটার সঙ্গে মানিয়ে নিতে শিখে গিয়েছিলাম আমরা। শেষ ৫ বছরে ওর সঙ্গে দেখা হয়েছিল বার তিনেক। তাও মাত্র দু-তিন মিনিটের জন্য। শেষবার দেখা হয় আড়াই বছর আগে। ও নিজের মতো চলতো। আমি একটা সরকারি চাকরি করেছি আমার পরিবারের জন্য, আর বুরহান কাজ করেছে গোটা কাশ্মীরের জন্য।

প্রশ্ন-আপনার বাকি সন্তানেরা বুরহানের জঙ্গি দলে যোগ দেওয়ার ঘটনাকে ঠিক কীভাবে নিয়েছিল?

বুরহানের চার বছরের বড় দাদা খালেদ ২০১৫ সালের এপ্রিল মাসে একটা পিকনিকে গিয়ে নিহত হয় নিরাপত্তা বাহিনীর হাতেই। পুলিশের বিশ্বাস ছিল খালেদ বুরহানের সঙ্গে দেখা করতে গেছিল। খুব অত্যাচার করা হয়েছিল খালেদের ওপর। ওর তিন বন্ধুকেও আটক করা হয়েছিল, পরে ছাড়া পায় ওরা।

প্রশ্ন-পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফের রাষ্ট্রপুঞ্জের বক্তৃতায় উঠে এসছে বুরহানের প্রসঙ্গ।

ভগত সিং যখন ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে লড়েছিল, ইংরেজদের চোখে সে ছিল সন্ত্রাসবাদী। ভারতীয়দের কাছে ভগত সিং সব সময় একজন স্বাধীনতা সংগ্রামীই থেকেছে। কাশ্মীর সমস্যার সমাধান হয়ে গেলে দেশ সেদিন জানতে পারবে বুরহানও কাশ্মীরের স্বাধীনতার জন্যই প্রাণ দিয়েছে। শরিফের বলা প্রতিটা কথা আমার ভাল লেগেছে। উনি বলেছেন বুরহানের মৃত্যু কাশ্মীরের মানুষের স্বাধীনতার লড়াইকে এক নতুন আলো দেখিয়েছে।

প্রশ্ন- বুরহানের ভিডিওতে দেশের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে যোগ দেওয়ার জন্য তরুণ প্রজন্মকে প্ররোচিত করতে দেখা গেছে।

বুরহান কখনই ভারতপন্থীদের মারার কথা বলতো না। হিজবুল বিরোধীদের মারার কথা বলতো। কিন্তু দু বছর কম্যান্ডার থাকাকালীন একজনকেও মারেনি বুরহান। শুধু সতর্ক করেছিল। ৮ জন সি আর পি এফ জওয়ান মারা গেল যেদিন, কেঁদেছিল ও।

প্রশ্ন-শ্রী শ্রী রবিশঙ্করেরর সাথে আপনার দেখা করা নিয়ে সমালোচনা হয়েছিল খুব। আসলে কী ঘটেছিল?

আগে থেকে কিছু ঠিক ছিলনা, কেউ ঠিক করে দেয়নি। একটা হাসপাতালে যেতে হয়েছিল আমায়,তখন মাথায় আসে আশ্রমে যাওয়ার কথা। কাশ্মীর সমস্যা নিয়ে কথা হয়েছিল আমাদের। সমাধানের উপায় জিজ্ঞেস করেছিলেন উনি। আমি বলেছিলাম ভারতের নেতাদের উচিত পাকিস্তানের সঙ্গে কথা বলা।

প্রশ্ন- বাজপেয়ীর ‘ইনসানিয়ৎ, কাশ্মীরিয়ৎ, জমহুরিয়ৎ’-এর নীতিকে স্মরণ করেছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। আপনি কী ভাবে দেখছেন ?

উনি হিন্দুস্তানের প্রধান। গত দুমাসে কাশ্মীরে ১০০র বেশি মানুষ নিহত হয়েছে, একবারের জন্যেও শোক প্রকাশ করেননি তিনি। শুধু  ভারতীয় সেনাদের মৃত্যুতেই শোক প্রকাশ করেছেন।

প্রশ্ন- আপনার কখনও ভয় হয় আপনার তৃতীয় সন্তানও বেছে নিতে পারে বন্দুক?

না। সেরকম কিছু হবেনা, আমি নিশ্চিত। আমার সন্তানরা তাদের বাকি দুই দাদাকে দেখেছে । ওরা এখন পড়তে চায়। আমার মেয়ে ইরম এখন কলেজে পড়ছে। ও ভবিষ্যতে শিক্ষক হতে চায়।

প্রশ্ন- আপনার কি কোনও রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা আছে?

আমার এখনও চাকরি জীবন শেষ হওয়ার ৬ বছর বাকি। আমার কোনও রাজনৈতিক দলে যোগ দেওয়ার ইচ্ছে নেই।

প্রশ্ন- বুরহানের মৃত্যু আপনার কাজকে কতটা প্রভাবিত করেছে?

কাশ্মীরি অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিস এবং পুলিশ সার্ভিসের বহু আধিকারিককে তৈরি করতে পেরে আমি গর্বিত। আমি একটি স্কুলের প্রশাসনিক দায়িত্বে আছি, সেখানকার ছাত্রছাত্রীদের ভাল শিক্ষা দিতে চাই। আমার নিজের সন্তান জঙ্গি হয়েছিল বলে আমি কখনওই চাইব না বাকি পরিবারের সন্তানরাও সেই পথে যাক। আমি চাই ছোটো ছোটো ছেলে মেয়েরা ভাল শিক্ষা পাক, ভালো হোক।

বিজ্ঞাপন
loading...

মতামত দিন

Please enter your comment!
Please enter your name here