পরিবেশকেন্দ্রিক নীতির অভাবেই পাড় ভাঙছে সাগরদ্বীপে, বাড়ছে পরিবেশ-উদ্বাস্তু

0
121

river-erosion3সদ্য চলে গেল ইন্টারন্যাশনাল কোস্টাল ক্লিন আপ ডে। প্রাসঙ্গিকতা মেনে তাই আমাদের পাড়ি গঙ্গা এবং সাগরের মিলনবিন্দুর উদ্দেশে। সাগরদ্বীপ। এখানে গেলেই দেখা পাওয়া যায় মিনি ইন্ডিয়ার। যে কোনোদিন হারউড পয়েন্ট থেকে ভেসেলে চড়ুন, মুড়িগঙ্গা পেরিয়ে সাগরদ্বীপ যাওয়ার জন্য, দেখা হয়ে যাবে ভারতের নানা প্রান্তের মানুষের সঙ্গে। পুণ্য তিথি থাকলে তো কথাই নেই, দলে দলে মানুষ দূরদূরান্ত পেরিয়ে এসেছেন গঙ্গামাইয়ার বুকে ডুবকি লাগিয়ে পাপ ধুয়ে ফেলতে। দীনহীন তীর্থযাত্রীরা আসেন এ জন্মের বৈতরণী পার করে সব পেয়েছির স্বর্গে পৌঁছোনোর টানে। আবার হেলিকপ্টারে চড়ে আসছেন শহুরে উচ্চবিত্তরা। আর ট্যুরিস্ট যদি বাঙালি, মধ্যবিত্ত, জ্ঞানপিপাসু টাইপ হন, অনেক সময় এলাকার স্থানীয় মানুষকে মন্দিরের ইতিহাস-ভূগোল নিয়ে প্রশ্নে প্রশ্নে জেরবার করেন। এটা কত নম্বর মন্দির ভাই ? মন্দির তো বারবার জলের তলা থেকে জেগে ওঠে তাই না? আচ্ছা শুনেছি মন্দির অনেকবার বদলেছে কিন্তু বিগ্রহ একই থেকে গেছে? সাগরের নবীন প্রজন্ম এ সবের সদুত্তর দিতে পারে না। খুব একটা আগ্রহ আছে বলে মনেও হয় না। ‘আচ্ছা ভাই আমার দিদা এসেছিলেন নৌকা করে, তারপর পায়ে হেঁটে। মন্দিরটা নাকি তখন জলের তলায় অর্ধেক ভেসে ছিল? ফের উঠে এসেছে?’  আসলে এসব মিথ – লোকমুখে প্রচারিত। সমুদ্র এগিয়ে এসেছে উপকূলের দিকে, তটবর্তী মন্দির নতুন জায়গায় তৈরি হয়েছে প্রয়োজনমতো। তবে হ্যাঁ, সাগর ব্লকের অর্ন্তগত ঘোড়ামারা দ্বীপ ডুবে যাচ্ছে, এই সতর্কতা অনেকদিন দিয়ে রেখেছেন পরিবেশবিদরা। ঘোড়ামারা ছেড়ে সাগরদ্বীপে আশ্রয় নিয়েছেন অনেক বাস্তুহারা মানুষ। এখানে এসে দেখা গেল সাগরদ্বীপ ভূখণ্ডের পশ্চিম এবং পূর্ব দু পাড়েই ভাঙন বেশ নিয়মিত ঘটনা। বেগুয়াখালি গ্রামের উপকূল সীমাবর্তী অঞ্চল থেকে দূরে তাকালে দেখা যাবে, জলের মধ্যে পুরোনো লাইটহাউসের ভগ্নাবশেষ। গ্রামের মানুষ জানালেন, বার বার বাঁধ ভেঙে ঘরবাড়ি নদীগর্ভে তলিয়ে যায়, তাঁরা দূরে গিয়ে ঘর বাঁধেন পরবর্তী ভাঙনের অপেক্ষায়। সরকারি সাহায্য মেলে।

গঙ্গা এবং সাগরের যে মিলনবিন্দুর খোঁজে ভূখণ্ডের দক্ষিণ প্রান্তে এসে দাঁড়ান লাখো মানুষ, সেই বিশ্বাসের পূণ্যভূম নিজেই বিপন্ন। প্রকৃতির মন-মর্জি বুঝে না চললে, তাঁর কোপে যে পড়তেই হয় সে কথা আর কে না জানে? রবীন্দ্রনাথ মনে করিয়ে দিয়েছিলেন ‘দেবতার গ্রাস’ থেকে রক্ষা পেতে মানুষের অন্ধ বিশ্বাসের কথা। সাগরের জলে মাসি বলি ফুকারিয়া মিলাল যে বালক তাঁর বিপর্যয়ের কথা ভেবে কত বার তো শিউরে উঠেছেন পাঠক। দিন পাল্টেছে, প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের বেঁচে থাকার সংগ্রাম আরও গভীর হয়েছে। পৃথিবী গ্রহের প্রাণ বাঁচাতে হলে তাঁর পরিবেশের চাহিদাগুলি যে আরও গভীরে গিয়ে বুঝতে হবে তার পাঠ-ও মানুষ পেয়েছে প্রকৃতির কাছেই। সুন্দরবনের দ্বীপপুঞ্জ যে আবহাওয়া পরিবর্তনের কারণে বিপন্ন তা এখন আর অজানা নয়। গঙ্গাসাগরের পরিণতিও কি হতে পারে ঘোড়ামারার মতো? বিপর্যয়ের কারণ, পরিমাণ এবং সমাধানসূত্রগুলি বুঝতেই কথা হল যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সমুদ্রবিজ্ঞান বিভাগের যুগ্ম অধিকর্তা অধ্যাপক ড.তুহিন ঘোষের সঙ্গে।

খবর অনলাইন: সাগরদ্বীপ  অঞ্চলে যে ভাঙন দেখা যাচ্ছে তা কি আবহাওয়া পরিবর্তন এবং সমুদ্রের জলতল বৃদ্ধির কারণেই ঘটছে?

তুহিন ঘোষ: ভাঙা এবং গড়া মোহনা অঞ্চলের চিরায়ত ধর্ম। সেই ধর্ম মেনেই এখানেও ভাঙন হচ্ছে। এক্ষেত্রে বাঁধের দুর্বলতাকেও কিছুটা দায়ী করা যেতে পারে। সমুদ্রের জলতল বৃদ্ধির ভূমিকা এক্ষেত্রে কতটা তা বলার মতো নির্দিষ্ট তথ্য এখনও আমাদের হাতে নেই। এর জন্য দীর্ঘ  গবেষণালব্ধ তথ্যের প্রয়োজন। নদীর গতি-প্রকৃতি সম্পর্কে বিজ্ঞানভিত্তিক গবেষণাও (হাইড্রো-ডাইনামিক স্টাডি) ভাঙন রোধের জন্য জরুরি।

খবর অনলাইন:  সাগরদ্বীপ-ও কি ঘোড়ামারার মতো ডুবে যেতে পারে?

তুহিন ঘোষ: ঘোড়ামারা ডোবার পূর্বাভাস আমরা দিয়েছিলাম ১৯৯৭ সালে। ২০০২ সালে একটি রিপোর্টে আমরা বলেছিলাম ঘোড়ামারা বাঁচাতে বায়ো-ইঞ্জিনিয়ারিং প্রযুক্তি ব্যবহার করা প্রয়োজন। সে সময় সরকারি স্তরে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। ব্যবস্থা নেওয়া শুরু হল ২০০৬ সাল নাগাদ, তখন বেশ কিছুটা দেরি হয়ে গেছে। এখানে একটি টেকটনিক টিল্ট থাকার কারণে নদী পূর্বদিকে সরে আসছে। সেক্ষেত্রে ১৫-২০ বছরের মধ্যে মুড়িগঙ্গার দিকটা হুগলি নদীর বেশি শক্তিশালী শাখায় পরিণত হবে। ঘোড়ামারা এবং সাগর, সাগরদ্বীপ ভূখণ্ডের উত্তরভাগের দিক থেকে এক সঙ্গে জুড়ে যাবে বলে আমাদের ধারণা। এরপর পরিস্থিতি স্থিতিশীল হয়ে যাবে বলেই মনে করছি। পরিবেশবিজ্ঞানভিত্তিক নীতি নির্ধারণ ম্যানমেড বিপর্যয় রোধ করতে পারে।

খবর অনলাইন: এ ক্ষেত্রে কোনো ম্যানমেড বিপর্যয় ঘটেছে কি?

তুহিন ঘোষ: সমস্যার সূত্রপাত সাতের দশকের শেষের দিকে। হলদিয়া বন্দর বাঁচাতে, তাঁর নাব্যতা বাড়ানোর জন্য একটি ডাচ সংস্থার পরামর্শ নেওয়া হয়। তাঁরা যে পরিকল্পনা দেন তাতে ৮-৯টি ডাইক বসানোর কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু কলকাতা পোর্ট ট্রাস্ট ২টি ডাইক বসায় এবং বাকিগুলি বসায় না। এর ফলে এই অঞ্চলের নদীর গতিপ্রকৃতির বদল হয়, নদীর মোহনায় অবস্থিত দ্বীপগুলি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এছাড়া হাইড্রো-ডাইনামিক স্টাডির জন্য নদীতে কাজ করার অনুমতিও কলকাতা পোর্ট ট্রাস্টের কাছে পাওয়া যায় না।

tuhin-ghosh
অধ্যাপক ড. তুহিন ঘোষ

খবর অনলাইন: এই অঞ্চলকে পরিবেশ-বিপর্যয় থেকে রক্ষা করতে কী ধরনের নীতি নির্ধারণ করা প্রয়োজন?

তুহিন ঘোষ: গবেষণার পরিকাঠামো উন্নতি, গবেষণালব্ধ বৈজ্ঞানিক সিদ্ধান্তকে কেন্দ্রে রেখে নীতি নির্ধারণ প্রয়োজন। বর্তমান সরকারের সঙ্গে এ নিয়ে আমাদের আলোচনা চলছে। বিভিন্ন দফতরের মধ্যে সমন্বয়ের ক্ষেত্রেও সদর্থক মনোভাব দেখা যাচ্ছে। সবাই মিলে, অর্থাৎ পরিবেশবিদ-প্রযুক্তিবিদ-সমাজবিজ্ঞানী এক সঙ্গে কাজ করলে এখানকার পরিবেশ এবং মানুষদের রক্ষা করা সম্ভব।

খবর অনলাইন: সুন্দরবন মোহনায় অবস্থিত দ্বীপপুঞ্জ ঘন জনবসতি পূর্ণ। এর আগে ঘোড়ামারার ক্ষেত্রে বহু মানুষ জমিজায়গা ছেড়ে চলে এসেছেন। ক্ষতিপূরণ বিষয়ে কি কোনো সামগ্রিক সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব?

তুহিন ঘোষ: ২০১৫ সালে আমরা ঘোড়ামারার উদ্বাস্তু সমস্যা নিয়ে রিপোর্ট দিয়েছি। আবহাওয়া পরিবর্তনের কারণে উদ্বাস্তু মানুষদের চিহ্ণিতকরণ, ক্ষতিপূরণ, পুর্নবাসন নিয়ে নীতি নির্ধারণ প্রয়োজন। কারা পরিবেশ-উদ্বাস্তু সে বিষয়েও সিদ্ধান্ত নিতে হবে। পরিবেশ-গবেষণার পরিধি এবং পরিকাঠামো এ কারণেই বাড়ানো প্রয়োজন। এ বিষয়ে নির্দিষ্ট রূপরেখা তৈরির বিষয়ে পশ্চিমবঙ্গ সরকার বর্তমানে আগ্রহী। আশা করি আগামী প্রজন্ম গবেষণার আরও সুযোগ পাবে।

সব তীর্থ বার বার, গঙ্গাসাগর একবার। এই প্রবাদের জন্ম নিশ্চয় হয়েছিল নদী ও সাগরের সঙ্গমস্থলের ঝঞ্ঝাপূর্ণ খামখেয়ালি আবহাওয়ার কারণে। তবু প্রকৃতিকে জয় করার দুর্বার আকাঙ্ক্ষা নিয়েই মানুষের এই ‘ছাকনি চড়ে সাগর’ পাড়ি দেওয়ার ঝোঁক। নির্মম প্রকৃতির রোষ থেকে বাঁচতে অন্ধ বিশ্বাস আঁকড়ে ধরে শিশুকে বলিদান দেওয়ার মরিয়া চেষ্টার কথা আগেই এসেছে রবি ঠাকুরের ‘দেবতার গ্রাস’ প্রসঙ্গে। আর পরিবেশবিদ তুহিন ঘোষের সঙ্গে আলোচনা মনে করিয়ে দিল, আমরা এখনও পরিবেশকে কেন্দ্রে রেখে নীতি নির্ধারণের জন্য সম্পূর্ণভাবে তৈরি নই। তুহিনবাবু আশাবাদী, পরবর্তী প্রজন্ম গবেষণার আরও বেশি সুযোগ পাবে এবং গবেষণার ব্যবহারিক প্রয়োগভিত্তিক নীতি পৃথিবীকে দীর্ঘজীবী করবে।

বিজ্ঞাপন
loading...

মতামত দিন

Please enter your comment!
Please enter your name here