জীবন চলিয়া গিয়েছে তিরিশ-তিরিশ বছরের পার, ভারতের একমাত্র টাই টেস্টের স্মৃতি

0
73

prasenjitপ্রসেনজিৎ চক্রবর্তী

মনে পড়ে, লাঞ্চ হওয়ার একটু আগে মর্নিং স্কুল সেরে ফিরতে তুমি ? ১৫ মিনিট দেখে স্নান। তার কিছু সময় পর ভাত খেয়ে জোর করে ঘুম পাড়িয়ে দিত মা। বাইশ গজ ততক্ষণে সবুজ গালিচা বেয়ে চোখের বাউন্ডারি পেরিয়ে পৌঁছে গিয়েছে মস্তিষ্কে। ভোরে উঠতে হত, তাই ঘুম এসেও যেত কখন যেন। মায়েরা সব জানে চিরকালই। অথবা কিছুই জানে না। বা জেনেও না জানার ভান করা ছাড়া তাঁদের কিছুই করার থাকে না কোনওদিন।

হে স্কুল বালক, আগের দিন বিকেলে তুমি জেনে গিয়েছিলে মাদ্রাজের(অধুনা চেন্নাই) সেই টেস্টে অ্যালান বর্ডার অবাক করা আক্রমণাত্মক ডিক্লেয়ার দিয়ে দিয়েছেন। টেস্টের শেষ দিন জিততে হলে ভারতকে এক দিনে ৩৪৮ রান করতে হবে। সে যুগের নিচু স্ট্রাইক রেটের ক্রিকেটে, তা ছিল প্রায় অসম্ভব। তোমার তখন কীই বা অভিজ্ঞতা। তুমি জানতে টেস্টে এক দিনে ২৫০ মানে অনেক রান। অতএব ভারতের হার নিশ্চিত কিংবা নিদেন পক্ষে ড্র।

tie-test-1সেই টেস্টে অস্ট্রেলিয়ার প্রথম ইনিংসে ডিহাইড্রেশন সত্ত্বেও দ্বিশত রান করেছিলেন ডিন জোন্স

তো স্কুল বালক, তুমি স্কুল থেকে ফিরে দেখলে ভারত লাঞ্চ করতে যাচ্ছে ১ উইকেটে ৯৪ রান করে। লাঞ্চের পরও কিছুক্ষণ দেখেছিলে খেলাটা। গাভাসকর সে সময় তত ভাল খেলতেন না। যেমনটা বড় খেলোয়াড় তিনি। তো সেই গাভাসকর দিব্যি ব্যাট করছেন এবং যাকে বলে বেশ চালিয়ে খেলছেন। সবটাই তোমার কাছে নতুন। তারপর সেই কালান্তক ঘুম। কালান্তকই বটে। না ঘুমোলে তুমি দেখতে পারতে, ২ উইকেটে ১৯৩ রান নিয়ে চা পানের বিরতিতে গেল ভারত। তারপর ৯০ রান করে আউট হয়ে গেলেন গাভাসকর। প্রথম ইনিংসে ফলোঅন বাঁচানো কপিলদেব(ক্যাপ্টেন) আউট হলেন ১ রানে। ভারতের দিকে ঢলে আসা ম্যাচ ঢলে পড়ছে অস্ট্রেলিয়ার দিকে।

কিন্তু তখন তো ক্রিজে এসে গিয়েছেন রবি শাস্ত্রী। আহা, রবি শাস্ত্রী আর শিশির ঘোষের কি ফ্যানই না ছিলে তুমি। রবি তখন সদ্য অস্ট্রেলিয়ায় বেনসন অ্যান্ড হেজেস কাপে ভারতকে জিতিয়ে অডি গাড়ি নিয়ে এসেছেন দেশে। চোখে ভাসছে সেই দৃশ্য। সেই রবি থেকে গেলেন শেষ অবধি ৪৮ রান করে। তুমি যখন ঘুম থেকে উঠলে তখন ভারতের ৮ উইকেট পড়ে গিয়েছে। শাস্ত্রীর সঙ্গে বাইশ গজে অফ স্পিনার শিবলাল যাদব।

শেষের আগের ওভারে শিবলাল ৬ মেরে ম্যাচ প্রায় হাতের মুঠোয় নিয়ে এলেন আর তোমার কোমল মনে অবিশ্বাস্য জয়ের সোনালি স্বপ্ন। তা তো হবেই। সে বছরই তুমি বিশ্বকাপ ফুটবলে মারাদোনাকে দেখেছো। পৃথিবীর ২৪টা দেশের নাম জানতে পেরেছো বিশ্বকাপ ফুটবল দেখে। বালক অপুর মতো তোমার দিগন্ত বড় হয়ে যাচ্ছে ক্রমশ। কিন্তু হায়, শিবলাল আউট হয়ে গেলেন।

নামলেন মণিন্দর সিং। যার ব্যাট করতে না পারার দক্ষতা তোমার খুবই ভাল জানা। ব্যাট হাতে শাস্ত্রী। প্রথম বলে ২ রান, স্টিভ ওয়ার মিস ফিল্ডিং-এর জেরে। তারপরের বলে ১ রান। ক্রিজে মণিন্দর। ম্যাচ টাই হয়ে গিয়েছে। জিতবে কি ভারত? একটা বল ঠেকালেন বাঁ হাতি স্পিনার। পরের বলেই এলবিডব্লিউ। ওফ্‌! শাস্ত্রী কেন যে সিঙ্গলটা নিলেন! স্বপ্ন ভেঙে যাওয়ার প্রাথমিক অভিজ্ঞতাটা হয়ে গেল তোমার।

তারপর ? দেখতে দেখতে কেটে গেল ৩০টা বছর। তার মধ্যে সিকি শতক নয়া উদার অর্থনীতির অলীক জৌলুষময়। সাদাকালো ক্রিকেটের আশি ভাগই রঙিন হয়ে গেল। টেস্ট ম্যাচও রঙে মুড়ে যাবে যে কোনও দিন। তুমি তো সেই কবেই জেনে গেছ, জীবনে জয়-পরাজয় হয়। এমনকি অমীমাংসিত ভাবেও শেষ হয় কত যুদ্ধ। কিন্তু টাই ?  সে শুধু ক্রিকেটেরই সম্পদ। যা শুধুই ভিতরের বুক পকেটে রেখে দিতে হয়। লুকিয়ে।

(টেস্ট ক্রিকেটের ইতিহাসে দ্বিতীয় ও ভারতের ক্রিকেট ইতিহাসের একমাত্র টাই টেস্ট-টি খেলা হয়েছিল ১৯৮৬ সালের ১৮ থেকে ২২ সেপ্টেম্বর মাদ্রাজে, অধুনা চেন্নাই। সংক্ষিপ্ত স্কোর- অস্ট্রেলিয়া প্রথম ইনিংস- ৭ উইকেটে ৫৭৪ রান-ডিক্লেয়ার, বুন ১২২, ডিন জোন্স ২১০, বর্ডার অপরাজিত ১০৬, যাদব ৪ উইকেট। ভারত প্রথম ইনিংস- ৩৯৭, কপিলদেব- অপরাজিত ১১৯, ম্যাথুজ ৫ উইকেট। অস্ট্রেলিয়া দ্বিতীয় ইনিংস- ৫ উইকেটে ১৭০ ডিক্লেয়ার। ভারত দ্বিতীয় ইনিংস- ৩৪৭, গাভাসকর-৯০, অমরনাথ-৫১, শাস্ত্রী-৪৮। ম্যাথুজ ও ব্রাইট দু’জনেই নেন ৫টি করে উইকেট।
টেস্ট ক্রিকেটের ইতিহাসে প্রথম টাই টেস্ট-টি হয়েছিলে ১৯৬০ সালে অস্ট্রেলিয়ার ব্রিসবেনে। খেলা হয়েছিল অস্ট্রেলিয়া ও ওয়েস্ট ইন্ডিজের মধ্যে।
১৮৭৭ সাল থেকে শুরু হওয়া টেস্ট ক্রিকেটের ইতিহাসে এ পর্যন্ত এই দুটোই টাই টেস্ট হয়েছে। টাই টেস্ট, ড্রয়ের থেকে আলাদা। কারণ এই ম্যাচে প্রতিদ্বন্দ্বী দুই দলের দুই ইনিংস মিলিয়ে মোট রান সমান হয়। যে দল শেষে ব্যাট করে, তাদের ১০ উইকেটই পড়ে যায়। )

বিজ্ঞাপন
loading...

মতামত দিন

Please enter your comment!
Please enter your name here