ছত্তীসগঢ়ের বিতর্কিত আইজিপি কাল্লুরিকে ছুটিতে পাঠানো হল

0
79

রায়পুর: “আমাকে অনির্দিষ্ট কালের জন্য ছুটিতে যেতে বলা হয়েছে। আপনারা আমাকে যে সমর্থন জুগিয়েছেন তার জন্য আমি অত্যন্ত কৃতজ্ঞ। আমি নিশ্চিত, আপনারা আপনাদের ভালো কাজ চালিয়ে যাবেন। আমার পরিবারও আপনাদের ধন্যবাদ জানাচ্ছে। আপনাদের সকলের জন্য শুভেচ্ছা রইল” — এই চিঠি ছত্তীসগঢ়ের বিতর্কিত আইজিপি এস আর কাল্লুরির। বৃহস্পতিবার দুপুর ২টোর একটু পরে একটা হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে পোস্ট করেছেন। তাঁকে যে বসিয়ে দেওয়া হয়েছে সেটাই তিনি জানিয়েছেন ওই চিঠিতে।

এই ছুটিতে যাওয়ার আগে কাল্লুরি তাঁর হার্ট ও কিডনির চিকিৎসার জন্য লম্বা ‘মেডিক্যাল লিভ’ নিয়েছিলেন। মানবাধিকার কর্মীদের ওপর অত্যাচার ও ক্ষমতার অপব্যবহারের যে সব অভিযোগ কাল্লুরির বিরুদ্ধে রয়েছে, তা নিয়ে জবাবদিহি করার জন্য জাতীয় মানবাধিকার কমিশন ৩০ নভেম্বর তাঁকে ডেকেছিলেন। কাল্লুরি সেখানেও হাজির হননি।

মাওবাদীদের বিরুদ্ধে ছত্তীসগঢ়ের লড়াইয়ের গতিপ্রকৃতি সম্পর্কে যাঁরা ঠিক ওয়াকিবহাল নন, তাঁদের কাছে কাল্লুরি একাধারে হিরো এবং ভিলেন। এক স্থানীয় সাংবাদিকের কথায়, “জাতীয় সংবাদ মাধ্যমের কাছে কাল্লুরি ভিলেন, আর আঞ্চলিক মাধ্যমের কাছে তিনি হিরো।”

ভারতের ‘রেড করিডরের’ একেবারে কেন্দ্রস্থলে সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপ খতম করার জন্য কাল্লুরি যে ‘মিশন ২০১৬’ কর্মসূচি ঘোষণা করেছিলেন, তার জন্য অনেকের চোখেই তিনি ‘হিরো’। মাওবাদী আর রাজ্যের লড়াইয়ের জাঁতাকলে পড়ে সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস অবস্থা। তাঁরা ভেবেছিলেন, কাল্লুরির ‘মিশনে’ কাজ হবে। এটা এমন একটা সময়, যখন অন্ধ্রপ্রদেশ থেকে ছত্তীসগঢ়ে ঢুকে ৩০ নম্বর জাতীয় সড়কের দু’ পাশে ৫ কিলোমিটার ভিতরে গেলেই শুরু হয়ে যায় ‘মাওবাদী সরকার’-এর রাজ।

মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলে যাঁরা অবশিষ্ট ভারতের কাছে ছত্তীসগঢ়ের ‘ভাবমূর্তি কালিমালিপ্ত করতেন’, সেই সব ‘বহিরাগতের’ বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়ে কাল্লুরি অনেকের কাছে প্রশংসিত হয়েছিলেন। তিনি সাক্ষী ছাড়া যুদ্ধ ঘোষণা করতে চেয়েছিলেন, যেখানে সাংবাদিক, আইনজীবী, মানবাধিকার কর্মী, নিরপেক্ষ দৃষ্টিসম্পন্ন রাজনীতিবিদরা ছত্তীসগঢ়ে কাজ করার মতো কোনো জায়গা পাবে না। স্থানীয় মানুষ ভেবেছিলেন, মাওবাদীদের বিরুদ্ধে কাল্লুরির লড়াই ছত্তীসগঢ়কে উন্নয়ন আর শান্তির দিশা দেখাবে।

এমনই ছিল ১৯৯৪-এর ব্যাচের এই আইপিএস অফিসারের ‘ম্যাচো ইমেজ’।

এ বার আয়নাটা উলটো করেন ধরুন, দেখবেন কাল্লুরি সম্পর্কে এই সব ভাবনা খাটেও না। আদতে এই মানুষটির ‘খ্যাতি’ তাঁর গা-জোয়ারি কৌশলের জন্য। একটা হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে তাঁর সম্পর্কে ‘স্ল্যাং’ ভাষা প্রয়োগ করার ‘অপরাধে’ এক সাংবাদিককে জেলে পুরেছিলেন কাল্লুরি। তাঁর কাজের পদ্ধতি সম্পর্কে কেউ প্রশ্ন তুললেই তিনি তাঁকে ছত্তীসগঢ় থেকে বের করে দেওয়ার জন্য চাপ সৃষ্টি করতে         ‘অগ্নি’, ‘সামাজিক একতা মঞ্চ’ প্রভৃতি নজরদারি গোষ্ঠীকে উৎসাহ দিতেন।

কাল্লুরির কাছে, যে কেউ তাঁর কাজকর্ম, তাঁর পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন তুললেই সে ভারত-বিরোধী।

সমাজবিজ্ঞানী ও মানবাধিকার কর্মী বেলা ভাটিয়াকে জগদলপুরের কাছে তাঁর বাড়ি থেকে যখন একটি নজরদারি গোষ্ঠী উৎখাত করার চেষ্টা করে, তখন পায়োলি স্বাতিজা নামে এক আইনজীবী কাল্লুরির সাহায্য চেয়েছিলেন। কাল্লুরি এসএমএস-এ তাঁর জবাবে লিখেছিলেন, “নকশালদের বস্তার থেকে লাথি মেরে বের করে দেওয়া হবে।” স্বাতিজা জানিয়েছেন, যখনই সাংবাদিক, সমাজকর্মীদের হয়রানি বন্ধ করার জন্য তাঁর সাহায্য চাওয়া হত, তখনই তিনি নোংরা গালি প্রয়োগ করে তার জবাব দিতেন।

কাল্লুরির অস্ত্রাগারের আর একটি অস্ত্র হল আত্মসমর্পণ। নগদ পুরস্কার আর চাকরির লোভে ২০১৪-র এপ্রিল থেকে ২০১৬-র অক্টোবর পর্যন্ত ১৮৯৮ জন মাওবাদী আত্মসমর্পণ করে। কিন্তু নিন্দুকেরা বলেন, কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের কাছে বাহবা কোড়ানোর জন্য ওই সংখ্যাটা বেশি করে দেখাতে নিরীহ আদিবাসীদের তুলে নিয়ে গিয়েছে পুলিশ, জোর করে তাঁদের দিয়ে কবুল করিয়ে নিয়েছে তাঁরা অপরাধমূলক কাজে লিপ্ত। ২০১৬ সালে ১৩৪ জন মাওবাদীকে ধরার কথাও কাল্লুরি বড়ো মুখ করে বলতেন।

কাল্লুরি এবং তাঁর কাজের সমালোচনা করার সাহস স্থানীয় সাংবাদিকদের ছিল না। প্রকাশিত সংবাদগুলো ছিল একপেশে, সব গোলাপি চশমার মধ্য দিয়ে দেখা। তাঁদের কাজের পদ্ধতি নিয়ে ছত্তীসগঢ় পুলিশকে প্রশ্ন করার সাহস কারও ছিল না। ছত্তীসগঢ় কাল্লুরিই ছিলেন রাজা।

আরেকটা গুরুতর অভিযোগ হল যৌন নিগ্রহ। এ নিয়ে বেশ কিছু মামলা আছে ছত্তীসগঢ় পুলিশের বিরুদ্ধে। তার মধ্যে গুরুতর অভিযোগটি হল বিজাপুরে ১৬ জন আদিবাসী মহিলাকে ধর্ষণ করা। এই ঘটনারই পরিপ্রেক্ষিতে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন নোটিশ জারি করে। এই ঘটনায় কমিশনকে ডেকে আনার ব্যাপারে যাঁরা উদ্যোগী হয়েছিলেন, সেই সব সমাজকর্মীকে কাল্লুরির গালিগালাজ করার এটাও একটা কারণ। তাঁরই চোখের সামনে বস্তার পুলিশ একটা অভিনব কাণ্ড করেছিল,  মানবাধিকার কর্মীদের কুশপুতুল পোড়ানো। বাহিনীর হয়ে যুদ্ধটাকে ব্যক্তিগত পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছিলেন কাল্লুরি।

এখন কাল্লুরি ছুটিতে যাওয়ায় তাঁর পন্থার বিরোধী যাঁরা, তাঁরা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলছেন। কিন্তু তাঁরা বলছেন, শুধুমাত্র প্রথম পদক্ষেপটি নেওয়া হয়েছে – ‘কাল্লুরি ছুটিতে’। এর অর্থ হল, কাল্লুরির চোখের সামনে পুলিশ যে সব বাড়াবাড়ি করেছে বলে অভিযোগ উঠেছে, সে সবের তদন্ত সম্পর্কে রমন সিং সরকার কিছুই বলছেন না। মানবাধিকার কর্মীরা বলছেন, কাল্লুরির বিরুদ্ধে যে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, তাকে তাঁর ‘অপসারণ’ আদৌ বলা যায় না। কাল্লুরিকে একটা সম্মানজনক বিদায়ের পথ দেখানো হয়েছে।

কয়েক মাস আগে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী যখন ছত্তীসগঢ় আসেন, তখন কাল্লুরির সঙ্গে তাঁর করমর্দনের ছবি ‘ভাইরাল’ হয়েছিল। ওই অফিসারের কাজে যে তিনি খুশি, ওই ছবিতে এটাই বোঝানো হয়েছিল বলে এই ঘটনাকে ব্যাখ্যা করা হয়। কিন্তু জাতীয় মানবাধিকার কমিশন যখন ছত্তীসগঢ় সরকারের কড়া সমালোচনা করে, তখন সরকারের মনে হয় কাল্লুরি তাদের গলায় অ্যালবাট্রস পাখি হয়ে বসে আছে।

কিন্তু এ ব্যাপারে রমন সিং সরকার কি ধোয়া তুলসী পাতা? কাল্লুরির পদ্ধতি কোনো গোপনীয় ব্যাপার ছিল না এবং বস্তারে কী ঘটছে রায়পুর জানত। রাজ্যের যে কর্মসূচি সেটাই তো সম্পাদন করতেন কাল্লুরি। তাঁকে দীর্ঘ ছুটিতে পাঠিয়ে সরকার তার দায় এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে।  

সৌজন্যে: ফার্স্টপোস্ট

বিজ্ঞাপন
loading...

মতামত দিন

Please enter your comment!
Please enter your name here