বয়স কোনো বাধা নয়, স্কুলে যাচ্ছেন মহারাষ্ট্রের প্রত্যন্ত গ্রামের বৃদ্ধারা

0
100

মুম্বই: এঁদের কারও বয়স আশি, কারও পঁচাশি। কেউ কেউ তো নব্বইও ছুঁয়েছেন। কিন্তু এঁদের কাছে বয়সটা কোনো বাধাই নয়। এঁরা যে স্কুলে যাচ্ছেন। এঁদের মধ্যে কারও চোখে সমস্যা রয়েছে, কারও কথা বলতে গেলে বুকে ব্যথা হয়, কিন্তু তবুও এঁরা দমবার পাত্র নন। রোজ সকালে গোলাপি শাড়ি পরে, স্লেট-চক সঙ্গে নিয়ে স্কুলে স্কুলে যান এঁরা।

এক বছর আগের ঘটনা। মহারাষ্ট্রের ফাঙ্গানে গ্রামের এক বৃদ্ধার সঙ্গে কথা বলছিলেন বছর চল্লিশের যোগেন্দ্র বাঙ্গার। আক্ষেপের সুরে বৃদ্ধা যোগেন্দ্রকে বলেন, তাঁরা যদি পড়াশোনা জানতেন তা হলে ছত্রপতি শিবাজির ব্যাপারে পড়তেন, জানতেন কেন তাঁকে ভারতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ রাজা বলা হয়। বৃদ্ধার এই আক্ষেপ থেকেই এই স্কুলের ব্যাপারে পরিকল্পনা করে ফেললেন যোগেন্দ্র। গত বছর নারী দিবসের দিনেই এই স্কুলের সূচনা করেন তিনি।

কিন্তু স্কুল শুরু করা তো সহজ নয়। টাকা আসবে কী ভাবে? একটি চ্যারিটি অনুষ্ঠানের আয়োজন করে টাকার ব্যবস্থা করে ফেলেন তিনি। তৈরি করেন একটা ছোট্টো ঘর। এই ঘরেই গত এক বছর ধরে রোজ সকালে পড়াশোনা করতে আসছেন বৃদ্ধারা। বৃহস্পতিবার তাঁদের ছুটির দিন। বৃদ্ধাদের জন্য স্কুল করার ব্যাপারে যোগেন্দ্র বলেন, “নারী দিবসে মহিলাদের সম্মান জানানোর কথা বলে সবাই। কিন্তু এই বৃদ্ধাদের প্রাপ্য সম্মানটুকু জোটেনি কোনো দিন। আমাদের ঠাকুমাদের বয়সি মহিলারা কোনো দিন স্কুলে যাওয়ার সুযোগ পাননি।” যোগেন্দ্রর মতে, এক জন মহিলা শিক্ষালাভ করলে গোটা সমাজ শিক্ষালাভ করবে, কারণ এক জন মহিলাই তাঁর বাড়িকে আলোয় ভরিয়ে দেন।

বিজ্ঞাপন

দশ বছর বয়সেই বিয়ে হয়ে গিয়েছিল। তার পর শ্বশুরবাড়ির অভাব-অনটন, তাই কখনও স্কুলের মুখ দেখেননি বছর নব্বইয়ের অনুসুয়া দেশমুখ। তাঁর কথায়, “স্লেট-পেন্সিল কেনা বা জামা কাপড় কেনার কোনো টাকাই ছিল না আমাদের।” কিন্তু এখন তিনি স্কুলে যাচ্ছেন এবং গত এক বছরে ২১ পর্যন্ত সংখ্যা চিনতে শিখেছেন তিনি। জানেন ইংরেজির সব অক্ষর এবং সর্বোপরি নিজের নামটা সই করতে জানেন তিনি। 

রামাবাই গনপত আর একজন বৃদ্ধা। নাতি-নাতনির হাত ধরে স্কুলে যান তিনি। পড়াশোনা করতে পেরে তিনি কত আনন্দিত জানা যায় তাঁর কথায়। তিনি বলেন, “ভীষণ ভালো লাগে স্কুলে যেতে। রোজ ব্যাগ নিয়ে আমরা ঠাকুমারা একসঙ্গে স্কুলে যাই। খুব গর্ব হচ্ছে যে আমরা এখন পড়তে শিখেছি।” তাঁর একটাই আক্ষেপ, যে চোখের সমস্যার জন্য ভালো করে দেখতে পারেন না তিনি।

স্কুলের শিক্ষিকা বছর তিরিশের শীতল মোরে। বিনা পারিশ্রমিকেই শিক্ষকতা করেন তিনি। তাঁর আরও আনন্দ হয়, যখন দেখেন নিজের শাশুড়িই তাঁর ছাত্রী। তিনি বলেন, “যাঁরা কোনোদিন পড়াশোনা করেননি, তাঁরা এখন পড়াশোনা করছেন, এই ব্যাপারটাই সব থেকে বেশি আনন্দ দেয়।”

স্কুল যখন শুরু হয়েছিল তখন ছাত্রী সংখ্যা ছিল ২৮। এক জন বৃদ্ধার মৃত্যু হলেও, আরও তিন জনকে বন্ধু হিসেবে পেয়েছেন এই বৃদ্ধারা। সব মিলিয়ে ছাত্রী সংখ্যা এখন তিরিশ। শীতল বলেন, এ ভাবেই গোটা দেশে গ্রামে গ্রামে মহিলাদের মধ্যে শিক্ষা ছড়িয়ে পড়বে সেই আশা তাঁর।

 

বিজ্ঞাপন
loading...

মতামত দিন

Please enter your comment!
Please enter your name here