নেতাজির প্রথম পূর্ণাবয়ব মূর্তি রয়ে গিয়েছে লোকচক্ষুর আড়ালেই

0
99

নিজস্ব সংবাদদাতা, জলপাইগুড়ি: ইতিহাস রয়ে গেছে ‘ইতিহাস’ হয়েই। লোকচক্ষুর আড়ালে। সাধারণ মানুষ হয়তো জানেনই না। কিন্তু এটা সত্যি, ৬৬ বছর আগে এই জলপাইগুড়িতেই প্রথম তৈরি হয়েছিল দেশের বরেণ্য বীরসৈনিক সুভাষচন্দ্র বসুর পূর্ণাবয়ব মূর্তি, যা থেকে গিয়েছে লোকচক্ষুর আড়ালে। জলপাইগুড়ির নেতাজি সুভাষ ফাউন্ডেশনের সংগ্রহশালার এক কোণে এখন ঠাঁই তার। শুধুমাত্র ২৩ জানুয়ারি, তাঁর জন্মদিনে একটু ফুল-মালা নিবেদিত হয়, বাকি সময়টা ইতিহাসের ভুলে যাওয়া পাতার মতো।

সালটা ১৯৫১। স্বাধীনতার পর দেশে তখন ডামাডোল অবস্থা। দেশভাগের অস্থিরতা, দিল্লির গদি দখলের লড়াই এবং নেহরুর হাত ধরে এক নতুন অধ্যায় স্বাধীন ভারতবর্ষের রাজনীতিতে।

এরই মধ্যে ৪৫’এ বিমান দুর্ঘটনায় সুভাষচন্দ্র বসুর মৃত্যুর গুজবে দ্বিধাদ্বন্দ্বে বাঙালি তথা আপামর দেশবাসী। তাঁরা এই গুজবে বিশ্বাস করবেন কি করবেন না বুঝে উঠতে পারছিলেন না। চুপ দেশের বরেণ্য নেতা-স্বাধীনতা সংগ্রামীরাও।

অবস্থাটা এমন ছিল যে, দেশের এই বীর সন্তানকে নিয়ে একপ্রকার মুখে কুলুপ এঁটেছিলেন সকলেই। তাঁর স্মৃতি রক্ষা করা, বা তাঁর লড়াইয়ের ইতিহাসকে স্মরনীয় করে রাখার জন্য কোনো উদ্যোগ ছিল না সেরকম ভাবে।

এই অবস্থা নাড়া দিয়েছিল বাংলার এক প্রত্যন্ত শহরের এক স্বাধীনতা সংগ্রামীকে। তিনি সতীশচন্দ্র লাহিড়ী। জলপাইগুড়ি শহরের বাসিন্দা এবং প্রখ্যাত কবিরাজ। ১৯৩৯ সালে জলপাইগুড়ি এসেছিলেন সুভাষ। শহরের পাণ্ডাপাড়ায় হয়েছিল বঙ্গীয় প্রাদেশিক সন্মেলন। তাতে যোগ দিয়ে ব্রিটিশদের ভারত ছাড়ার আওয়াজ তুলেছিলেন নেতাজি। যুবক সতীশবাবুকে নাড়া দিয়েছিল সেই ডাক। তার পর থেকে নেতাজি-ভক্ত সতীশচন্দ্র লাহিড়ী সম্পূর্ণ ভাবে নিজেকে স্বাধীনতা সংগ্রামে উজাড় করে দেন। কিন্তু স্বাধীনতা পর নেতাজির প্রতি অবহেলা তাঁকে বারবার বিদ্ধ করছিল। তখনই তিনি উদ্যোগ নেন সুভাষচন্দ্রের মূর্তি তৈরির। তাঁর পাশে এসে দাঁড়িয়েছিলেন সেই সময়ের শহরের কিছু বিশিষ্ট মানুষও। তাঁদের সম্মিলিত উদ্যোগে প্লাস্টার অফ প্যারিসের মূর্তি তৈরি হয়, যা হল দেশের সর্বপ্রথম নেতাজির মর্মর মূর্তি। উত্তরবঙ্গের বিশিষ্ট ঐতিহাসিক এবং প্রাবন্ধিক উমেশ শর্মা জানিয়েছেন, করলা নদীর তীরে মূর্তিটির উদ্বোধন করেন তৎকালীন আন্তর্জাতিক আদালতের প্রখ্যাত বিচারপতি রাধাবিনোদ পাল।

যদিও এর পরেও এই মূর্তির ওপর দিয়ে ঝড়ঝাপটা কম যায়নি। ১৯৬৮ সালে বিধ্বংসী বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয় সেটি। ১৯৭১ সালে নকশাল আন্দোলনের সময় মুণ্ডছেদ করার চেষ্টা হয় এই এতিহাসিক মূর্তিটির। তার পরেও বহু দিন অবহেলায় রাস্তার পাশে ঠাঁই হয়েছিল তার। ২০০১ সালে তৎকালীন ফরওয়ার্ড ব্লক বিধায়ক গোবিন্দ রায় এই মূর্তিটি সংরক্ষণের উদ্যোগ নেন। তাঁর উদ্যোগে এবং বিভিন্ন সরকারি দফতরের সহায়তায় তৈরি হয় নেতাজি কমপ্লেক্স যা এখন নেতাজি সুভাষ ফাউন্ডেশন। তার সংগ্রহশালাতেই রয়েছে এই ঐতিহাসিক মূর্তি। যদিও এই মূর্তি বা তার ইতিহাস সম্পর্কে ওয়াকিবহাল নন অনেক সাধারণ মানুষই। প্রাক্তন বিধায়ক এবং ফাউন্ডেশনের সম্পাদক গোবিন্দ রায় জানিয়েছেন, এই মূর্তিটি যাতে প্রচারের আলোয় আসে এবং সাধারণ মানুষ যাতে এর ইতিহাস জানতে পারেন তার জন্য সরকারি ভাবে উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। শহরের এক বাসিন্দা পার্থপ্রতিম দে দাবি জানিয়েছেন, এই ঐতিহাসিক মূর্তি যা সাধারণ মানুষ দেখতে পারেন, তার জন্য প্রশাসনকে উদ্যোগ নিতে হবে। এই বিষয়ে সাহায্য করবেন বলে জানিয়েছেন জলপাইগুড়ির বিধায়ক সুখবিলাস বর্মা।

তবে গত ৬৬ বছর ধরে যা অন্তরালে রয়েছে তা আদৌ লোকচক্ষুর সামনে আসবে নাকি এই বীর সৈনিকের মৃত্যু-রহস্যের মতো এই মূর্তির ইতিহাসও আড়ালেই চাপা পড়ে যাবে তা নিয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্ব থেকেই যাচ্ছে বিদ্ধগ্ধ মহলে। 

বিজ্ঞাপন
loading...

মতামত দিন

Please enter your comment!
Please enter your name here