তেলের দাম তো বাড়ল, কমলে কেন জনগণ তার সুফল পায় না

0
112

খবর অনলাইন : আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়লে দেশের তেল কোম্পানিগুলি এখানে তেলের দাম বাড়াতে এতটুকু দেরি করে না। কিন্তু আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম পড়লে ক্রেতাসাধারণকে তার সুফল দিতে কোম্পানিগুলির এত দ্বিধা কেন ?
বুধবার মধ্যরাত থেকে ফের এক দফা তেলের দাম বাড়ল। কলকাতার বাজারে পেট্রোলের দাম লিটারে ২.৪১ টাকা বেড়ে হল ৬৩.৭৬ টাকা। ডিজেল ১.৬১ টাকা বেড়ে হল ৫০.৭৫ টাকা। দিল্লিতে পেট্রোলের দাম লিটারে ৩.০৭ টাকা এবং ডিজেলের দাম ১.৯০ টাকা বেড়েছে। দাম বাড়ল কেন ? তেল কোম্পানিগুলির একই অজুহাত –- আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বেড়েছে এবং ডলারের সাপেক্ষে টাকার দাম পড়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম এবং ডলার-টাকা বিনিময় হারের ওপর আমাদের দেশে তেলের দাম নির্ভর করে।
সরকার নিয়ন্ত্রিত তেল কোম্পানিগুলি মোটামুটি মাসে দু’ বার, ১ ও ১৬ তারিখে, পেট্রোল-ডিজেলের দাম সংশোধন করে। এর আগে ১ মার্চের ঘোষণা অনুযায়ী পেট্রোলের দাম কমেছিল ৩.০২ টাকা, কিন্তু ডিজেলের দাম বেড়েছিল ১.৪৭ টাকা। ১৬ ফেব্রুয়ারি থেকে যে তিন বার দাম সংশোধন করা হয়েছে তাতে প্রতি বারই ডিজেলের দাম বেড়েছে। এই তিন বারে ডিজেলের দাম মোট বেড়েছে লিটার প্রতি ৩.৬৫ টাকা।
আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম মে-২০১৪-তে উঠেছিল ব্যারেলে ১০৮ ডলার। সেখান থেকে পড়তে পড়তে আজ দাম এসে দাঁড়িয়েছে ব্যারেলে ৪০ ডলারের কাছাকাছি। ভারতীয় ক্রেতারা কিন্তু এর সুফল মোটেই পায়নি। উলটে গত নভেম্বর থেকে পেট্রোল-ডিজেলের ক্ষেত্রে উৎপাদন শুল্ক বাড়ানো হয়েছে পাঁচ পাঁচ বার। ফলে পেট্রোলের ক্ষেত্রে শুল্ক বেড়েছে লিটারে ৪.০২ টাকা এবং ডিজেলের ক্ষেত্রে ৬.৯৭ টাকা। আর কেন্দ্রীয় সরকারের কোষাগারে জমা পড়েছে অতিরিক্ত ১৭ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব।
অপরিশোধিত তেলের ভারতীয় বাস্কেটটিতে থাকে ৭৩ শতাংশ দুবাই-ওমানের ‘সাওয়ার’ গ্রেডের (ঘনত্ব বেশি, সালফারের পরিমাণ বেশি) তেল, বাকিটা ইউকে ব্রেন্ট-এর ‘সুইট’ গ্রেডের (ঘনত্ব কম, সালফারের পরিমাণ কম) তেল। গত ২৯ ফেব্রুয়ারি এই তেলের দাম ছিল প্রতি ব্যারেলে ৩১.৮৬ ডলার (২১৮৫.৯৭ টাকা)। আর বুধবার ১৬ মার্চ দাম ছিল প্রতি ব্যারেলে ৩৬.১০ ডলার (২৪৩১.৯৪ টাকা)। অর্থাৎ গত এক পক্ষ কালে অপরিশোধিত তেলের ভারতীয় বাস্কেটটির দাম বেড়েছে ১০ শতাংশের মতো। এই তথ্য প্রেস ইনফরমেশন ব্যুরোর।
অপরিশোধিত তেলের দাম কমলে তার সুবিধা ক্রেতাসাধারণ পায় না কেন ?
এ ব্যাপারে একটা মজার উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে। নভেম্বর ২০০৪। সেটা তো ‘বিতে দিন’। মনমোহন সিংহের আমল। তখন আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ছিল ব্যারেলে ৪০.৫৩ ডলার। ভারতীয় বাজারে পেট্রোলের দাম লিটারে ৩৬.৮১ টাকা। এর পর নভেম্বর ২০১৫। এটা ‘অচ্ছে দিন’-এর যুগ। নরেন্দ্র মোদীর আমল। আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম মোটামুটি একই, ব্যারেলে ৪০.২৭ ডলার। কিন্তু ভারতীয় বাজারে পেট্রোলের দাম লিটারে ৬১.০৬ টাকা। ২৪ টাকা বেশি।
আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দামের সঙ্গে তাল রেখে কেন পেট্রোল- ডিজেলের দাম কমানো হচ্ছে না ?
কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী অরুণ জেটলি বলেছেন, অপরিশোধিত তেলের দাম কমার ফলে যে টাকা বাঁচছে তা দেশের বৃদ্ধির হার বাড়াতে পরিকাঠামো উন্নয়নে, কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করতে এবং তেল কোম্পানিগুলির বিপুল ক্ষতি পূরণে কাজে লাগানো হচ্ছে। অর্থমন্ত্রী জানান, একটা সময়ে রাষ্ট্রায়ত্ত তেল কোম্পানিগুলির ক্ষতির পরিমাণ ৩০ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছেছিল। এই ক্ষতি তো আর আয়কর বা অন্য কোনও কর বাড়িয়ে পোষানো যায় না। তাই স্বভাবতই তেল কোম্পানিগুলো আগে তাদের ক্ষতি পুষিয়ে নেবে।
জেটলি বলেন, তা ছাড়া তেলের উপর ভ্যাট বাড়িয়ে দিয়েছে অনেক রাজ্য। কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে যে টাকা আসছে তা উৎপাদন শুল্ক বা সেসের একটা সামান্য অংশ। এই টাকা তো পরিকাঠামো উন্নয়নে খরচ করা হচ্ছে। পরিকাঠামোর উন্নতি হলে দেশে বৃদ্ধির হার বাড়বে, চাকরির বাজার সৃষ্টি হবে। যাঁরা স্কুটার বা গাড়ি কেনেন তাঁরা তো রাস্তা ব্যবহার করেন। এই টাকা তো রাস্তা তৈরিতেই কাজে লাগানো হচ্ছে। তেলমন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানও মোটামুটি একই যুক্তি দিয়েছেন রাজ্যসভায়।
কিন্তু এ হল অর্ধসত্য।
বার্কলে রিপোর্ট অনুযায়ী, এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় যে সব দেশের অর্থনীতি মোটামুটি শক্তিশালী (সারা পৃথিবীতে তেলের যা চাহিদা তার ৩০ শতাংশ এই দেশগুলির এবং ২০১৫ সালে এই দেশগুলিতে চাহিদা বৃদ্ধির পরিমাণ ৬০ শতাংশ) সে সব দেশ সম্পর্কে পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, যে সব দেশের অর্থনীতি প্রতিযোগিতামূলক সে সব দেশের ক্রেতারা আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ২০১৪ জুন থেকে ৭০ শতাংশ পড়ে যাওয়ার সুবিধা ভোগ করেছেন। জুন ২০১৪ থেকে জানুয়ারি ২০১৬ পর্যন্ত অপরিশোধিত তেলের দাম এবং পাম্পে তেলের দামে যে পরিবর্তন হয়েছে তার ভিত্তিতে বার্কলে রিপোর্টে বলা হয়েছে, ভারত বা চিনের মতো যে সব দেশে তেল কোম্পানিগুলি মোটামুটি রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত, সেখানে ক্রেতারা দাম কমার সুফল পাননি। এর সুবিধা ভোগ করেছেন অস্ট্রেলিয়া, তাইল্যান্ড, তাইওয়ান ও জাপানের মতো দেশের ক্রেতারা। পণ্যমাশুল ও জনপরিবহণে খরচের ক্ষেত্রে ভারতে তেমন কোনও পরিবর্তনই হয়নি।
আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম পড়ার সুফল জনসাধারণ কতটা ভোগ করবেন তা নির্ভর করে সরকারের নীতি, কর ব্যবস্থা, মুদ্রার দামের ওঠাপড়া, অপরিশোধিত তেলের উৎস এবং প্রক্রিয়াগত খরচার (অপারেশনাল কস্ট) উপর। ভারতে রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত তেল কোম্পানিগুলির অত্যধিক প্রশাসনিক খরচ, উপকরণে ক্ষয়ক্ষতি এবং ডলারের সাপেক্ষে টাকার দাম পড়া সামাল দিতে গিয়ে তেলের দাম পড়ার সুফলের অনেকটাই বেরিয়ে যায়।
গোদের ওপর বিষফোঁড়া। মাঝেমাঝেই বাড়ানো হয় উৎপাদন শুল্ক। ফলে রেহাই মেলে না সাধারণ মানুষের।

বিজ্ঞাপন
loading...

মতামত দিন

Please enter your comment!
Please enter your name here