রাজ্যের ৪৭ শতাংশ প্রবীণ নাগরিকের মাস ফুরোলে কোনও
রোজগারই নেই

0
84

অর্ণব দত্ত:

পশ্চিমবঙ্গের ৪৭ শতাংশ বয়স্ক নাগরিকের মাস ফুরোলে একটি পয়সাও রোজগার নেই। এ দিকে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দর এতই চড়া যে মধ্যবিত্তেরই সংসার চালাতে নাভিশ্বাস উঠছে। এই পরিস্থিতিতে এই রাজ্যের বাসিন্দা যে প্রবীণ-প্রবীণাদের একটা বড়ো অংশ কোন পরিস্থিতিতে দিন গুজরান করতে বাধ্য হচ্ছেন, তা খুব সহজেই অনুমেয়।

‘বিল্ডিং এ নলেজ বেস অন পপুলেশন – এজিং ইন ইন্ডিয়া’ বিষয়ক একটি গবেষণায় যে তথ্যাদি পাওয়া গিয়েছে, তাতে দেখা যাচ্ছে, এই রাজ্যের বয়স্ক নাগরিকদের একাংশ কার্যত নেই-রাজ্যের বাসিন্দা। এই সমীক্ষাটি করা হয়েছে মুম্বইয়ের টাটা ইনস্টিটিউট অব সোশ্যাল সায়েন্স, বেঙ্গালুরুর ইনস্টিটিউট ফর সোশ্যাল অ্যান্ড ইকনমিক চেঞ্জ-সহ দেশের কয়েকটি শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠানের তরফে।

২০১১ সালের জণগণনার তথ্য অনুসারে, পশ্চিমবঙ্গের বাসিন্দা বয়স্ক নাগরিকের সংখ্যা এখন অন্ততপক্ষে ৭৪ লক্ষ ৯০ হাজার ৫১৪ জন। এঁদের ভিতর ৬০ বছরের বেশি বয়স্ক নারী ও পুরুষের অনুপাত যথাক্রমে ৪৮.৬ শতাংশ এবং ৫১.৪ শতাংশ। প্রসঙ্গত, কেন্দ্রীয় সরকারের রেজিস্ট্রার জে্নারেলের তরফে করা একটি সমীক্ষা রিপোর্ট অনুসারে, ২০০০ থেকে ২০৫০ সালের ভিতর এ দেশে বয়স্ক নাগরিকদের সংখ্যা ৩৬০ শতাংশ হারে বাড়তে চলেছে।

বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি সমীক্ষা থেকে পাওয়া তথ্য অনুসারে, বর্তমানে প্রতি ১২ জন ভারতবাসীর মধ্যে একজন বয়স্ক নাগরিক। সমীক্ষালব্ধ সরকারি তথ্যে এ-ও দেখা যাচ্ছে, ২০৫০ সালের ভিতর এ দেশের মোট জনসংখ্যার ভিতর ২১ শতাংশ মানুষই বয়স্ক নাগরিকের পর্যায়ভুক্ত হবেন।

ভারতীয় সংবিধানের ২১ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুসারে, প্রতিটি বয়স্ক নাগরিকের ক্ষেত্রে খাদ্য-বস্ত্র-বাসস্থানের অধিকার হল মৌলিক অধিকারের পর্যায়ভূক্ত। প্রসঙ্গত, ১৯০৬ সালের ফ্রান্সে বয়স্ক নাগরিকদের প্রথম সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্পের আওতায় আনা হয়েছিল।

গত কয়েক দশকে ভারতেও বয়স্ক নাগরিকদের সামাজিক সুরক্ষা দেওয়ার জন্য কেন্দ্র ও রাজ্য সরকার একাধিক প্রকল্প ঘোষণা করেছে। ২০১৫-২০১৬ সালে্ কেন্দ্রীয় বাজেট প্রস্তাবে বয়স্ক নাগরিকদের কল্যাণ প্রকল্পগুলির আওতায় আনার ব্যাপারে জোর দেওয়া হয়েছে। তবে প্রকৃত পরিস্থিতির সঙ্গে থাতাকলমে দেখা স্বপ্নের আকাশ-পাতাল ফারাক।

এ দেশে বয়স্ক নাগরিকদের সামাজিক সুরক্ষার জন্য যে প্রকল্পগুলি রয়েছে, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য ইন্টিগ্রেটেড প্রোগ্রাম ফর ওল্ডার পার্সনস (আইপিওপি), ২০০৭ সালে প্রণয়ন করা হয়েছে মেনটেন্যান্স অ্যান্ড ওয়েলফেয়ার অব পেরেন্টস অ্যাক্ট, ন্যাশনাল ইনিসিয়েটিভ অন কেয়ার ফর এল্ডারলি (এনআইসিই), ন্যাশনাল প্রোগ্রাম ফর হেলথকেয়ার ফর এল্ডারলি (এনপিএইচসিই), ইন্দিরা গান্ধী ন্যাশনাল ডিসএবিলিটি পেনশন স্কিম বা ন্যাশনাল ওল্ডেজ পেনশন স্কিমের মতো অনেকগুলি সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্প।

তা হলে অসুবিধাটা কোথায়? ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের (কলকাতা) জনতত্ত্ববিদ শাশ্বত ঘোষ বললেন, আসলে সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্পগুলিতে বয়স্ক নাগরিকদের জন্য মাথাপিছু যে পরিমাণ টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে, তাতে তাঁদের ওষুধপত্র কেনার খরচের সঙ্কুলানও হবে না। বছরে বা মাসিক যে টাকাটা বেশির ভাগ সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্পগুলিতে মিলছে, তা অতি সামান্য। হয়তো মাসিক ৭৫ টাকার ভাতা বাড়িয়ে ২০০ টাকা করা হয়েছে। ওই টাকায় সংসারের খরচখরচা চালানো কর্মহীন বা অসুস্থ বয়স্ক নাগরিকদের পক্ষে অসম্ভবই।

শাশ্বত আরও জানিয়েছেন, ফলে গ্রাসাচ্ছাদনের জন্য এই রাজ্যের হাজার হাজার বয়স্ক নাগরিক অসুস্থ শরীরেও কাজ করতে বাধ্য হচ্ছেন। এঁদের ভিতর ৭৯ শতাং‌শ বয়স্ক পুরুষ ও ৯৮ শতাংশ বয়স্ক মহিলা কর্মস্থল থেকে দিনমজুরির বাইরে আর্থিক কোনো সুযোগ-সুবিধাই পান না। অন্য দিকে, গ্রামাঞ্চলেও একই পরিস্থিতি। এখানকার বাসিন্দা বহু বয়স্ক নাগরিক মাসে ২ হাজার টাকাও আয়ের সংস্থান করতে পারছেন না। শহরাঞ্চলে এটা বড়োজোর বাৎসরিক ৫০ হাজার টাকা আয়ে গিয়ে দাঁড়াবে। এ ছাড়া, বয়স্ক পুরুষ নাগরিকদের ভিতর ২৯ শতাংশই প্রথাগত কোনো শিক্ষার সুযোগ পাননি। আর মহিলাদের ভিতর দুই-তৃতীয়াংশই শিক্ষার সুযোগ থেকে পুরোপুরি বঞ্চিত।

এ দিকে এ দেশের নারী ও পুরুষের গড় আয়ু বাড়ছে বলে সরকারি ঘোষণা।  আগামী কয়েক বছরের ভিতর পুরুষের গড় আয়ু বাড়িয়ে ৭৫ বছর ৮ মাস, মহিলাদের ক্ষেত্রে এটা ৭১ বছর ৮ মাস করার লক্ষ্যমাত্রা নেওয়া হয়েছে।

তা হলে একটা বয়সের পরে শরীর যখন অশক্ত, সেই সময় থেকে জীবনের শেষ দিনটি পর্যন্ত কি অন্যের দয়ায় বেঁচে থাকবেন প্রবীণ-প্রবীণারা? কেননা সমীক্ষা অনুসারে, এই রাজ্যের বাসিন্দা মাত্র ১৪ শতাংশ প্রবীণ নাগরিক আর্থিকভাবে স্বনির্ভর।

এ ব্যাপারে প্রতিক্রিয়া চাওয়া হলে এই রাজ্যের সমাজকল্যাণ দফতরের মন্ত্রী শশী পাঁজা কার্যত এড়িয়ে গিয়েছেন। তাঁর কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল, রাজ্য সরকারের তরফে বয়স্ক নাগরিকদের সামাজিক সুরক্ষা নিয়ে সময়োপযোগী কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। সমাজকল্যাণ মন্ত্রী জানিয়েছেন, এ প্রসঙ্গে বলবার মতো উত্তর তাঁর কাছেও নেই।

বিজ্ঞাপন
loading...

মতামত দিন

Please enter your comment!
Please enter your name here