চন্দনার হোম থেকে লোপাট তিন বছরের শিশু, অসহায়
দম্পতি শিশু সুরক্ষা সমিতির দ্বারস্থ

0
106

নিজস্ব সংবাদদাতা, জলপাইগুড়ি : ফের হোম থেকে একটি শিশুকন্যা নিখোঁজের  ঘটনা। অভিযোগের আঙুল শিশুপাচার কাণ্ডে ধৃত সেই চন্দনা চক্রবর্তীর হোমের বিরুদ্ধে। জলপাইগুড়ি শিশু সুরক্ষা সমিতির দ্বারস্থ দরিদ্র ওই দম্পতি। 

রবিবার বিকেলে জলপাইগুড়ি শিশু সুরক্ষা সমিতির অফিসে হঠাৎই হাজির এক দম্পতি। কান্নাভেজা গলায় আর্তি, তাঁদের বছর তিনেকের শিশুকন্যাকে খুঁজে দেওয়া হোক। ঘটনায় কিছুটা হতচকিত হয়ে পড়েন সমিতির সদস্যরা। ওই দম্পতির কাছ থেকে তাঁদের ‘গল্প’ শুনে থ সমিতির চেয়ারপার্সন বেবি উপাধ্যায়। কাজল বাসফোর ও সমীর বাসফোর নামে ওই দম্পতি আলিপুরদুয়ারের বীরপাড়ার বাসিন্দা। ধরাবাঁধা কোনো কাজ নেই। যখন যে কাজ পান তাই করে সংসার চালান দু’জনে। একটি ছেলে ও এক মেয়ে নিয়ে সংসার। গত বছর অক্টোবর মাসের ঘটনা। ঝগড়া করে ৯ বছরের সেই ছেলে পালিয়ে যায় বাড়ি থেকে। পুলিশের হাতে ধরা পড়ে তার ঠাঁই হয় নিউ জলপাইগুড়ির একটি হোমে। জানতে পেরে ছেলেকে আনতে সেই হোমে যান ওই দম্পতি। সঙ্গে ছিল তাঁদের বছর তিনেকের মেয়ে। ছেলেকে হোম থেকে ছেড়ে দিলেও এর পর অন্য বিপদে পড়েন ওই দম্পতি। সেখানে হাজির এক মহিলা তাঁদের জানান, জলপাইগুড়িতে তাঁদের একটি মেয়েদের হোম রয়েছে। কাজলদেবী তাঁর শিশুকন্যাকে নিয়ে সেখানে ভালো থাকতে পারবেন। তাঁরা অবশ্য সে প্রস্তাবে রাজি হননি প্রথমে। পরে তাঁদের ‘ব্রেন ওয়াশ’ করে জলপাইগুড়ির ‘আশ্রয়’ হোমে নিয়ে আসা হয় শিশুকন্যা-সহ মাকে। এর পরেই শুরু হয় আসল খেলা। এই হোমে আনার পর কাজলকে হোমের কর্ত্রী চন্দনা চক্রবর্তী জানান, তিন বছরের শিশুকন্যাকে এখানে রাখা যাবে না। তাঁকে অন্য হোমে পাঠানো হবে। স্বাভাবিক ভাবেই এতে বেঁকে বসেন কাজল। অভিযোগ, এর পরে ওইদিন রাতেই তাঁর কাছ থেকে জোর করে শিশুকন্যাকে কেড়ে নেওয়া হয়। পাঠিয়ে দেওয়া হয় অন্যত্র। ব্যাস সেই শেষ। এর পর আর নিজের শিশুকন্যাকে চোখে দেখেননি কাজল। অনেক কেঁদেছেন হোমের অন্ধকার ঘরে, লাভ হয়নি। বেশি প্রশ্ন করলে মিলত হুমকিও। মাসখানেক থাকার পর নভেম্বর মাসে ‘আশ্রয়’ থেকে চলে আসেন কাজল, যদিও মেয়েকে ফিরে পাননি।

এর পর দার্জিলিং জেলা শিশু সুরক্ষা সমিতির সঙ্গে যোগাযোগ করে কাজল জানতে পারেন তাঁর মেয়ে চন্দনা চক্রবর্তীর ‘বিমলা শিশুগৃহে’ রয়েছে। তার পর বহু বার তিনি চন্দনার নর্থবেঙ্গল পিপলস ডেভেলপমেন্ট সেন্টারের দফতরে এসেছেন। লাভ হয়নি। এক প্রকার হুমকি দিয়ে তাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে তাঁকে।

letterএর পর গত ২৭ জানুয়ারি দার্জিলিং জেলা শিশু সুরক্ষা সমিতি তাঁর কন্যার ‘রিলিজ অর্ডার’ দেন। তাও নিজের মেয়েকে ফেরত পাননি কাজলদেবী।

এর মধ্যেই গত ১৮ ফেব্রুয়ারি সিআইডির হাতে গ্রেফতার হন চন্দনা চক্রবর্তী। ‘বিমলা শিশুগৃহ’ থেকে ১৭টি শিশুকে দত্তক দেওয়ার নামে মোটা টাকার বিনিময়ে পাচার করার অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। একে একে গ্রেফতার হন তাঁর সহযোগী ‘বিমলা শিশুগৃহের’ চিফ অ্যাডপশন অফিসার সোনালি মণ্ডল ও চন্দনার ভাই মানস ভৌমিক। লোকমুখে সেই খবর পৌঁছোয় কাজল আর সমীরের কাছেও। এর পরে তাঁরা ছুটে আসেন জলপাইগুড়িতে। কিন্তু কোনো সুরাহা পাচ্ছিলেন না। রবিবার এক শুভানুধ্যায়ীর পরমার্শে শিশু সুরক্ষা সমিতির দফতরে যান। এর পরেই সমস্ত ঘটনা সামনে আসে।

 তবে এর পরে বাকি ছিল আরও ‘ভয়ংকর’ সত্য। ওই শিশু ও তার মায়ের কোনো নথিই নেই ওই হোমের লিস্টে। তাকে কবে আনা হয়েছিল, কোথায় রাখা হয়েছে তার কোন হদিস নেই নথিতে। সমিতির চেয়ারপার্সন বেবি উপাধ্যায় জানিয়েছেন, তাদের কাছে থাকা কোনো নথিতেই ওই শিশুকন্যা ও তার মায়ের নাম খুঁজে পাচ্ছেন না তাঁরা। গত ২২ ফেব্রুয়ারি নিরাপত্তার জন্য ১৪টি শিশুকে ‘বিমলা শিশুগৃহ’ থেকে সরিয়ে অন্য হোমে নিয়ে যায় প্রশাসন। তাদের মধ্যেও ওই শিশুকন্যার নাম নেই । অথচ দার্জিলিং-এর শিশু সুরক্ষা সমিতির তরফেই তাদের এই হোমে পাঠানো হয়েছিল, তার প্রমাণ রয়েছে। কিন্তু জলপাইগুড়ি শিশু সুরক্ষা সমিতিকে তা জানানোই হয়নি। যা একেবারেই নিয়মবিরুদ্ধ।

এখন প্রশ্ন তা হলে ওই শিশু গেল কোথায়? সংবাদ মাধ্যমে এবং লোকমুখে শুনে চন্দনা চক্রবর্তী ও তাঁর হোম সম্পর্কে সবই জেনেছেন ওই দম্পতি। তাঁদের ভয়ার্ত প্রশ্ন, একরত্তি মেয়েটাকেও মোটা টাকার বিনিময়ে বিক্রি করে দেওয়া হয়নি তো? 

একই প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে সমিতির চেয়ারপার্সন বেবি উপাধ্যায়ের মনেও। কারণ ওই হোমটি সম্পর্কে তাঁরা ভালোমতোই ওয়াকিবহাল। তাঁদের অভিযোগের ভিত্তিতেই শুরু হয়েছে সিআইডি তদন্ত। যেখানে প্রায় প্রতি দিনই উঠে আসছে ভয়ংকর সব সত্য। ওই দম্পতির শিশুকন্যা নিখোঁজের ঘটনা তার একটা অংশ মাত্র।

বেবি উপাধ্যায় ওই দম্পতিকে জলপাইগুড়ি কোতোয়ালি থানায় পাঠান অভিযোগ দায়ের করতে। তাঁরা নিজেরাও সমিতির তরফে প্রশাসনের কাছে অভিযোগ জানাবেন বলে জানিয়েছেন সমিতির চেয়ারপার্সন।

কিন্তু তাতেও স্বস্তি পাচ্ছেন না কাজল আর সমীর। গত ৪ মাস ধরে তাঁদের যে একরত্তি মেয়েটাকে দেখতে পাননি, তাকে কি আর কোলে ফিরে পাবেন তাঁরা? এই প্রশ্ন করেই কান্নায় ভেঙে পড়েন সন্তানহারা মা-বাবা।

বিজ্ঞাপন
loading...

মতামত দিন

Please enter your comment!
Please enter your name here