ময়দান পেরিয়ে: ইডেনে অহংকারের লড়াইয়ে ভাজ্জির ম্যাজিক

0
105

himadri-edited-1হিমাদ্রিশেখর সরকার:

আইপিএলের নিলামে যখন ব্রিটিশ খেলোয়াড়রা সমস্ত মিডিয়ার নজর কেড়ে নিয়েছে এ দিকে তখন ভারত ও অস্ট্রেলিয়া দু’টি দলই তাদের দাঁত-নখে শান দিয়ে প্রস্তুত। পুনে থেকেই শুরু হযে যাচ্ছে স্টার্ক-কোহলিদের ব্যাট-বলের যুদ্ধ। আজকের টি-টোয়েন্টির যুগে রোজ নতুন নতুন রেকর্ড, নতুন নতুন নাম। কিন্তু টেস্ট হল টেস্ট, যাকে এখনও বলা হয় আসল খেলা। রাজ্যপাট হারালেও সম্রাট তো তার অহংকার হারাতে পারে না।

আসলে লড়াইটা তো আজকের নয়, আর শুধু মাঠেই সীমাবদ্ধ নয়। মিডিয়ার লড়াই এই সিরিজকে এক নতুন মাত্রা দিয়েছে। সেই প্যাকার সিরিজ থেকেই অজি মিডিয়ার বিশ্ব ক্রিকেটে দাপট শুরু। তার পর থেকে তারাই তারকা বানিয়েছে, তারাই ভেঙেছে সেই সব মিথ। তাদের দাপটে ব্রিটিশ মিডিয়াও পরাজিত হয়েছে। বর্ডার-গাভাসকর সিরিজটাই ধরে নেওয়া যাক। মাকগ্রা, ওয়ার্ন, পন্টিং, স্টিভ ওয়রা ভারতের মাটি ছোঁয়ার আগেই মিডিয়া যুদ্ধ ঘোষণা করে বসত। বিভিন্ন ভাবে প্রতিদ্বন্দ্বীকে খাটো করে দেখানোর চেষ্টা চলত। তাই অজি সিরিজ মানেই যে কোনো দেশের কাছে এক চূড়ান্ত পরীক্ষা।

harbhajan-hattricl

ভারত-অস্ট্রেলিয়া ম্যাচ নিয়ে লিখতে গিয়ে একটা ম্যাচের কথা বিশেষ করে মনে পড়ছে। আপনাদেরও পড়ছে নিশ্চয়ই মনে, ২০০১-এর ভারত-অস্ট্রেলিয়া ইডেন টেস্ট। নাম পালটে বোম্বে তার আগেই মুম্বই হয়েছে তখন। সিরিজের প্রথম টেস্ট সেখানে। অ্যাডাম গিলখ্রিস্ট – ম্যাথু হেডেনের সেঞ্চুরির দৌরাত্ম্যে সাড়ে তিন দিনে ম্যাচ শেষ। সৌরভ–রাহুল–লক্ষণ সকলেই ওয়ার্ন-গিলিস্পি-ফ্লেমিংদের সামনে অসহায় আত্মসমর্পণ করলেন। লড়াই বলতে সচিনের দু-ইনিংসের দু’টি হাফ-সেঞ্চুরি। টানা অপরাজিত থাকার অহংকারে স্টিভ ওয় থেকে স্লেটার, মাকগ্রা থেকে পন্টিং, সবাই যেন তখন আগুনে মেজাজে। সাংবাদিক থেকে সমর্থক সবাই অজি খেলোয়াড়দের সেই মেজাজের স্বীকার হচ্ছিলেন। স্লেজিং শব্দটাকে শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া অজিদের কাছে ঘরে বাইরে চাপে ছিল টিম ইন্ডিয়া।

আরও পড়ুন: সিরিজ জিতলে র‍্যাঙ্কিং শীর্ষে অস্ট্রেলিয়া, এই অঘটন নিয়ে আশঙ্কার কারণ নেই

এ রকম এক পরিস্থিতিতে কলকাতায় শুরু হল দ্বিতীয় টেস্ট। শুরুতেই বলে দিই, ম্যাচ রিপোর্ট লিখছি না, তাই স্কোরবোর্ডের রেফারেন্সও দেব না। নিজের ছোট্টো মাথায় চাপ দিয়ে যেটুকু মনে করতে পারছি তাই লেখার চেষ্টা করছি। সিরিজে পিছিয়ে থাকা সৌরভবাহিনী সেই ম্যাচ শুরুর আগেই কয়েকটা চাল চালে। বোলিং-এ তিনটে পরিবর্তন করা হয়। শ্রীনাথ, আগরকর, রাহুল সাংভির জায়গায় দলে ফিরে আসেন  প্রসাদ, জাহির ও বাঁ হাতি স্পিনার রাজু। ও দিকে টানা ষোলো টেস্ট জয়ের আত্মবিশ্বাসটা অজি দলকে আরও বেশি ভয়ংকর করে তুলেছিল। খেলার প্রথম দিনে সেই ভয়ংকরের সম্মুখীন হল ভারতীয় দল। বসন্তের উষ্ণতা ইডেনের গ্যালারিতে সে দিন ছিল সকাল থেকেই। সঙ্গে ছিল গঙ্গার উপর থেকে ভেসে আসা হালকা হাওয়া। কিন্তু তাতে কী এসে যায়। শুরুতেই স্লিপে ক্যাচ পড়ল হেডেনের। আর তাতেই রক্তের স্বাদ পাওয়া বাঘের মতো স্লেটার-হেডেনরা ঝাঁপিয়ে পড়ল ভারতীয় বোলিং-এর ওপর। হেডেন সেঞ্চুরি না পেলেও করলেন ৯৭ রান। সঙ্গে ভেঙে দিয়ে গেলেন বোলারদের আত্মবিশ্বাস। কিন্তু ভেঙে পড়েননি শুধু একজন, তাঁর নাম হরভজন সিং। পাগড়ি পরা ওই অফস্পিনার সে দিন করেন প্রথম ভারতীয় হিসাবে হ্যাটট্রিক। গিলি, পন্টিং, ওয়ার্ন পরপর আউট। মনে আছে, ইডেনের ৯ নং গেটের গ্যালারিতে আমাকে কাঁধে তুলে নিয়ে নেচেছিলেন একজন বয়স্ক মুসলিম মানুষ। কাকুর সাথে বাড়ি ফেরার পথে কতটুকু হেঁটে ছিলাম সন্দেহ। আবেগেই ভেসে গেছিলাম সে দিন। এত কিছু বুঝিনি তখন। আজ বুঝি, সে দিনের হ্যাটট্রিকটা শুধুই একটা ক্রিকেটীয় পরিসংখ্যান নয়, ওটা ছিল অস্ট্রেলীয় অহংকারের পতনের সূচনা। ম্যাচের বাকিটা তো সকলেরই মনে আছে। ভারতের ফলো-অন খাওয়া, তার পর রাহুল–লক্ষণের সেই বিখ্যাত জুটি এবং শেষ দিনে সেই হরভজন-সচিনের দুরন্ত বোলিং। হেডেন আর ক্যাপ্টেন ওয় ছাড়া সে দিন গোটা অজি ব্যাটিং লাইনআপ ভেসে গেছিল স্রোতের মুখে খড়কুটোর মতো। সৌরভবাহিনী সে দিন শুধুমাত্র একটা টেস্ট নয়, জিতেছিল এক প্রবল স্নায়ুযুদ্ধও। আর ম্যাচ শেষে ইডেনের চেহারা বর্ণনা করার মতো কলমের জোর বোধহয় আমার নেই।

ম্যাচটার ক্রিকেটীয়ও গুরুত্ব বিচার করার মতো ধৃষ্টতা আমি না হয় নাই করলাম, কিন্তু এই কথাগুলো আজ না লিখে পারলাম না। একটা মাস বাইশ গজে চোখ থাকবে গোটা ক্রিকেটপ্রেমী দুনিয়ার। দু’পক্ষের মধ্যেই স্নায়ুযুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে, এবং বরাবরের মতো অজি মিডিয়াও শুরু করেছে চাপ সৃষ্টির খেলা। এখন দেখার দরকার কোন দল এই চাপ সামলে সাফল্য লাভ করে। আসলে এটাই তো খেলা। শুধু ময়দানে নয়, ময়দান পেরিয়ে।

আরও পড়ুন: জীবন চলিয়া গিয়েছে তিরিশ-তিরিশ বছরের পার, ভারতের একমাত্র টাই টেস্টের স্মৃতি

বিজ্ঞাপন
loading...

মতামত দিন

Please enter your comment!
Please enter your name here