পাহাড়-সমতলে রেকর্ড-ভাঙা বৃষ্টিতে জলবন্দি উত্তরবঙ্গ, মৃত ৩, নিখোঁজ ১

0
2130

নিজস্ব সংবাদদাতা, জলপাইগুড়ি: পূর্বাভাস মতোই প্রবল বৃষ্টিতে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে উত্তরবঙ্গ। সৃষ্টি হয়েছে বন্যা পরিস্থিতি, বাতিল হয়েছে ট্রেন। পনেরো বছরের রেকর্ড ভেঙে দিয়েছে জলপাইগুড়ি। বৃষ্টি-বন্যায় উত্তরবঙ্গে মারা গিয়েছেন তিন জন, নিখোঁজ এক জন।

টানা চার দিন ধরে বৃষ্টি চলছে উত্তরের জেলাগুলিতে। শুধুমাত্র জলপাইগুড়িতেই গত ২৪ ঘন্টায় বৃষ্টিপাতের পরিমাণ  ২৯৫.২ মিমি। গত পনেরো বছরে এক দিনে এত বৃষ্টি হয়নি বলে জানা গিয়েছে। এই রেকর্ড পরিমাণ বৃষ্টির ফলে জলমগ্ন জলপাইগুড়ি পৌর এলাকার দশটি ওয়ার্ড। নেতাজিপাড়া,ইন্দিরা কলোনি-সহ দশটি ওয়ার্ডের কমপক্ষে হাজার দশেক মানুষ জলবন্দি হয়ে পড়েছেন। জল বাড়তে শুরু করেছে শহরের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া করলা নদীর।

ধূপগুড়ি,  নাগরাকাটা, মালবাজার ব্লকের বিস্তীর্ণ এলাকা  জলমগ্ন। জেলা প্রশাশনের হিসেব অনুযায়ী প্রায় একলক্ষ চব্বিশ হাজার মানুষ জলবন্দি। ত্রাণ নিয়ে ক্ষোভ রয়েছে মানুষের মধ্যে। তবে জেলাশাসক রচনা ভগত জানিয়েছেন, দুর্গতদের ত্রাণের জন্য সব রকম ব্যবস্থা করা হয়েছে। ত্রাণ বিলির জন্য ৯১টি ত্রাণশিবির করা হয়েছে। তৈরি রাখা হয়েছে বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী ও মেডিক্যাল টিম।

তবে জলপাইগুড়ি জেলা প্রশাসন সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়েছে রবিবার ধূপগুড়িতে পৌরসভা নির্বাচন থাকায়। জেলা প্রশানের প্রস্তাব মেনে ইতিমধ্যেই ১৫ এবং ১৬নম্বর ওয়ার্ডের নির্বাচন স্থগিত করে দিয়েছে নির্বাচন কমিশন। ওই দুটি ওয়ার্ডের সব কটি বুথই জলের তলায়। পৌঁছোতে পারেননি ভোটকর্মীরা। ১৬ আগস্ট ওই দুটি ওয়ার্ডে ফের নির্বাচন হবে। ১৪নং ওয়ার্ডের বুথ অন্যত্র সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। তবে তাতেও সমস্যা মিটছে না। ওয়ার্ডগুলির জলমগ্ন রাস্তা পেরিয়ে ভোটাররা কী ভাবে ভোটগ্রহণ কেন্দ্রে পৌঁছোবেন তা নিয়ে  রীতিমতো চিন্তিত প্রশাসন এবং অবশ্যই রাজনৈতিক নেতারা।

শনিবার সন্ধ্যায় দোমহনি এলাকায় ভেলায় করে তিস্তা নদী পার হয়ে নিরাপদ  আশ্রয়ে যাওয়ার সময় দশ জন জলে পড়ে যান। পরে তাঁদের খোঁজ মেলে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। নদীর জলস্তর আরও বেড়েছে তিস্তা ব্যারেজ থেকে ৩৪০০ কিউমেক জল ছাড়ায়। ইতিমধ্যেই তিস্তার অসংরক্ষিত এলাকায় লাল ও সংরক্ষিত এলাকায় হলুদ সংকেত জারি করেছে সেচ দফতর।

তবে শুধু জলপাইগুড়ি নয়, বৃষ্টি হচ্ছে উত্তরবঙ্গের সর্বত্র। গত ২৪ ঘণ্টায় উত্তরবঙ্গে সব থেকে বেশি বৃষ্টি হয়েছে আলিপুরদুয়ারের হাসিমারায়। সেখানে ৪৮০ মিমি বৃষ্টি রেকর্ড করা হয়েছে, এর পরেই রয়েছে বক্সাদুয়ার। সেখানে বৃষ্টির পরিমাণ ৪৫০ মিমি। আলিপুরদুয়ারে বৃষ্টি হয়েছে ৩৯০ মিলিমিটার। কোচবিহারে ভারী বৃষ্টির কোনো বিরাম নেই। সেখানে বৃষ্টি রেকর্ড করা হয়েছে ২৩৩ মিমি। তুলনায় কিছুটা কম বৃষ্টি হয়েছে দার্জিলিং এবং কালিম্পং জেলায়।

ভয়াবহ অবস্থা কোচবিহারে। কালজানি,  তোর্সা, রায়ডাকের জল বিপদসীমার কাছ দিয়ে বইছে। দিনহাটা, তুফানগঞ্জ, কোচবিহার শহর প্লাবিত। বলরামপুরে কালজানি নদী পার হতে গিয়ে ডুবে মৃত্যু হয় লাল্টু রায় নামে এক যুবকের। ডাউয়াগুড়িতে জলে তলিয়ে যান একজন। তাঁর খোঁজে তল্লাশি চলছে। প্রশাসনের তরফে যুদ্ধকালীন তৎপরতায় চলছে পরিস্থিতি মোকাবিলার কাজ। উত্তরবঙ্গ উন্নয়ন মন্ত্রী রবীন্দ্রনাথ ঘোষ দুর্গত এলাকাগুলিতে যান। মৃত লাল্টু রায়ের বাড়িতে গিয়েও পাশে থাকার আশ্বাস দেন তিনি।

শুধু উত্তরবঙ্গ নয়, মাত্রাতিরিক্ত বৃষ্টি হচ্ছে সিকিম এবং ভুটানেও। এই পরিস্থিতিতে উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন জায়গায় বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। বিপদসীমার ওপর দিয়ে বইছে তিস্তা, তোর্সা, জলঢাকা, কালজানি প্রভৃতি নদীর জল। সেচ দফতরের তরফ থেকে সবকটি বাঁধের ওপর নজরদারি চালানো হচ্ছে। কিছু বাঁধ উচুও করা হচ্ছে।

ভুটান পাহাড়ে বৃষ্টির জেরে প্লাবিত আলিপুরদুয়ার। রায়ডাক, কালজানি নদীর জল ঢুকে প্লাবিত কুমারগ্রাম, ফালাকাটা। জেলা প্রশাসনের হিসেব অনুযায়ী প্রায় কুড়ি হাজার মানুষ জলবন্দি। দুর্গত এলাকা পরিদর্শন করেছেন বিধায়ক সৌরভ চক্রবর্তী। তিনি দ্রুত  ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন জেলা প্রশাসনকে। পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য ভুটান সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে জেলা প্রশাসন। জলমগ্ন মালদা শহরও।মালদা মেডিক্যাল কলেজে জল ঢুকে যাওয়ায় বিপর্যস্ত হয় চিকিৎসা পরিষেবা। বৈষ্ণবনগর ও মানিকচকে শুরু হয়েছে গঙ্গায় ভাঙন।

ডাহুক নদীর জলে প্লাবিত উত্তর দিনাজপুরের চোপড়া। জল বাড়ায় হলুদ সংকেত জারি হয়েছে মহানন্দা, তিস্তায়। বৃষ্টির জলে জলমগ্ন দক্ষিণ দিনাজপুরের বালুরঘাট। ইতিমধ্যেই দুর্গতদের সাহায্যে এগিয়ে এসেছে প্রশাসন।

অবস্থার মোকাবিলা করতে বিভিন্ন এলাকায় মাইকিং করে বাসিন্দাদের সতর্ক করছে প্রশাসন। জেলাগুলিতে খোলা হয়েছে ফ্লাড কন্ট্রোল রুম। খোদ মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় পরিস্থিতির ওপর নজর রেখেছেন।

টানা বৃষ্টিতে ধস নেমেছে পাহাড়ের বেশ কয়েকটি জায়গায়। তার মধ্যে গাড্ডিখান ও আলুয়াবাড়িতে ধসের  ফলে বাড়ি চাপা পড়ে মৃত্যু হয়েছে নরবু তামাং ও মানকুমারি রাই নামে দুজনের। টানা বৃষ্টির ফলে ধস সরানোর কাজও ব্যাহত হচ্ছে। মহানন্দার জল ঢুকে প্লাবিত শিলিগুড়ির একাংশও। বাতিল হয়েছে বেশ কয়েকটি ট্রেনও। মাত্রাতিরিক্ত এই বৃষ্টির প্রভাবে বাতিল হয়েছে ছোটো দূরত্বের ট্রেনও। উত্তরবঙ্গের প্রায় সবকটি ট্রেনই দেরিতে চলছে।

আবহাওয়া দফতরের পূর্বাভাসে জানানো হয়েছে আগামী পাঁচ দিন পরিস্থিতির উন্নতি হওয়ার খুব একটা সম্ভাবনা নেই। তবে মঙ্গলবারের পর থেকে কিছুটা কমতে পারে বৃষ্টির দাপট। বৃষ্টিতে জেরবার সাধারণ মানুষের কাছে আবহাওয়া দফতরের এই পূর্বাভাসটুকুই এখন সম্বল।

বিজ্ঞাপন
loading...

মতামত দিন

Please enter your comment!
Please enter your name here