সাড়ে তেরো ঘণ্টায় দিল্লি থেকে কানপুর, খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটছে রাজধানী এক্সপ্রেস

0
351
rajdhani express
শ্রয়ণ সেন

(দিল্লি-হাওড়া রাজধানী এক্সপ্রেস থেকে)

দু’টি শহরের মধ্যে দূরত্ব ৪৪০ কিমি। সাধারণ ক্ষেত্রে সময় লাগে চার ঘণ্টা ৪০ মিনিট মতো। সেই দিল্লি থেকে কানপুর আসতে এ বার সময় লাগল পাক্কা সাড়ে তেরো ঘণ্টা। তা-ও সাধারণ কোনো ট্রেন নয়, দেশের সব চেয়ে ঐতিহ্যমণ্ডিত ট্রেন রাজধানী এক্সপ্রেসে।

গত কাল অর্থাৎ শুক্রবারের হাওড়াগামী রাজধানীতে টিকিট আমাদের। ট্রেন ছাড়ার কথা ছিল বিকেল ৪:৫৫। কিন্তু বারংবার ট্রেনের ছাড়ার সময় পরিবর্তন করে অবশেষে ট্রেন যখন হাওড়ার উদ্দেশে যাত্রা শুরু করল তখন ঘড়িতে ভোর তিনটে। অর্থাৎ নির্ধারিত সময়ের দশ ঘণ্টারও বেশি দেরিতে ছাড়ল রাজধানী এক্সপ্রেস। শুধু রাজধানীই নয়, সময় পরিবর্তিত হয়েছে প্রায় সবক’টি ট্রেনেরই। তাই রাত একটায় যখন প্ল্যাটফর্মে নামলাম তখন সেখানে তিল ধারণের জায়গা নেই।

কিন্তু অব্যবস্থা তো ট্রেনের সময়েও। প্রথমে বলা হল ট্রেন ছাড়বে রাত ১:২০তে। কিন্তু নির্ধারিত সময়ে কোনো ট্রেনেরই দেখা নেই। প্ল্যাটফর্মের ডিসপ্লে বোর্ড শুধু আশ্বস্ত করে যাচ্ছিল। অবশেষে ট্রেন যখন নয়াদিল্লি স্টেশনের চোদ্দো নম্বর প্ল্যাটফর্মে এল, তখন ঘড়িতে সওয়া দু’টো।

ঘোষিত পরিবর্তিত সময়েরও দেড় ঘণ্টা পরে ছাড়ল ট্রেন। ট্রেন যখন ছাড়ল, ভাবলাম এ বার হয়তো ট্রেনটা ভালো দৌড়বে। দেশের প্রথম সারির ট্রেন যখন, নিশ্চয়ই অন্য ট্রেনের আগেই এগোবে রাজধানী। কিন্তু কোথায় কী! সকাল হতেই দেখলাম, এই ট্রেন যেন এগোতেই চায় না। রাতের তিন ঘণ্টায় তা-ও ১৩০ কিমি দৌড়েছিল রাজধানী, কিন্তু সকালের প্রথম চার পাঁচ ঘণ্টায় সে এগিয়েছে একশো কিলোমিটারেরও কম। একটু করে এগিয়েই দাঁড়িয়ে পড়ছে অনবরত। যখন এগোচ্ছে, তার গতি অত্যন্ত শ্লথ। ট্রেনে যদিও খাবারদাবার এখনও ঠিকঠাক দেওয়া হচ্ছে, কিন্তু সময় না চলার জন্য যে সমস্যায় আমরা পড়ছি, তার দায় কার? রাজধানী এক্সপ্রেসের যাত্রী হওয়ার সুবাদে মাঝে একবার মাইকে ঘোষণা করা হল, “অনিবার্য কারণবশত ট্রেন এখন পনেরো ঘণ্টা দেরিতে চলছে।” তবে সেই পনেরো ঘণ্টা এখন উনিশ ঘণ্টায় এসে দাঁড়িয়েছে।

rajdhani express

কিন্তু তারও আগে যে প্রশ্নটা উঠে আসে, সেটা হল কেন এই অস্বাভাবিক দেরিতে চলছে ট্রেন? অনেকেই কারণ দেখাচ্ছেন ঘন কুয়াশার। কিন্তু সেটাই যে পুরো কারণ নয়, সেটা বলে দিয়েছেন আমাদের বগিতে থাকা এক টিটিই। আসল কারণ হল রেলের পরিষেবা ব্যবস্থা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছে।

আজও সকালের দিকে বেশ কুয়াশা ছিল, কিন্তু দু’দিন আগে অমৃতসর থেকে দিল্লি আসার পথে যে কুয়াশা দেখেছিলাম তার থেকে কমই। অথচ সে দিন শতাব্দী এক্সপ্রেস বেশ ভালোই এসেছিল। কুয়াশার জন্য তার গতি ছিল শ্লথ, কিন্তু তা বলে আজকের রাজধানী এক্সপ্রেসের মতো নয়। দিল্লি থেকে টুন্ডলা, মোটামুটি দু’শো কিলোমিটারের এই পথ পাড়ি দিতে রাজধানী নিয়েছে পাক্কা ন’ঘন্টা।

ওই টিটিই সাহেব কিন্তু কুয়াশাকে দায়ী করলেও, তার থেকে অনেক বেশি দায়ী করেছেন দেশের রেলব্যবস্থাকে। তিনি বলেন, “দেখছেন তো এখন কুয়াশা কেটে গিয়েছে। কিন্তু এই কুয়াশার জন্য রাজধানীর আগের সমস্ত ট্রেন আটকে পড়েছিল। এখন তারা শ্লথ গতিতে এগোচ্ছে বলে রাজধানীর গতিও শ্লথ।”

তা হলে কি এই পরিস্থিতি থেকে কোনো দিনও মুক্তি পাওয়া যাবে না?

টিটিই সাহেব কিন্তু সঠিক উদ্যোগের অভাবকেই এর পেছনে দায়ী করলেন। “এখন কিন্তু কুয়াশা হলেও বিমান পরিষেবায় বিশেষ প্রভাব পড়ে না। কলকাতা থেকে উত্তর ভারতগামী ট্রেনের জন্য অনেক ব্যবস্থাই গ্রহণ করতে পারে রেল। কবে করবে সেটাই দেখার।”

আমারই এক সহযাত্রী অমিয় ভট্টাচার্যের এ রকম অভিজ্ঞতা কিন্তু প্রথম নয়। গত অক্টোবরে বারাণসী থেকে কলকাতা ফেরার সময় ঠিক এ রকম অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হয়েছিলেন তিনি। তখন অবশ্য কুয়াশা নয়, ‘প্রযুক্তিগত ত্রুটি’র জন্য অস্বাভাবিক বিলম্ব করেছিল তাঁর ট্রেন। অমিয়বাবু বলেন, “তখন যে ট্রেনে সফর করেছিলাম এ বার তো তার থেকে আরও উচ্চমানের ট্রেনে সফর করছি। তবুও কেন এই ভোগান্তি। কিছু দিন আগেই তো শুনলাম রাজধানীর ট্রেনগুলিকে উন্নত করার জন্য ঢালাও পয়সা ঢালা হচ্ছে, তবুও কেন এই দেরির সমস্যা মিটছে না?”

তিনি আরও বলেন, “ঘন কুয়াশায় ট্রেন চলা ব্যহত হয় কেন, বুঝতে পারি না। ট্রেন লাইন দেখে দেখে তো আর চালককে ট্রেন চালাতে হয় না। সিগন্যালই তো ট্রেনটাকে চালায়। অত্যাধুনিক প্রযুক্তির দিনে সেই সিগনালিং ব্যবস্থাকে কি আরও উন্নত করা যায় না!”

শোনা যায় রেলকে উন্নত করার জন্য বিশাল বিশাল প্রকল্প গ্রহণ করেছে রেল। কখনও বলা হচ্ছে রাজধানী শতাব্দীদের যাতে কুয়াশায় বিলম্ব না হয়, তার জন্য কোটি কোটি টাকা খরচ করা হবে। তবুও কেন এই চরম অব্যবস্থা?

প্রধানমন্ত্রী স্বপ্ন দেখাচ্ছেন বুলেট ট্রেনের। কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর কাছে বিনীত আবেদন, বুলেট ট্রেনের আগে এই সমস্যা সমাধানের জন্য ব্যবস্থা নিন।

আপাতত দেখা যাক, কখন হাওড়া পৌঁছোয় এই ট্রেন!

এক ক্লিকে মনের মানুষ,খবর অনলাইন পাত্রপাত্রীর খোঁজ

loading...

মতামত দিন

Please enter your comment!
Please enter your name here