সরকারের আপত্তি অগ্রাহ্য করে চার মাওবাদীকে প্রাণভিক্ষা রাষ্ট্রপতির

0
83

শৈবাল বিশ্বাস :

মাওইস্ট কমিউনিস্ট সেন্টারের সঙ্গে যুক্ত চার জন আসামির প্রাণভিক্ষা দিলেন রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখোপাধ্য‌ায়। এরা শ্রেণিসংগ্রামের নামে বিহারে ভূমিহার সম্প্রদায়ের ৩৪ জনকে খুন করে। অবশ্য‌ অনেকেই এই শ্রেণিসংঘাতের পিছনে বিহারের জাতপাতের লড়াইকে দায়ী করছেন। নকশালপন্থী সংগঠনগুলি এক সময় গোটা উত্তর ভারত জুড়ে নিম্নবর্ণের মানুষদের জোতদার খতম অভিযানে শামিল করেছিল। বলা বাহুল্য‌, জোতদাররা যে হেতু উচ্চবর্ণের, কাজেই জাতিঘৃণা-শ্রেণিঘৃণা মিলেমিশে একাকার হয়ে গিয়েছিল। সে রকমই একটি ঘটনায় কৃষ্ণ মোচি, বীরকুয়ের পাসোয়ান, নানহেলাল পাসোয়ান ও ধারু সিংয়ের ফাঁসির আদেশ হয়। গত ১ জানুয়ারি রাষ্ট্রপতি তাঁদের প্রাণভিক্ষার আবেদনে সাড়া দিয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের সাজা দিয়েছেন।

১৯৯২ সালে ৩৪ জন উচ্চবর্ণীয়কে হত্য‌ার দায়ে বিহারের একটি আদালত তাঁদের ফাঁসির সাজা শোনায়। অপরাধের গুরুত্ব বিচার করে বিহার সরকার চেয়েছিল এঁদের যেন ফাঁসি হয়। ২০১৬ সালের ৮ আগস্ট কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রক এঁদের প্রাণভিক্ষার আবেদনের ব্য‌াপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে বিহার সরকারের মত জানতে চায়। তখনও নীতীশকুমারের সরকার স্পষ্ট জানিয়ে দেয়, অপরাধের গুরুত্ব বিচারে এঁদের ফাঁসি হওয়াই উচিত। বিহার রাজনীতি সম্পর্কে ওয়াকিবহাল ব্য‌ক্তিদের বক্তব্য‌, কুর্মি ও ভূমিহারদের সমর্থন নিয়ে বিহারে ক্ষমতায় আসা নীতীশকুমার পায়ের তলার মাটি আরও শক্ত করতেই এই চার জনকে চূড়ান্ত সাজা দিতে চেয়েছিলেন।

বিহার সরকারের মনোভাব জানা সত্ত্বেও রাষ্ট্রপতি কিন্তু এঁদের ফাঁসিকাঠে ঝোলাতে রাজি হননি। এই সিদ্ধান্তের পিছনে রাইসানা হিলস থেকে কয়েকটি যুক্তিও দেখানো হয়েছে। প্রথমত, এঁদের ক্ষমাভিক্ষার আবেদন বিহার সরকার অনেক দেরি করে পাঠিয়েছিল। সেটি রাষ্ট্রপতি খুব একটা ভালো চোখে নেননি। দ্বিতীয়ত, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন এঁদের প্রাণভিক্ষার পক্ষেই মত দিয়েছে। জাতীয় মানবাধিকার কমিশন এই সংক্রান্ত তাঁদের রিপোর্টে বলেছে, সমস্ত কাগজপত্র খতিয়ে দেখে বোঝা যায় এই চার জন ২০০৪ সালের ৭ জুলাই প্রাণভিক্ষার আবেদন করে। বিহারের ইন্সপেক্টর জেনারেলের (প্রিজন অ্য‌ান্ড কারেকশনাল সার্ভিস) বয়ানে জানা গিয়েছে, রাজ্য‌ সরকার কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের মাধ্য‌মে প্রাণভিক্ষার আবেদন ৭ জুলাই ২০০৪-এ রাষ্ট্রপতির কাছে পাঠিয়েছিল। কিন্তু সেটি আদৌ রাষ্ট্রপতির সচিবালয়ে এসে পৌঁছোয়নি। ফলে সন্দেহ জাগে সেটি সত্য‌িই পাঠানো হয়েছিল কিনা। জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের হস্তক্ষেপের পর ১২ বছর বাদে ফের প্রাণভিক্ষার আবেদনটি রাষ্ট্রপতির কাছে আসে। রাষ্ট্রপতি এই গোটা ঘটনাটি চার জনের প্রাণভিক্ষা দেওয়ার যথেষ্ট কারণ বলে মনে করেছেন।

এই চার জন তৎকালীন এমসিসি বা মাওইস্ট কমিউনিস্ট সেন্টারের সদস্য‌ ছিলেন। এঁরা ৩৪ জন ভূমিহার সম্প্রদায়ের ভূস্বামীকে এঁরা গুলি করে খুন করেন। এটি বরা গণহত্যা নামে কুখ্যাত। তবে জানা যায়, ভূমিহারদের হাতে দলিতদের গণহত্যার বদলে নিতেই নাকি এমসিসি-র ওই চার দলিত কর্মী গণহত্যায় শামিল হয়েছিল।   ২০০১ সালে সেশন কোর্টের বিচারে প্রত্য‌েকের ফাঁসি হয়। ২০০২-এর ১৫ এপ্রিল সুপ্রিম কোর্ট ফাঁসির সাজা বহাল রাখে তবে তিন সদস্য‌ের বেঞ্চের অন্য‌তম বিচারপতি এম বি শাহ ফাঁসির সাজার বিপক্ষে ছিলেন। কিন্তু সংখ্য‌াধিক্য‌ের জেরে সর্বোচ্চ আদালতে আপিল খারিজ হয়ে যায়।

বিজ্ঞাপন
loading...

মতামত দিন

Please enter your comment!
Please enter your name here