কার্বনমুক্ত কারিগরির নামে দেশে লুটপাট চলছে, অভিযোগ বিজ্ঞানীদের

0
88

saibal-biswasশৈবাল বিশ্বাস:

সুস্থায়ী উন্নয়ন বা সাসটেনেবল গ্রোথ শব্দবন্ধটি আমাদের সবার কাছে বড়ো পরিচিত। কার্বনমুক্ত বিশ্ব গড়ার জন্য‌ স্থায়ী উন্নয়নের ধারণাটিকে প্রাধান্য‌ দিতেই হবে। অর্থাৎ এমন একটা উন্নত পৃথিবীর দিকে যাত্রা করতে হবে যে যাত্রাপথে কার্বন নিঃসরণ হবে অনেকটাই কম। সেই জন্য‌ই এই উন্নয়নের নাম দেওয়া হয়েছে সুস্থায়ী উন্নয়ন অর্থাৎ যা আমাদের প্রকৃতি বা পরিবেশকে বাঁচিয়ে রাখবে। কিন্তু সাসটেনেবল ডেভেলপমেন্ট বা সুস্থায়ী উন্নয়নের নামে আমাদের মতো উন্নয়নশীল দুনিয়াতেও যে ধরনের লুটপাট চলছে তা দেখে প্রশ্ন উঠতে বাধ্য‌ স্থায়ী উন্নয়ন কাদের স্বার্থে? শুধু স্থায়ী উন্নয়নই কি যথেষ্ট?

সম্প্রতি ফোরাম ফর সায়েন্টিস্টস, ইঞ্জিনিয়ার্স অ্য‌ান্ড টেকনোলজিস্টস (ফোসেট) আয়োজিত অল ইন্ডিয়া পিপলস টেকনোলজি কংগ্রেসে এই প্রশ্ন তুলে দিলেন সিআইএসআরের প্রাক্তন বিজ্ঞানী এবং দিল্লির সেন্টার ফর টেকনোলজিক্যাল ডেভেলপমেন্টের সচিব ডি রঘুনন্দন। অধ্য‌াপক পি এন চৌধুরীর নামাঙ্কিত বক্তৃতা দিতে গিয়ে তাঁর প্রশ্ন, লো কার্বন টেকনোলজির নামে একদল মুনাফাবাজের সুবিধা করে দেওয়া হচ্ছে না তো?

low-carbon-technology

১৯৯৯ সালে কেন্দ্রীয় সরকার যে জৈবজ্বালানি (বায়োফুয়েল) নীতি তৈরি করেছিল তার মোদ্দা কথা হচ্ছে জ্বালানির জন্য‌ ব্য‌বহৃত পেট্রল ডিজেলে অন্তত ৫ শতাংশ জৈবজ্বালানি বা ইথানল মেশাতেই হবে। ইথানল পাওয়া যায় আখ থেকে। দুঃখের বিষয় আমাদের দেশে আখ চাষের পরিমাণ দেশের চিনির চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্য‌পূর্ণ নয়। ফলে আমাদের বাইরে থেকে প্রতি বছরই চিনি আমদানি করতে হয়। যখন চিনির জন্য‌ই প্রয়োজনীয় আখ পাওয়া যায় না তখন ইথানল উৎপাদন হবে কী করে? আইন তো আর বদলানো যায় না। এ দেশের মুনাফাবাজ ব্য‌বসায়ীদের একাংশ উপায়টা খুব সহজেই আবিষ্কার করে ফেললেন। তাঁরা ব্রাজিলের মতো কয়েকটি লাতিন আমেরিকার দেশে খামারে প্রচুর বিনিয়োগ করলেন। সেখানে যে আখ উৎপাদন হল তার থেকে তৈরি ইথানল ভারতে রফতানি করা হল। তার জন্য‌ প্রচুর টাকা কোষাগার থেকে ভারত সরকারকে গুনাগার দিতে হল। চাপ পড়ল গরিব করদাতাদের ওপর। গরিবের পকেট কাটা এই স্থায়ী উন্নয়নের ধারণাই কি আমাদের দেশের পক্ষে যথেষ্ট?

জৈবজ্বালানি বা বায়োফুয়েলের জন্য‌ জাট্রোপা চাষও খুবই জনপ্রিয় হয়েছে। বায়োফুয়েল নীতির জন্য‌ই জাট্রোপা চাষের জায়গাও ক্রমশ বাড়ছে। চাষের জমি কিনে নিয়ে বা দাদনির মাধ্য‌মে বিনিয়োগকারীরা জাট্রোপার চাষ শুরু করেছেন। এ ভাবে চলতে থাকলে জমির ওপর চাপ তো বাড়বেই। খাদ্য‌ উৎপাদনও সঙ্কটে পড়তে বাধ্য‌। এই স্থায়ী উন্নয়নের ধাক্কা কি আমাদের মতো দেশ সামলাতে পারবে?

ডঃ রঘুনন্দনের মতে, শুধু স্থায়ী উন্নয়নের কথা ভাবলেই হবে না তার সঙ্গে নৈতিকতার ধারণাটিও যুক্ত করতে হবে। অর্থাৎ শুধু সাসটেনেবল ডেভেলপমেন্ট হলেই হবে না সেটি ইকুইটেবল ডেভেলপমেন্ট বা ন্যায্য উন্নয়নও হওয়া দরকার। ভারতের মতো দেশের উচিত স্থায়ী উন্নয়নের সঙ্গে ন্যায্য উন্নয়নের ধারণা মিশিয়ে নীতি প্রনয়ন করা। গ্রামীন অর্থনীতিতে ব্য‌বহৃত টেকনোলজির ক্ষেত্রেও এই ধারণাকেই প্রাধান্য‌ দিতে হবে। গান্ধীজির নির্দেশে ওয়ার্ধার আশ্রমে বসে ডঃ জে সি কুমারাপ্পা এমন কিছু যন্ত্র বানিয়েছিলেন যেগুলি গ্রামীণ ক্ষেত্রে প্রযোজ্য‌ এবং স্থায়ী ও নৈতিক উন্নয়নের ধারণাকে মেলাতে সাহায্য‌ করে। কিন্তু কালের নিয়মে তা অপ্রাসঙ্গিক হয়ে গেল তার কারণ বাজারের নিরিখে যে দুস্তর চাহিদা তৈরি হল তা সামাল দেওয়ার ক্ষমতা ওই সব ঘরোয়া যন্ত্রের নেই। দ্বিতীয় পর্যায়ে নয়ের দশকে অধ্য‌াপক পি এন চৌধুরীর নেতৃত্বে সিআইএসআরের একদল বিজ্ঞানী ‘গাঁও কি কারিগর অ্য‌ান্ড সায়েন্স’ পর্যায়ে কিছু উন্নয়নের কাজ শুরু করলেন। কিন্তু অজ্ঞাত কারণে সেই গবেষণা এখনও অসমাপ্ত।

প্রশ্ন ওঠে, তা হলে স্থায়ী উন্নয়ন ও পরিবেশ বাঁচানোর নাম করেও কি এক শ্রেণির মানুষের পকেট ভর্তি হচ্ছে?

বিজ্ঞাপন
loading...

মতামত দিন

Please enter your comment!
Please enter your name here