রবিবারের পড়া ২ / কিনি কিনি মন, শোনে না বারণ

0
cartoon on shopping mall
মধুমন্তী চট্টোপাধ্যায়

সাত সকালে বেজে উঠবে মুঠো ফোনটা। মোবাইল স্ক্রিনে জ্বলবে নিভবে কয়েকটা শব্দ – ‘মেগা সেল’। ঠিক এই ভাবে অ্যালার্ম সেট করে উঠে পড়ল ঋতিকা। কাল ছুটির দিন নয়, কিন্তু অফিস ডুব মারার প্ল্যান সেরে রেখেছে আগে থেকেই। সকাল ৯টা ৩৫ নাগাদ বসকে একটা ফোন করে বলতে হবে জ্বর এসেছে, টেম্পারেচার তিন ছুঁই ছুঁই।

এমনিতে শুক্রবার ছুটি নেওয়ার কথা ভাবতেই পারে না ঋতিকা। সামনে দু’দিনের লম্বা ছুটি আসছে ভেবে মনে একটা হালকা খুশি খুশি ভাব নিয়ে কোথা দিয়ে কেটে যায় দিনটা। কিন্তু কাল ছুটি না নিয়ে উপায় নেই। রাজারহাটের এক শপিং মলে কাল দিনভর সেল দেবে, দিন পনেরো আগে থেকে মেসেজ আসছিল ঋতিকার ফোনে। দারুণ অফার – ৮০০০ টাকার কেনাকাটা করলে ৪০০০ টাকার শপিং ফ্রি! এমন সুযোগ হাতছাড়া করা যায়! গত কাল রাতে বাড়ি ফিরে লিস্ট করে ফেলেছে। জামা জুতো ব্যাগ তো আছেই, তার সাথে খান চারেক পাপোশ, এক ডজন চটের ব্যাগ, মশা মারার লিকুইড, কোলবালিশের খোল, কাপড় শুকোনোর দড়ি, ক্লিপ, রান্নাঘরের ন্যাকড়া সব মিলিয়ে আট হাজার হবে না? না হলে সামাল দেওয়ার জন্য বাড়তি কিছু কসমেটিক্স কিনবে না হয়।

গেল বার যদিও মহা মুশকিলে পড়েছিল। ৫০০০ টাকার কেনাকাটায় সাত কিলো চিনি ফ্রি দিচ্ছিল সে বার। এ দিকে সাড়ে তিন ঘণ্টা ধরে তিন তলা মল ছুটোছুটি করে ঋতিকার বিল হয়েছিল ৪৮৭৫ টাকা। শেষে মনের মতো কিছু না পেয়ে ১৩০ টাকা দিয়ে পিঠ চুলকে দেওয়ার একটা ইয়া লম্বা হাত কিনে এনেছিল শ্বশুরের জন্য। বাজে প্লাস্টিক থেকে পিঠে অ্যালার্জি হয়ে স্কিন স্পেশালিস্টকে ১২০০ টাকা ফিজ দিতে হয়েছিল শেষমেশ।

বিজ্ঞাপন

আর চিনি? অফিস কলিগের দিদা হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে শুনে রবিবার দুপুর দুপুর বর সমেত হাসপাতাল পৌঁছে গেল ঋতিকা। ব্যাগে আড়াই কিলো চিনি। প্রিয়ম ভয়ানক আপত্তি করেছিল সে দিন। কে কার কথা শোনে। দিদার মেজো মেয়ের হাতে চিনির থলে ধরিয়ে ঋতু বলল, “বয়স্ক মানুষ, দোকানের মিষ্টির চেয়ে ঘরে বানানো মিষ্টিই উনি নিশ্চয়ই বেশি পছন্দ করবেন…তাই মিষ্টি না এনে এটা আনলাম, নিজে বানিয়ে আনার আর সময় হল না মাসি”… কথায় কথায় সে দিন ঋতিকার সহকর্মীটির কাছ থেকে প্রিয়ম জেনেছিল, ওদের পুরো পরিবার ডায়াবেটিক।

যা হোক, এ বার আর ওই ভুল করছে না ঋতিকা। শেষ মুহূর্তে মেক আপ দেওয়ার জন্য ব্যাক-আপ প্ল্যান তৈরি। বিলে আট হাজারের কম হলে মা, শাশুড়ি আর সেজো মাসির জন্য ১০/১২ পাতা সেফটিপিন আর কয়েক বাক্স ন্যাপথালিন কিনে নেবে। বড়ো বড়ো শপিং মলে আবার আজকাল একটা ব্যাপার চালু হয়েছে। প্রতি পণ্যে কত লাভ করছে ক্রেতা, তা-ও উল্লেখ থাকে বিলে। কেনাকাটা সেরে ফেরার পথে সেই হিসেব করতে করতে কেমন একটা ‘ফিল গুড’ ফ্যাক্টর কাজ করে ঋতিকার মনে। প্রিয়ম এ সব বুঝলই না কোনো দিন। খালি বন্ধুদের কাছে বলে, বউ-এর নাকি কেনা কেনা বাতিক।

আচ্ছা, সব কেনাকাটা কি নিজের কথা ভেবে? সে বার যে ঘড়ির দোকানে চারটের দামে ৬টা দেওয়াল ঘড়ি কিনল, কার জন্য? ২ কামড়ার ফ্ল্যাটে তিনটে ঘড়িই তো যথেষ্ট ছিল। বাথরুমে গিজারের পাশে ঘড়ি টাঙানোর আয়োজন তো প্রিয়মের কথা ভেবেই। অফিসে বেরোনোর আগে রোজ স্নানঘর থেকে সময় জানতে চেয়ে হাঁকাহাঁকি করত কে? মিস্ত্রি ডেকে ঘড়ির জন্য হুক লাগানোর ব্যবস্থাও তো  ঋতিকাই করল। এক ডজনের সঙ্গে আধ ডজন বাড়তি হুকের অফারটাও ওরই চোখে পড়েছিল প্রথম। তা না হলে বসার ঘরের পশ্চিমের দেওয়াল জুড়ে সার সার দিয়ে, গণেশ, গুয়েভারা আর পাবলো পিকাসোর মাস্টার পিসটা শোভা পেত, এখন যেমন পায়? আর চে-র ছবিটা বইমেলা থেকে ডিসকাউন্টে কিনেছিল কে?

বাকি দু’টো ঘড়ি দেড় বছর ধরে  মোড়কসমেত তোলা আছে যত্নে। সামনের বছর প্রিয়াঙ্কারা শিফট করছে ওদের নতুন ফ্ল্যাটে। গৃহপ্রবেশে দেওয়ার জন্য ঘড়ি বেশ ভাল উপহার না? নতুন ফ্ল্যাট বুক করেছে জেনেই ছক কষে ফেলেছিল ঋতিকা। প্রিয়ম এ সব পারবে? দিনরাত শেয়ার মার্কেটের ওঠা নামা ছাড়া আর কোনো দিকে মন আছে ছেলের? এক সময় উঠে পড়ে লেগেছিল। কী? না, ফ্ল্যাট কিনবে। উত্তর কলকাতায় কোন এক নামী দামি রিয়াল এস্টেট কোম্পানি সস্তায় ফ্ল্যাট দিচ্ছে। ২টো কিনলে একটা ফ্রি! ঋতিকা তো শুনে পুরো থ! পুজোর আগ দিয়ে লেগ ইন্স-এ এমন অফার দেয় শুনেছে। শুধু শুনেছে বললে মিথ্যে বলা হবে, কিনেওছে দেদার। সে দিন আলমারি গোছাতে গিয়ে সব মিলিয়ে ১৯ খানা লেগ ইন্স উদ্ধার হয়েছে। কিন্তু ফ্ল্যাটে এমন অফার! “বাড়িতে তো চারটে মাত্র মানুষ, আর অ্যাকোয়ারিয়ামে খান পাঁচেক গোল্ড ফিশ। তিন তিনটে ফ্ল্যাট নিয়ে হবেটা কী?’’ মুচকি হেসে বউ-এর গাল টিপে প্রিয়ম বলেছিল ‘ইনভেস্টমেন্ট, ডার্লিং!’

ঋতিকা ইনভেস্টমেন্ট বোঝে না, শপিং মলে ডিসকাউন্ট দিলে কিনে ফেলে এই ভেবে, ‘পরে এ সব দ্বিগুণ দামে কেনার চেয়ে এখন কিনে রাখাই তো ভালো, সাশ্রয় হবে’। বাবা যদিও অন্য যুক্তি দেয়, “সস্তা হবে ভেবে এই যে হুমড়ি খেয়ে জিনিস কিনছিস, এর মধ্যে সত্যি ক’টা জিনিস তোর কাজে লাগছে বল তো? পাঁচটার দামে আটটা কোল্ড ড্রিঙ্কসের বোতল কিনে এত মজা পাচ্ছিস কেন?” গায়ে জ্বালা ধরানো সুরে বাবা বলে, “বীভৎস মজা”। ধুর! বাবাও বুঝবে না কিছু।

এই যে প্রতিযোগিতার বাজারে, এত এত ফ্রি ডেটা দিচ্ছে টেলিকম সংস্থাগুলো, বাবা কিছুতেই প্ল্যান বদলাবে না। ঋতিকা দিন পনেরো অন্তর পালটে নিচ্ছে প্রোমো অফার। আপ টু ডেট থাকতে হবে না? এ বারের অফারে দিনে ১০০টা মেসেজ ফ্রি দিচ্ছে। প্রিয়মকেও একই অফার নিতে হয়েছে সপ্তাহ খানেক আগে। ঘুমোনোর আগ অবধি রোজকার কাজের কথা, এমনকি ঝগড়া, মন কষাকষি আবার মানভঞ্জন সবই চলছে মেসেজে। রাতে শোয়ার আগে অনলাইন শপিং-এর ডিসকাউন্ট রেট খুঁটিয়ে দেখছিল ঋতিকা। মোবাইলে সময়টা দেখতেই খেয়াল হল, ১১টা বেজে গেছে, প্রিয়ম ফেরেনি এখনও। ইনবক্সে ১৩টা নতুন মেসেজ। শেষ মেসেজটা খুলতেই… ‘চল্লিশ মিনিট ধরে বাইরে দাঁড়িয়ে, বেল বাজছে না কেন?’ দরজার দিকে ছুটতে ছুটতে মনে পড়ে গেল ঋতিকার, প্রিয়মের টেক্সট করতে অনীহা ছিল, আশিটার কাছাকাছি এসে থেমে যাচ্ছিল কনভারসেশন। খান কুড়ি মেসেজ খরচা হবে বলে নিজেই ডোর বেলের কানেকশন বন্ধ করে দিয়েছে বিকেলবেলা।

বিজ্ঞাপন
loading...

মতামত দিন

Please enter your comment!
Please enter your name here