রবিবারের পড়া ২ / সাহিত্যের ভাবনা-ভাষা চুরি

0
82
cartoon-on-plagiarism
তপন মল্লিক চৌধুরী

‘প্ল্যাজিয়ারিয়াস’ একটি লাতিন শব্দ যার অর্থ হচ্ছে সাহিত্যভাবনা চুরি বা অনুকরণ। রোমান কবি মার্শাল এক সময় অভিযোগ তুলেছিলেন যে, তাঁর একটি কবিতা চুরি করেছেন অন্য এক কবি। আর সেই থেকেই সাহিত্যে অন্য লেখকের ভাব বা রচনা চুরিকে প্ল্যাজিয়ারিজম বলা শুরু। এই ঘটনাটি খ্রিস্টপূর্ব প্রথম শতাব্দীর। এর পর ১৬০১ সালে শব্দটিকে ইংরেজি সাহিত্যে পরিচয় করিয়ে দেন নাট্যকার বেন জনসন। তাঁর মতে, কোনো কবি-ঔপন্যাসিক বা নাট্যকারের সাহিত্যভাব বা রচনা চুরি হওয়া মানে প্ল্যাজিয়ারিজম। যদিও সাহিত্যে প্রায় অষ্টাদশ শতাব্দী পর্যন্ত অনেক লেখকই অন্যের ভাবভাষা, এমনকি কোনো কোনো ক্ষেত্রে পুরো সাহিত্যধারণা নকল করে লেখার পরও তেমন করে নিন্দিত হননি। উনিশ শতক পর্যন্ত ধারণা ছিল যে, সাহিত্য কোনো লেখকের ব্যক্তিগত বিষয় নয়। লেখক সাহিত্য রচনা করলেও সেটি সর্বজনীন আর সেই কারণেই লেখকদের মধ্যে একে অপরের ধারণা বা ভাষার অনুকরণ দোষের বলে মনে হত না। বরং পূর্বে রচিত সাহিত্যকর্মের প্রতি আনুগত্যকে শ্রেষ্ঠ সাহিত্যকর্ম হিসেবে বিবেচনা করা হত। মাইকেল মদুসূদন দত্ত মেঘনাদবধ কাব্য রচনা করার পর মূল রামায়ণ-এর প্রতি অনুগত না থাকায় রাবণের প্রতি তার মমত্ববোধ নিয়ে পক্ষপাতের অভিযোগ তুলেছিলেন অনেক সমালোচক। সাহিত্যে অন্য লেখকের ভাবনা চুরি করা অনৈতিক কিংবা লেখক অসৎ হিসেবে বিবেচিত হওয়া শুরু বিংশ শতাব্দীতে।  

লেখালেখির ক্ষেত্রে ভাবনা চুরির প্রতিরোধে আজও কোনো আইন তৈরি হয়নি। বলা দরকার কপিরাইট আইনকে সাহিত্যে ভাবনা-চুরি প্রতিরোধক হিসেবে মনে করাটা ভুল হবে। কারণ, কপিরাইট আইন হচ্ছে, কারও বই অথবা নিবন্ধের হুবহু নকল সংক্রান্ত, কিন্তু প্ল্যাজিয়ারিজম হচ্ছে অন্যের সাহিত্যভাবনার অংশবিশেষ চুরি বা অংশবিশেষের প্রভাব, একেবারে হুবহু নকল নয়। শিল্প বা সাহিত্যে তো কেবল সর্বোচ্চ সৃজনশীলতা নয়, তার স্বাতন্ত্র্যতাও বিবেচ্য। সেই কারণে বহু কবি, গল্পকার, ঔপন্যাসিকের লেখা চিন্তার দৈন্যতায় অভিহিত হয়। কারো সাহিত্যকর্মের বিরুদ্ধে ওঠে নকল বা চুরির অভিযোগ। তবে প্রভাবিত হয়ে বা অনিচ্ছাকৃত ভাবে অন্যের ভাবনা অনুকরণ এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে পুরো ভাবনা, ভাষা বা ঘটনাপ্রবাহের হুবহু চুরির ঘটনা বহু কাল ধরেই চলছে।

helen keller
হেলেন কেলার

এই প্রসঙ্গে প্রথমেই বলা যায় একাদশ শতকে লেখা ইরাকের লেখক আল খাতিব আল বাগদাদিদ-এর জীবজন্তুদের নিয়ে লেখা বই ‘আলজাহিদ’-এর কথা, যেটি কি-না অ্যারিস্টটলের ‘কিতাব আল হাইওয়ান’-এর অনুকরণে লেখা বলে অভিযোগ। এর পরও বেশ কয়েকটি ঘটনার উল্লেখ করা যায়। ১৮৭২ সালে আমেরিকার তরুণ লেখিকা হেলেন কেলারের বিরুদ্ধে লেখা চুরির অভিযোগ আনেন গল্পকার মার্গারেট টি ক্যানবি। তিনি বলেন, হেলেন কেলারের দ্য ফ্রস্ট কিংগল্পটি তার দ্য ফ্রস্ট ফেয়ারিজগল্পের হুবহু অনুকরণ। পরবর্তীতে পারকিন্স ইনস্টিটিউট ফর দ্য ব্লাইন্ড আদালতে হেলেন কেলার স্বীকার করেন যে, তিনি মার্গারেটের গল্পটি পড়েছিলেন। ফলে তাঁর গল্পে কিছুটা প্রভাব থাকলেও থাকতে পারে।

বিজ্ঞাপন

এ বার যে ঘটনার কথায় যেতে হয় সেটি আইন-আদালতের পরেও অমীমাংসিত থেকে গেছে। কিন্তু যার বিরুদ্ধে লেখা চুরির অভিযোগ আদালত পর্যন্ত গড়িয়েছিল তিনি বিশ্বখ্যাত চলচ্চিত্র পরিচালক। আলফ্রেড হিচককের ‘১৯৪০: রেবেকাউপন্যাসটির বিরুদ্ধে চুরির অভিযোগ এনেছিলেন লেখক এডউইন ম্যাকডোনাল্ড। তিনি আদালতে অভিযোগ করেছিলেন, হিচককের ‘১৯৪০: রেবেকা’ তাঁর ব্লাইন্ড উইডোউপন্যাসের ধারণা থেকে নেওয়া। যদিও বিচারকরা দু’টি উপন্যাসের ভেতর কোনো মিল খুঁজে পাননি। অস্কার ওয়াইল্ডের ‘দ্য পিকচার অফ ডোরিয়ান গ্রে’-র ভাবনা পুরোপুরি লেখক জে কে হুইসম্যানের ‘এ রিবোর্স’ থেকে নেওয়া। অস্কার ওয়াইল্ড অবশ্য ওই অভিযোগ প্রাথমিক ভাবে স্বীকার করে নিয়েছিলেন। কবি টি এস এলিয়টের বিরুদ্ধেও অভিযোগ ছিল যে তিনি নাকি ইংল্যান্ডের অখ্যাত কবি ম্যাডিসন কেইনের কবিতা হুবহু নকল করেছিলেন। লেখক ইয়ান ফ্লেমিং (১৯০৮-১৯৬৮)-এর সেক্স, স্যাডিজম অ্যান্ড স্নোবারিবইটির বিরুদ্ধে ভাবনা চুরির অভিযোগ এনেছিলেন লেখক কেভিন ম্যাকগ্লোরি। ম্যাকগ্লোরি আদালতে জানান, ‘সেক্স, স্যাডিজম অ্যান্ড স্নোবারিবইটি লিখেছিলেন ইয়ান ফ্লেমিং, তিনি নিজে এবং লেখক জ্যাক হুইটিংহাম মিলে। কিন্তু ইয়ান ফ্লেমিং অন্যদের নাম বাদ দিয়ে নিজের নামেই বইটি প্রকাশ করেন। অভিযোগ সত্যি প্রমাণিত হওয়ায় আদালত সেক্স, স্যাডিজম এবং স্নোবারিবইয়ের প্রকাশককে পঁয়ত্রিশ হাজার পাউন্ড ক্ষতিপূরণের নির্দেশ দেন।

da vinci code and dan brown
দা ভিঞ্চি কোড, ড্যান ব্রাউন

বিখ্যাত লেখক ড্যান ব্রাউনের দ্য ভিঞ্চি কোডবইটির বিরুদ্ধেও ভাবনা চুরির অভিযোগে দুবার মামলা হয়েছে। ড্যান ব্রাউনের বিরুদ্ধে প্রথম অভিযোগ আনেন লেখক মিখাইল বাইগনেট। তিনি দ্য ভিঞ্চি কোডবইটিকে তার দ্য হলি ব্লাড অ্যান্ড দ্য হলি গ্রেইলবইয়ের অনুকরণ বলে অভিযোগ করেন। দ্বিতীয় অভিযোগটি আনেন লেখক লুইস পারডু। তিনি দ্য ভিঞ্চি কোডবইটির ধারণা তার দ্য ভিঞ্চি লিগাসি’ (১৯৮৩) থেকে নেওয়া বলে অভিযোগ আনেন। তবে দু’টি মামলাই বিচারকরা খারিজ করে দেন অভিযোগ নির্ভরযোগ্য নয় বলে। ১৯৯৯ সালে লেখিকা জে কে রাঊলিং-এর হ্যারি পটারউপন্যাসের বিরুদ্ধে তথ্য চুরির অভিযোগ আনেন ন্যান্সি স্টোগার নামে এক লেখিকা। তাঁর অভিযোগও যথার্থ নয় বলে মামলা খারিজ করে দেওয়া হয়।

kaavya vishwanathan
কাব্য বিশ্বনাথন।

অনাবাসী ভারতীয় কাব্য বিশ্বনাথনের লেখা প্রথম উপন্যাস হাউ অপাল মেহতা গট কিসডউপন্যাসটির বিরুদ্ধে সলমন রুশদি-সহ অন্য লেখকের পাঁচটি উপন্যাসের বিভিন্ন অনুচ্ছেদ সরাসরি চুরির অভিযোগ তোলা হয়। অভিযোগ সত্যি হওয়ায় শেষ পর্যন্ত ওই লেখিকা বাজার থেকে সব বই প্রত্যাহার করে নিতে বাধ্য হন। আমেরিকান ঔপন্যাসিক আলেক্স হালে ১৯৭৭ সালে আরেক আমেরিকান ঔপন্যাসিক হ্যারল্ড কুরল্যান্ডারের বিরুদ্ধে নিউইয়র্কের আদালতে লেখা চুরির অভিযোগ করেন। মামলায় তিনি উল্লেখ করেন, হ্যারল্ড কুরল্যান্ডারেরের দ্য আফ্রিকানউপন্যাসটির প্রায় ৮০ পৃষ্ঠা আলেক্স হালের উপন্যাস রুটসথেকে টোকা। মামলা বিচারাধীন অবস্থায় কুরল্যান্ডারের আলেক্স হালের সঙ্গে সাড়ে ছয় লাখ ডলারের বিনিময়ে আপস করেছিলেন।

২০১১ সালে আমেরিকার লেখক কোয়েন্টিন রায়ানের প্রথম উপন্যাস অ্যাসাসিন অব সিক্রেটসপ্রকাশিত হলে একই সঙ্গে ১১ জন লেখক তাঁর বিরুদ্ধে নকলের অভিযোগ আনেন। ঘটনা সত্যি হওয়ায় দুঃখ প্রকাশ করে তিনি সঙ্গে সঙ্গে সব বই বাজার থেকে প্রত্যাহার করে নেন। ১৯৯৭ সালে আমেরিকার বেস্ট সেলার লেখিকা জ্যানেট ডাইলে স্বীকার করে নেন যে, তার নাইনটি থ্রি বডিস রিপারউপন্যাসটি, যেটি বিক্রি হয়েছিল প্রায় দু’শো মিলিয়ন কপি, সেই উপন্যাসটির অনেক অংশ ঔপন্যাসিক নোরা রবার্টসের উপন্যাস থেকে চুরি করা। অপরাধ স্বীকারের সময় তিনি বলেন, “লেখালেখিতে ক্রমাগত অপরের ভাবনা নকল বা অনুসরণ করা আমার জন্য মনস্তাত্ত্বিক এক বড় সমস্যা হয়ে দেখা দিয়েছে। নোরা রবার্টসের যে সব ধারণা বা অংশের নকল আমি করেছি, তা করার ইচ্ছে আমার কোনো সময়ই ছিল না। এ সমস্যা নিয়ে আমি বর্তমানে মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞের শরণাপন্ন হয়েছি। ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা আর ঘটবে না, এ আশ্বাস দিতে পারি আমার পাঠকদের।”

বিজ্ঞাপন
loading...

মতামত দিন

Please enter your comment!
Please enter your name here