আবার ভুয়ো চিকিৎসক, এ বার ধূপগুড়ি ব্লকের প্রত্যন্ত গ্রামে

0
657

নিজস্ব সংবাদদাতা, জলপাইগুড়ি : খবরটা ছড়িয়ে পড়তেই এখন ‘মুন্নাভাই এমবিবিএস’-এর ছোটো ভাই ‘বিনয়ভাই এমবিবিএস’ বলে ঠাট্টা করছেন সকলে। কিন্তু দিন কয়েক আগেও ডা: বিনয় রায়ের চেম্বারে রোগীদের ভিড় লেগেই থাকত, যদিও শুক্রবার থেকে তাঁর ঠিকানা শ্রীঘর।  এ দিন সকালেই বাড়ি থেকে বিনয় রায়কে গ্রেফতার করেছে ধূপগুড়ি থানার পুলিশ। তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ, এমবিবিএস চিকিৎসক পরিচয় দিয়ে দীর্ঘদিন ধরে চেম্বার খুলে প্র্যাকটিস করছিলেন তিনি।

দক্ষিণ সাঁকোয়াঝোরা, জলপাইগুড়ি জেলার ধূপগুড়ি ব্লকের প্রত্যন্ত গ্রাম। এই গ্রামেরই এক কৃষক পরিবারের ছেলে বিনয় রায়। তিনি নিজেও চাষাবাদ করতেন। ২০০৬ সালে উচ্চমাধ্যমিকে অকৃতকার্য হওয়ার পর ফের ২০০৯ সালে পরীক্ষায় বসেন। এ বার টেনেটুনে পাশ। তার পরই গ্রাম থেকে উধাও হয়ে যান। বছরখানেক পর ফিরে এসে নিজেকে চিকিৎসক পরিচয় দিয়ে চেম্বার ফেঁদে বসেন বাংকুবাজার এলাকায়। তাঁর চেম্বারে জীবনদায়ী ওষুধ থেকে চিকিৎসার সমস্ত ব্যবস্থাই থাকত। নিজেই কম্পিউটারে ডিজাইন করে প্রেসক্রিপশন বানিয়েছিলেন, যাতে গোটা গোটা অক্ষরে লেখা থাকত ডা: বিনয় রায় (এমবিবিএস)।

গ্রামাঞ্চলে চিকিৎসকের অভাব। তাই পসার জমতে দেরি হয়নি। প্রথমে ৫০ টাকা ভিজিট থাকলেও এখন বেড়ে তা ১০০টাকা হয়েছিল। সঙ্গে ওষুধ, ইনজেকশনের দাম। এই ভাবে গত সাত বছর ধরে বেশ রমরমা কারবার চালিয়ে চলিয়ে যাচ্ছিলেন তিনি। কিন্তু রাজ্য জুড়ে জাল চিকিৎসকদের খবর নজর এড়ায়নি স্থানীয় বাসিন্দাদের। বিনয় রায়ের চিকিৎসাপদ্ধতি দেখে সন্দেহ হয়েছিল তাঁদের। তাঁদের মারফতই অভিযোগ আসে জলপাইগুড়ি জেলা স্বাস্থ্য দফতরে। অভিযোগ খতিয়ে দেখতে একটি ‘বিশেষ তদন্তকারী দল’ যায় ওই এলাকায়। তদন্ত করে জানা যায়, উচ্চমাধ্যমিক পাশ করে কোচবিহারের একটি সংস্থা থেকে অল্টারনেটিভ মেডিসিন নিয়ে একটি কোর্স করেন বিনয় রায়। তার পরই তিনি গ্রামে ফিরে নিজেকে চিকিৎসক পরিচয় দিয়ে রমরমা কারবার ফেঁদে বসেন। যদিও তার ‘ডাঃ’ লেখার অধিকার নেই বলেই জানাচ্ছে স্বাস্থ্য দফতর। ‘ডাঃ’ লেখা যে ভুল হয়েছে, গ্রেফতারির পর তা স্বীকার করে নিয়েছেন বিনয় রায়। যে চেম্বার থেকে ওষুধ বিক্রি করতেন তার ড্রাগ লাইসেন্সও তিনি দেখাতে পারেননি তদন্তকারী দলকে। এর পরেই তাঁর বিরুদ্ধে বৃহস্পতিবার ধূপগুড়ি থানায় অভিযোগ জানানো হয় বলে জানিয়েছেন জেলার মুখ্য স্বাস্থ্য আধিকারিক ডাঃ জগন্নাথ সরকার। তার ভিত্তিতেই শুক্রবার তাঁকে গ্রেফতার করে জলপাইগুড়ি আদালতে তোলা হয়। আদালতের সরকারি আইনজীবী প্রদীপ চ্যাটার্জি জানিয়েছেন, বিচারকের নির্দেশে আপাতত ১৪ দিনের জন্য তাঁর ঠাঁই জলপাইগুড়ি কেন্দ্রীয় সংশোধনাগার।

বিজ্ঞাপন

তবে এই ভুয়ো চিকিৎসককে নিয়ে রীতিমতো ব্যতিব্যস্ত স্বাস্থ্য দফতর। এর আগে জলপাইগুড়ি ধুমপাড়া স্বাস্থ্যকেন্দ্রে কর্মরত স্নেহাশিস চক্রবর্তী গ্রেফতার হয়েছিলেন। আলিপুরদুয়ার এবং চোপড়া থেকেও দু’জন ভুয়ো চিকিৎসককে গ্রেফতার করেছিল সিআইডি। তার পর থেকে যে হারে জেলার বিভিন্ন জায়গা থেকে অভিযোগ আসছে তাতে কালঘাম ছুটেছে জলপাইগুড়ি জেলা স্বাস্থ্য দফতরের। ভুয়ো চিকিৎসক সংক্রান্ত অভিযোগ খতিয়ে দেখার জন্য জেলাশাসক রচনা ভগতের নির্দেশে দু’টি ‘মনিটরিং টিম’ গঠন করা হয়েছে। এই টিমে রয়েছেন মালবাজার ও জলপাইগুড়ি, এই দু’টি মহকুমার ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট, অতিরিক্ত জেলা স্বাস্থ্য আধিকারিক। জুন মাসেই জেলা থেকে ছয় জন চিকিৎসকের নামে অভিযোগ এসেছিল, যার মধ্যে ছিলেন বিনয় রায়ও। শুক্রবারই জলপাইগুড়ি কোতোয়ালি থানায় রতন বিশ্বাস নামে এক দন্তচিকিৎসকের বিরুদ্ধে অভিযোগ জানিয়েছে স্বাস্থ্য দফতর। বাকিদের বিরুদ্ধে অভিযোগগুলি খতিয়ে দেখছে মনিটরিং টিম, জানিয়েছেন মুখ্য স্বাস্থ্য আধিকারিক ডাঃ জগন্নাথ সরকার।

এ দিকে এই ভুঁইফোড় চিকিৎসকদের জন্য সমস্যায় পড়ছেন আসল চিকিৎসকরাও। রোগী পরিষেবাও এতে ব্যাহত হচ্ছে। এক জন রোগী কোনো এক ভুয়ো চিকিৎসকের কাছ থেকে ভুল চিকিৎসা করিয়ে আরও অসুস্থ হয়ে পড়ছেন। তার পর কোনো স্বাস্থ্যকেন্দ্র বা আসল চিকিৎসকের কাছে যখন যাচ্ছেন, তখন তাঁকে সুস্থ করে তোলা কঠিন হয়ে যাচ্ছে। এর ফলে রোগীর রোষের শিকার হচ্ছেন সেই আসল চিকিৎসকরা, মন্তব্য জলপাইগুড়ির প্রখ্যাত মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডাঃ স্বস্তিশোভন চৌধুরীর।

এই সমস্যা অজানা নয় জেলা স্বাস্থ্য দফতরেরও। তাই ভুয়ো চিকিৎসক নির্মূল করতে জেলার প্রত্যন্ত এলাকা চষে বেড়াচ্ছেন মনিটরিং টিমের সদস্যরা।

বিজ্ঞাপন
loading...

মতামত দিন

Please enter your comment!
Please enter your name here