অসম্ভবকে সম্ভব করে ঐতিহাসিক প্রত্যাবর্তন বার্সেলোনার
দেখুন হাইলাইটস

0

বার্সেলোনা – ৬ (সুয়ারেজ, কুর্জোয়া-আঃ, মেসি, নেইমার-২, রবার্তো) প্যারিস সাঁ জাঁ- ১ (কাভানি)

(দুই লেগ মিলিয়ে ৬-৫ ব্যবধানে জয়ী বার্সেলোনা)

সানি চক্রবর্তী:

বিজ্ঞাপন

মহাকাব্যিক। অবিশ্বাস্য। চমৎকার। ঐতিহাসিক।

আবার এভাবেও ফিরে আসা যায়। কিছুই অসম্ভব নয়। ইতিহাস তো এভাবেই তৈরি হয়। একটা ফুটবল ম্যাচ ঘিরে ঠিক এরকম বিশেষণ ব্যবহার করছেন সবাই। মুগ্ধতা কাটছে না যেন এখনও।

একবুক আশা নিয়ে ন্যু ক্যাম্প ভরিয়েছিলেন বার্সেলোনার সমর্থকরা। বিশ্বাসটা তাদের তৈরি করে দিয়েছিল তিন মিনিটের মধ্যেই সুয়ারেজের গোল খুঁজে নেওয়া। দ্বিতীয়ার্ধের ৬২ মিনিটে এডিনসন কাভানির গোলের পরে মনে হয়েছিল যাবতীয় প্রচেষ্টা বৃথা। কিন্তু না। নেইমরাররা প্রমাণ করে দিলেন, কেন ফুটবলে কোনো কিছুই অসম্ভব নয়। ৮৮ মিনিটে ফ্রি-কিক ও সংযোজিত সময়ের প্রথম মিনিটে পেনাল্টি থেকে করা নেইমারের গোলের পর সংযোজিত সময়ের শেষ মিনিটে ফের নেইমার ম্যাজিক। মাপা ক্রসে পরিবর্ত সের্গি রবার্তোর পা ছুঁইয়ে বল জালে জড়াতেই অসম্ভবকে বাস্তবের মাটিতে পুঁতে দিয়ে সম্ভব বানানো। ফুটবলের সেরা লিগের ইতিহাসে নিঃসন্দেহে সবথেকে সেরা প্রত্যাবর্তন। দ্বিতীয় লেগের ম্যাচে ৬-১ ব্যবধানে জিতে চ্যাম্পিয়ন্স লিগে কোয়ার্টার ফাইনালে স্থান করে নিল বার্সা। লুই এনরিকে ম্যাচের পরে বলছিলেন, ‘সত্যিই অবিশ্বাস্য খেলা ফুটবল। ছোটো ছোটো যে সমর্থকরা এদিন মাঠে এসেছিল, তারা আসা করি দিনটা কোনোদিন ভুলবে না।’

barca-1

চ্যাম্পিয়ন্স লিগের (১৯৯২-৯৩ থেকে শুরু নতুন ফর্মাটে) ইতিহাসে কেউ কোনো দল চার গোলে প্রথম পর্বে পিছিয়ে থেকে ফিরে এসে পরের পর্বে যেতে পারেনি! তথ্যটাকে মিউজিয়ামের পাতায় জায়গা করে দিয়ে অসাধ্যসাধন ঘটিয়ে দেখাল বার্সেলোনা। মেসি-নেইমার-সুয়ারেজদের কীর্তিতে যেন নতুন এক ঘোরের মধ্যে ঢুকে পড়ল ফুটবলবিশ্ব। এ এক নতুন নীল-লাল স্বপ্নের ঘোর। যেখানে ভরসা থাকলে, বিশ্বাস থাকলে, প্রয়োজনীয় খিদে থাকলে সবকিছু করা যায়।


এদিন খেলার শুরু থেকে সেই বিশ্বাসটাকে সঙ্গী করেই খেলতে নেমেছিল লুই এনরিকের দল। মাত্র তিন মিনিটের মধ্যে জটলার মধ্যে থেকে পাওয়া বলে হেডে যখন সুয়ারেজের প্রয়াস গোললাইন টপকাল, তখন মনে হয়েছিল সবে বর্ধমান। ট্রেন আদৌ দিল্লি পৌঁছাতে পারবে তো? দ্রুত গোল পাওয়ার পরে যদিও বিশ্বাসটা দানা বাঁধলে শুরু করে দিয়েছিল। ভ্যালেন্টাইস ডে’র দিনে যে ছন্দে পিএসজিকে পাওয়া গিয়েছিল, তার থেকেই এদিন ভয়ানক ছন্দে পাওয়া গেল বার্সাকে। আসলে চারগোলের লিড মাথায় রেখেই রক্ষণাত্মক শুরু করেছিলেন উনাই এমরি। আর সেটাই কাল হল। ন্যু ক্যাম্পে ২৪ বারের মধ্যে ২৩তম বারই হেরে ফিরলেন তিনি। এদিনের ক্ষতটা নিঃসন্দেহে তার ও পিএসজি ফুটবলারদের মনে দগদগে হয়ে থাকবে বহুদিন। ডিফেন্সে কুর্জোয়া, মার্টিন্স, সিলভা থেকে মাঝমাঠে রেবিও, ভেরেত্তি, মাতুইদি কেউই খেলতে পারেননি। না বলা ভালো কাউকে খেলতে দেননি বার্সার ফুটবলাররা। মেসি আগের ম্যাচে সামনে থাকায় কলকাঠি সেভাবে নাড়তে পারেননি। আজ তাকে ইনিয়েস্তা-বুস্কেটস-রাকিটিচের সঙ্গে মাঝমাঠে খেলান এনরিকে। আপফ্রন্টে নেইমার-সুয়ারেজ-রাফিনহা। তার ৩-৪-৩ ছকে ব্যাক থ্রি উমটিটি,পিকে ও ম্যাসচেরানো। বার্সার ফুটবলাররা প্রথম গোল পাওয়ার পর থেকেই রীতিমতো রক্তের গন্ধ পাওয়া শিকারি বাঘ হয়ে উঠেছিলেন।

barca-2

 

এক মুহূর্তের জন্যও তাদের পা থেকে বল কেড়ে নিতে পারছিলেন না পিএসজি ফুটবলাররা। সুনামির মতো একের পর এক আক্রমণ শুরু থেকেই ধেয়ে আসছিল ট্রাম্পের গোলের দিকে। নেইমার, মেসি, ইনিয়েস্তাদের শটগুলো অল্পের জন্য বাইরে যাওয়ার পরেও দীর্ঘশ্বাস নয় বরং আত্মবিশ্বাস বাড়ছিল ন্যু ক্যাম্পে। প্রথমার্ধ শেষ হওয়ার ৫ মিনিট আগে পিএসজি রক্ষণকে চাপের মুখে ভুল করতে বাধ্য করে দ্বিতীয় গোল তুলে নেয় বার্সা। ইনিয়েস্তা বল নিয়ে ভিতরে ঢুকে ব্যাকপাস রাখেন, যা ক্লিয়ার করতে গিয়ে কুর্জোয়া বল জালে ঢুকিয়ে দেন। আবার দ্বিতীয়ার্ধ শুরুর ৫ মিনিটের মধ্যে তৃতীয় গোল। পেনাল্টি থেকে মেসি ৩-০ করেন। তবে পেনাল্টির সিদ্ধান্ত নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। নেইমারকে আটকাতে গিয়ে মার্টেন্স পড়ে যান, তার মাথায় নেইমারের পা লাগায় তিনি বক্সে পড়ে যান। রেফারি প্রথমে পেনাল্টির নির্দেশ দেননি, সহকারী রেফারি তাকে ডেকে নিয়ে পেনাল্টি দিতে বলেন।

enrique

তিন গোলে পিছিয়ে কিছুটা গা ঝাড়া দিয়ে ওঠে পিএসজি। গত ম্যাচের হিরো ডি’মারিয়া নামার পরে কিছুটা প্রতিপক্ষ হাফে বলের দখল নেয় প্যারিসের দলটি। কাভানির একটি শট পোস্টে লেগে প্রতিহত হয়। ৬২ মিনিটের মাথায় তার গোলে মুহূর্তের জন্য থেমে গিয়েছিল ন্যু ক্যাম্পের শব্দব্রহ্ম। কুর্জোয়ার নামিয়ে দেওয়া হেডে কাভানির দুর্দান্ত ভলি জালে জড়াতেই মনে হয়েছিল কার্যত টাই শেষ। ক্ষনিকের ভুলে ছিটকে গেল হয়তো বার্সা। কিন্তু এনরিকে তেমনটা ভাবেননি। ভাবেননি নেইমার-মেসিরা। পরিবর্ত আর্দা তুরান, সের্গি রবার্তোরা নেমে নতুন উদ্যমে লড়াই শুরু করেন। তখনও টাই জিততে প্রয়োজন তিনটে গোল। ম্যাচের আগে সতীর্থদের সঙ্গে অন্তত দুটো গোল করার বাজি ধরেছিলেন নেইমার। আর, নির্ধারিত সময় শেষ হওয়ার দু মিনিট আগে বক্সের ঠিক বাইরে থেকে পাওয়া ফ্রিকিকে নেইমারের বিশ্বমানের গোল থেকেই শুরু ঐতিহাসিক প্রত্যাবর্তনের। সংযোজিত সময়ের প্রথম মিনিটে সুয়ারেজকে মার্কুইনস বক্সে ফেলে দিলে পেনাল্টি পায় বার্সা। যা থেকে দলের পঞ্চম গোলটি করেন ব্রাজিলিয়ান সুপারস্টার। আর সংযোজিত সময়ে তারই সোনায় বাঁধানো পাস ধরে সের্গি রবার্তোর গোল। চলতি মরশুমের পরে দায়িত্বে আর না থাকলেও বার্সেলোনা ক্লাবের ইতিহাসে তার জমানার সেরা জয়টা এদিন দিয়ে গেলেন এনরিকে। বর্তমান সময়ে এই জয়টা যে চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জেতার মতোই দামি। এনরিকের উপরে অনেকেই ভরসা না রাখলেও, তার বন্ধু ও বার্সা সমর্থক পেপ গুয়ার্দিওলা যে কোনো ভুল করেননি কাতালান ক্লাবটির উপরে ভরসা রেখে তা কিন্তু প্রমাণ করে দিয়ে গেল এনরিকের বার্সা।

বিজ্ঞাপন
loading...

মতামত দিন

Please enter your comment!
Please enter your name here