কলকাতার পুরোনো বাড়ি ভাঙা পুরসভার পক্ষে অসম্ভব

0
178

saibal-biswas

শৈবাল বিশ্বাস

কলকাতার পুরোনো বাড়ি ভাঙা নিয়ে ২৮ সেপ্টেম্বর বুধবার মেয়র শোভন চট্টোপাধ্য‌ায় বৈঠক ডেকেছেন। স্বভাবতই প্রশ্ন উঠেছে তাহলে কি ভাড়াটিয়ারা এবার থেকে বাড়িওয়ালার অনুমোদন ছাড়াই বাড়ি সারিয়ে নিতে পারবেন? নিজেদের ই্চ্ছামতো উন্নয়ন বা প্রোমোটিঙের অধিকারও কি তাঁরা পাবেন? এর চেয়েও আরও একটি বড়ো প্রশ্ন এই মুহূর্তে কলকাতার বাড়িওয়ালা এবং ভাড়াটিয়া উভয়ের মধ্য‌েই দানা বেঁধেছে, তা হল পুরসভা কি ইচ্ছা করলে ভগ্নদশায় পরিণত পুরোনো  বাড়ির বাসিন্দাদের বাড়ি থেকে উচ্ছেদ করতে পারে?

প্রথমেই আসা যাক পুরসভা উচ্ছেদ করার অধিকারী কি না সেই প্রশ্নে। ১৯৮০ সালের কলকাতা পুরসভা আইনে কোথাও বলা নেই যে বিপজ্জনক ভগ্নদশায় চলে যাওয়া বাড়ি থেকে পুরসভা কাউকে উচ্ছেদ করতে পারবে। উচ্ছেদের অধিকার রয়েছে একমাত্র মালিকের এবং পশ্চিমবঙ্গ বাড়িভাড়া আইন ১৯৯৭ ও ট্রান্সফার অফ প্রপার্টি আইন (যা টিপি অ্য‌াক্ট নামেই বেশি প্রচলিত) অনুযায়ী তা কার্যকর করা যায়। আরও একটি ক্ষেত্রে বাড়ির বাসিন্দাদের উচ্ছেদ সম্ভব। সেটা হল বাড়ি যদি সরকার রিকুইজিশন করে তবেই। সে ক্ষেত্রে ক্ষতিপূরণ দিয়ে সরকারি অধিগ্রহণ আইন অনুসারে উচ্ছেদ করা যেতে পারে। কিন্তু পুরসভার একেবারেই উচ্ছেদের কোনো অধিকার নেই। কোনো বাড়ি যদি ভগ্নদশায় চলে যায় এবং সেই বাড়িতে বসবাস করা অসম্ভব হয় তাহলে পুরসভা বড়জোর বাড়ির গায়ে ‘বিপজ্জনক বাড়ি’র তকমা লাগাতে পারে, তার বেশি কিছু করার অধিকার তাদের নেই। এমনকি বাড়ি ভেঙে ফেলার কোনো অধিকারও পুরসভার নেই। একমাত্র নতুন বাড়ি নির্মাণের কাজে বেআইনি কিছু হলে বা পুরোনো বাড়িতে বেআইনি নির্মাণ হলে (পুরসভার বিধিসম্মত অনুমোদন ছাড়া) পুর আইন ১৯৮০-র ৪০১ ধারা মোতাবেক সেই নির্মাণ ভেঙে দেওয়ার অধিকার পুরসভার আছে। কিন্তু পুরোনো বাড়ি অবিকল অবস্থায় থেকে যদি বসবাসের অযোগ্য‌ হয়ে পড়ে তাহলে আইন মোতাবেক পুরসভা কোনো ব্য‌বস্থা নেওয়ার অধিকারী নয়। সম্প্রতি পাথুরিয়াঘাটায় বাড়ি ভেঙে যাওয়ায় পুরকর্তাদের টনক নড়লেও বস্তুত সমস্য‌াটির সঙ্গে আইনগতভাবে পুরসভার তেমন যোগাযোগ নেই। বিষয়টির টিকি অন্য‌ত্র বাঁধা রয়েছে।

এবার আসা যাক আইন মোতাবেক বাড়িওয়ালা পুরোনো বাড়ি ভেঙে ফেলার অধিকারী কিনা সেই প্রশ্নে।

১৯৯৭ সালের পশ্চিমবঙ্গ বাড়িভাড়া আইনের ১০ ও ১১ নম্বর ধারায় বাড়িওয়ালা নতুন নির্মাণের জন্য‌ পুরোনো বাড়ি ভেঙে ফেলতে পারেন কিন্তু সেখানে বেশ কিছু শর্ত চাপানো হয়েছে। বলা হয়েছে, ভাড়াটিয়াকে নতুন নির্মাণের জন্য‌ সাময়িকভাবে উচ্ছেদ করা যেতে পারে তবে নির্মাণ হয়ে গেলে তাঁকে ফের নির্দিষ্ট পরিমাণ জায়গাই ফিরিয়ে দিতে হবে। অর্থাৎ তাঁকে পুরোপুরি উচ্ছেদ করা যাবে না। সে ক্ষেত্রে ভাড়াটিয়া অবশ্য‌ পুরোনো ভাড়ায় থাকতে পারবেন না। তাঁকে নতুন হারে ভাড়া দিতে হবে। এই ক্ষেত্রে নতুন ভাড়ার হার স্থির হয় জমির বার্ষিক মূল্য‌ এবং নির্মাণখরচের বার্ষিক মূল্য‌ের যোগফলের বার্ষিক ৬.৭৫ শতাংশ। অর্থাৎ ধরে নেওয়া যাক কোনো জমির বার্ষিক মূল্য‌ ৫০ হাজার টাকা এবং নির্মাণখরচের বার্ষিক মূল্য‌ ৫০ হাজার টাকা। তাহলে বার্ষিক ভাড়া হবে ১ লক্ষ টাকার ৬.৭৫ শতাংশ বা ৬৭৫০ টাকা। এর ওপর রক্ষণাবেক্ষণের জন্য‌ ১০ শতাংশ এবং ব্য‌বসায়ী ভাড়াটিয়া হলে ১০০ শতাংশ কমার্শিয়াল সারচার্জ এবং বসবাসের ভাড়াটিয়া হলে ২০ শতাংশ পুরকর (সর্বোচ্চ) ভাড়াটিয়াকে দিতে হবে। এর থেকে বোঝা যাচ্ছে নতুন বাড়ি নির্মাণের ক্ষেত্রে পুরোনো ভাড়াটিয়ার অনেকটাই ভাড়াবৃদ্ধি হবে।

প্রশ্ন উঠেছে, ভাড়া যদি এতটাই বৃদ্ধি পেতে পারে তাহলে পুরোনো বাড়ির বাড়িওয়ালারা বাড়ি ডেভেলপ করছেন না কেন। দ্য ক্য‌ালকাটা হাউসওনার্স অ্য‌াসোসিয়েশনের সম্পাদক সুকুমার রক্ষিত মনে করেন, এই ভাড়ার হার অত্য‌ন্ত অপ্রতুল কারণ নির্মাণখরচের জন্য‌ বাড়িওয়ালা যদি ব্য‌াঙ্ক থেকে টাকা ধার নেন তাহলে ৬.৭৫ শতাংশের অনেক বেশি হারে তাঁকে ঋণ শোধ করতে হয়, ফলে টাকা উঠে আসার সম্ভাবনা অনেকটাই কমে যায়। তার ওপর অনেকেই মনে করেন ভাড়া বসালে যখন ব্য‌াঙ্কের ফিক্সড ডিপোজিটের চেয়ে কম রোজগার হয় তখন বেকার এতগুলো টাকা বিনিয়োগ করার কী দরকার। ফলে পুরোনো বাড়ি নিয়ে বাড়িওয়ালাদের কোনো মাথাব্য‌থাই নেই।

সুকুমারবাবু আরও একটি জরুরি প্রশ্নের দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করে সম্প্রতি মেয়রকে চিঠি দিয়েছেন। সেটি হল বাড়িওয়ালাদের প্রায় ২৫০ কোটি টাকা এই মুহূর্তে রেন্ট কন্ট্রোলারের দপ্তরে জমা আছে। কলকাতা হাইকোর্টের রেজিষ্ট্রার বিতর্কিত বাড়িভাড়া রেন্ট কন্ট্রোলে জমা দেওয়ার পরিবর্তে বাড়িওয়ালার নামে আলাদা ব্য‌াঙ্ক অ্য‌াকাউন্টে জমা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন। কিন্তু এই নির্দেশ কার্য়কর হয়নি। এদিকে রেন্ট কন্ট্রোলারের কাছে জমা পড়া টাকা বহুদিন যাবৎ ফেরত পাওয়া যাচ্ছে না। ১৯৯৭ সালের পশ্চিমবঙ্গ বাড়িভাড়া আইনে ভাড়াবৃদ্ধির সব দায়িত্ব কন্ট্রোলারকে প্রদান করা হয়েছে। কিন্তু সেখানে বছরের পর বছর মামলার পাহাড় জমে একটি মামলার নিষ্পত্তি হতে ৮-১০ বছর লেগে যায়। যে কারণে ভাড়াবৃদ্ধির বিষয়টি বিশ বাঁও জলে তলিয়ে যায়। বাড়িভাড়া আইনের ১৮ নম্বর ধারায় বলা হয়েছিল প্রতি চার বছর অন্তর ভাড়াবৃদ্ধির হার পুনর্বিবেচনা করা হবে। আইন চালু হওয়ার সময় অর্থাৎ ২০০১ সাল থেকে আজও পর্যন্ত ভাড়া বৃদ্ধির হার পুনর্বিবেচনা করা হয়নি। ফলে ভাড়ার হার বৃদ্ধির কোনো সুযোগ পুরোনো বাড়ির বাড়িওয়ালাদের নেই।

পুরকরের বাড়বাড়ন্তও বাড়িওয়ালাদের মানসিক বীতরাগের কারণ। কলকাতা পুরসভা ভাড়ার ৪০ শতাংশ হারে পুরকর আদায় করে থাকে। এর মধ্য‌ে ভাড়াটিয়ার প্রদত্ত ২০ শতাংশ কর ও কমার্শিয়াল সারচার্জও রয়েছে। একে ভাড়া কম, তার ওপর করের অর্থও যদি বাড়িওয়ালাকে দিতে হয় তাহলে তাঁর পক্ষে সম্পত্তি দেখভাল করাটা অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। তাই মেয়র যতই গর্জান আইনগতভাবে তিনি কিছু করতে পারেন না। বাড়িভাড়া সংক্রান্ত মূল সমস্য‌ার সমাধান না করে পুরোনো বাড়ির রক্ষণাবেক্ষণের চিন্তাটা আদতে অসার।

বিজ্ঞাপন
loading...

মতামত দিন

Please enter your comment!
Please enter your name here