‘বাবা’র মাথায় প্রথম জল ঢালেন শেখ ফরজর, তার পর বাকিরা

0
2890
রিন্টু ব্রহ্ম

২৫ শ্রাবণ। ‘বাবা’র মাথায় জল ঢালার জন্য বিশাল লাইন পড়ে গিয়েছে। সবাই ধৈর্য অপেক্ষা করছেন। তিনি আসবেন যে! প্রতি বছরের মতো এ বারেও তিনি এলেন। ‘বাবা’র মাথায় প্রথম জল ঢাললেন। তার পর সবাই।

মনে পড়ে গেল নজরুলের বিখ্যাত সেই দুই ছত্র – “মোরা একই বৃন্তে দুটি কুসুম হিন্দু মুসলমান, মুসলিম তার নয়নের মণি, হিন্দু তাহার প্রাণ। আর দ্বিজেন্দ্রলাল এই দেশ ভারতবর্ষ সম্পর্কে লিখেছিলেন, “বিবিধের মাঝে দেখো মিলন মহান”। বর্তমান সামাজিক প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে এই ভাবনাগুলি প্রতি মুহূর্তে অতীব প্রাসঙ্গিক। দেশের বহু জায়গায় ধর্মের নামে হানাহানি, একটা অস্বস্তিকর বাতাবরন। সেই সময় এক অদ্ভুত সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির নজির গড়ে চলেছে বর্ধমান।

এই বর্ধমান শহরেই রয়েছেন ‘বাবা বর্ধমানেশ্বর’। শুধু পশ্চিমবঙ্গই নয়, দেশের অন্যতম বৃহৎ শিবলিঙ্গ। শ্রাবণ মাস পড়তেই শুরু হয়ে যায় হিন্দু ধর্মের মানুষদের তথা শিবের উপাসকদের বিভিন্ন শিবলিঙ্গে জল ঢালা। মাইলের পর মাইল পথ পায়ে হেঁটে বহু মানুষ যান তারকেশ্বরে, আবার বেশ কিছু মানুষ আসেন বর্ধমানে ‘মোটা বাবা’র মন্দিরে। কিন্তু অন্য শিবলিঙ্গে জল ঢালার সঙ্গে বর্ধমানেশ্বরের মাথায় জল ঢালায় তফাত আছে। শ্রাবণ মাসে বর্ধমানেশ্বরের আবির্ভাবের দিনে এক মুসলিম ভক্ত এখানে সর্বপ্রথম জল ঢালেন, তার পরই হিন্দু ভক্তরা জল ঢালা শুরু করেন। মন্দিরের খোদ হিন্দু কর্তারাই এই নিয়ম চালু করেন।

প্রথম থেকেই এই নিয়ম ছিল না। বছর দশেক আগে এক মুসলিম ভক্ত আসেন এই শিবলিঙ্গে জল ঢালতে। বর্ধমানের নেরুলা গ্রামের বাসিন্দা শেখ ফরজল আলি। কাটোয়া থেকে অন্যদের সঙ্গে গঙ্গাজল এনে এখানে জল ঢালতেন। কয়েক বছর ধরে এ ভাবে চলে আসার পর বাবা বর্ধমানেশ্বর পুজো কমিটির লোকজনদের নজরে আসেন শেখ ফরজর। এই পুজো কমিটির এক পরিচালক জানান, “আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম শেখ ফরজর আলিই সর্বপ্রথম জল ঢালবেন তার পর অন্য ভক্তরা জল ঢালবেন। গত দু-বছর ধরে  এটাই চলে আসছে। ওঁর পিছনে প্রায় ১৮০০০ ভক্ত জল ঢালার জন্য অপেক্ষা করেন। বাবা বর্ধমানেশ্বর সকলের কাছে সমান। সব ধর্মের মানুষেরা একসাথ হয়ে আমাদের এই অনুষ্ঠান সম্পন্ন করেন।”

১৯৭২ সালে আবির্ভাব ঘটেছিল এই ‘মোটাবাবার’। সেই উপলক্ষেই প্রতি বছর ২৫ শ্রাবণ বাবার আবির্ভাব দিবস পালন করা হয়। এই মুসলিম ভক্তের শুভ সূচনার মাধ্যমেই শ্রাবণে সম্প্রীতির বার্তা নিয়ে আসেন বাবা বর্ধমানেশ্বর।

বাবার ভক্ত শেখ ফরজল আলি বলেন, “আমি প্রতি বছরই কাটোয়া থেকে প্রায় ৪০ কিমি পায়ে হেঁটে বাবার কাছে আসি। আমি হিন্দু মুসলিম বুঝি না। মানুষের দরকারে সব সময় এগিয়ে আসি। সৎকারকাজে শ্মশানেও যাই আবার কবরেও মাটি দিই। আমার দেহ আমি দান করেছি, যাতে মৃত্যুর পর আমার কোনো ধর্ম না দেখা হয়। এই  পুজো কমিটিকে ধন্যবাদ আমাকে এই সন্মান দেওয়ার জন্য। প্রতি বছরই আমি এই দিনটার অপেক্ষায় থাকি।”

 

বিজ্ঞাপন
loading...

মতামত দিন

Please enter your comment!
Please enter your name here