অম্বি নদীর তীরে পানশেট

1
261

পানশেট ড্যাম। পিছনেই পাহাড়ের সারি। 

wrivuশ্রয়ণ সেন

জায়গাটার নাম পানশেট। ভারত কেন, পুনে আর কিছুটা মুম্বইয়ের বাইরে গোটা মহারাষ্ট্রের কাছে এই জায়গাটার বিশেষ কোনো পরিচিতি নেই। অথচ নীরবে, নিভৃতে, নিরিবিলিতে কয়েক রাত কাটানোর জন্য পানশেটের জুড়ি মেলা ভার।

১৯৬১ সালে একটি কুখ্যাত ঘটনার জন্য গোটা ভারতের কাছেই পরিচিত হয়ে গিয়েছিল পানশেট। অম্বি নদীর ওপর সেই বছরই তৈরি হয় এখানকার বাঁধটি। যেটি পানশেট ড্যাম হিসেবে পরিচিত। মাত্রাতিরিক্ত বৃষ্টি আর সঠিক পর্যবেক্ষণের অভাবে ভেঙে যায় এই ড্যাম। ভেসে যায় গোটা পুনে শহর। মৃত্যু হয় প্রায় হাজার জনের। আজ সে সব অতীত। গ্লোবাল ওয়ার্মিং-এর গ্রাসে বৃষ্টিও কমে গিয়েছে অনেক। কিন্তু পুনের কাছে এর গুরুত্ব অপরিসীম। ইদানীং গ্রীষ্মকালে জলকষ্ট গোটা মহারাষ্ট্রের কাছেই পরিচিত ছবি। গ্রীষ্মকালে পুনেতে পানীয় জল সরবরাহের জন্য বিশেষ ভূমিকা পালন করে এই ড্যাম।

ছুটে চলেছি যশবন্তরাও চহ্বন এক্সপ্রেসওয়ে দিয়ে। যার আদরের নাম মুম্বই-পুনে এক্সপ্রেসওয়ে। সাত বছর আগে এই রাস্তার সঙ্গে প্রথম পরিচয় হয়েছিল। তার পর অবশ্য বার পাঁচেক আসা যাওয়া হয়েছে। কিন্তু যখনই যাই, এক নতুন রোমাঞ্চ অপেক্ষা করে থাকে। পাহাড়ের গাঁ বেয়ে উঠছে রাস্তা, পরের পর টানেল, কিন্তু কখনোই গাড়ির গতি একশোর নীচে নামে না।

ঘণ্টাখানেক দৌড়োনোর পর এক্সপ্রেসওয়ে ছেড়ে মুম্বই-বেঙ্গালুরু জাতীয় সড়কে উঠলাম। ক্রমশ এগিয়ে আসছে পুনে শহর। শহরকে বাঁ দিকে রেখে এগিয়ে চললাম। ওয়াকাড়, বেলাওয়াড়ি পেরিয়ে কিছুক্ষণ পর এল ওয়াদগাঁও। জাতীয় সড়ক ছেড়ে ডান দিকের খড়কওয়াসলা রোড দিয়ে এগোল আমাদের চারচাকা। খড়কওয়াসলা ন্যাশনাল ডিফেন্স অ্যাকাডেমিকে বাঁ দিকে আর লেককে ডান দিকে রেখে চলেছি পানশেটের দিকে। ওয়াদগাঁও থেকে দশ কিমি, এল গোরহে। এখান থেকে একটা সোজা রাস্তা উঠে যাচ্ছে সিনহাগড় দুর্গে। সেই দুর্গ যেটা জয়ের পথে শিবাজি হারিয়েছিলেন তাঁর বিশস্ত সৈনিক তানাজিকে। আক্ষেপ করে বলেছিলেন, “গড় আলা পর সিমহা গেলা।” অর্থাৎ, গড় এল কিন্তু সিংহ (তানাজি) চলে গেল।

pan-5
খড়কওয়াসলা থেকে পানশেটের পথে।

যাই হোক, আমরা ঘুরে গেলাম ডান দিকে। পাশ দিয়ে বয়ে চলেছে অম্বি নদী। আশেপাশে ইতিউতি পাহাড়। আসলে মহারাষ্ট্রের পাহাড়ের চরিত্রটা বড়োই অদ্ভুত। সব পাহাড়ের মাথাগুলো সমান, মানে আঁকার খাতায় আমরা যে ভাবে পাহাড় আঁকি আদৌ সেই রূপ নয় এ পাহাড়ের। সমুদ্রতল থেকে ২০০০ ফুট ওপরে থাকা সত্ত্বেও মোটের ওপর সমতল।

pan-3
পানশেটে মহারাষ্ট্র পর্যটনের পর্যটক অতিথি নিবাস।

বাপরে, কী বিশাল ঘর! সবাই হতচকিত। অনেক হোটেলেই তো থেকেছি কিন্তু মহারাষ্ট্র পর্যটনের এই পানশেট অতিথিনিবাসের মতো ঘরে তো কখনোই থাকা হয়নি। এর পেছনে অবশ্য একটা কারণ আছে এবং সেটা বললেন অতিথিনিবাসের ম্যানেজার এফ ওয়ালুঞ্জ। এই বাড়িটা আগে পূর্ত দফতরের অতিথিশালা ছিল। ৯০-এর দশকে মহারাষ্ট্র পর্যটন উন্নয়ন নিগম এটিকে অধিগ্রহণ করে। পাহাড়, জঙ্গলে ঘেরা জায়গায় অবস্থিত এই অতিথিনিবাস। আশেপাশে কোনো বসতি নেই। নিকটবর্তী গ্রামও এখান থেকে কিলোমিটার দুয়েক দূরে।

পানশেটে পৌঁছে যেটা আবিষ্কার করা গেল, মোবাইল টাওয়ার নেই। আজকের দিনে মোবাইল ছাড়া চলা অসম্ভব। তবুও একটু শান্তিতে থাকতে গেলে এ রকম একটা পরিস্থিতির কোনো জুড়ি নেই।

pan-1
পানশেট লেক।

এখানকার ড্যামটা বেশ বড়ো, কিন্তু বহিরাগতদের ভেতরে ঢোকার কোনো অধিকার নেই।   বিকেলে গিয়েছিলাম পানশেট লেকে। অম্বি নদীর জল ধরে কৃত্রিম হ্রদ তৈরি করা হয়েছে। চারিদিকে পাহাড়ে ঘেরা। আমাদের কলকাতা হলে এখনই সূর্যাস্ত হয়ে যেত, কিন্তু এটা মহারাষ্ট্র, সূর্যাস্ত এখনও অন্তত ঘণ্টাখানেক দেরি। চললাম খড়কওয়াসলার দিকে। সকালে এর পাশ দিয়েই এসেছি কিন্তু খড়কওয়াসলা হ্রদটাকে উপভোগ করা হয়নি।

pan-2
সূর্যাস্তের অপেক্ষা। খড়কওয়াসলা লেক।

মূল রাস্তা থেকে সন্তর্পণে নেমে পৌঁছলাম এই হ্রদের ধারে। পানশেট হ্রদে পা ভেজানোর কোনো উপায় নেই, কিন্তু এই হ্রদে সে সবে কোনো বাধা নেই। আমরা এগিয়ে এলাম। সূর্য পাটে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। নীল জল আর কমলা সূর্য তৈরি করল এক নৈসর্গিক দৃশ্যের। দুর্দান্ত একটা সূর্যাস্ত উপভোগ করে ফিরে চললাম পানশেটের দিকে।

দু’দিন পরেই নতুন বছর। আলোয় সেজে উঠেছে রিসোর্ট। ‘নিউ ইয়ার্স ইভ’ কাটানোর জন্য এসেছেন অনেক পর্যটক। আমরা ছ’জন অবশ্য সে সবের ধার ধারি না। ‘কান্দা ভাজি’ (পেঁয়াজি) আর চায় চুমুক দিতে দিতে জমে উঠল আমাদের সন্ধের আড্ডা।

কী ভাবে যাবেন

পানশেটের নিকটবর্তী বড়ো শহর মাত্র ৫০ কিমি দূরে পুনে। হাওড়া থেকে দ্বিসাপ্তাহিক দুরন্ত এক্সপ্রেস বা দৈনিক আজাদ হিন্দ এক্সপ্রেসে পৌছোনো যায় পুনে। এ ছাড়া দিল্লি, চেন্নাই, বেঙ্গালুরু, মুম্বই থেকে নিয়মিত ট্রেন রয়েছে পুনের উদ্দেশে। দেশের সব গুরুত্বপূর্ণ শহর থেকেই বিমানযোগ রয়েছে পুনের। পুনে থেকে পানশেট যাওয়ার একমাত্র উপায় গাড়ি ভাড়া করা। কারণ এই রাস্তায় বাস চলে না।

কোথায় থাকবেন

মহারাষ্ট্র পর্যটন উন্নয়ন নিগমের ‘পানশেট হলিডে রিসোর্ট’। অনলাইনে বুকিং-এর জন্য লগ ইন করুন: mtdcrrs.maharashtratourism.gov.in। এ ছাড়া বেশ কিছু বেসরকারি হোটেল আর রিসোর্ট রয়েছে এখানে।       

বিজ্ঞাপন
loading...

1 মন্তব্য

মতামত দিন

Please enter your comment!
Please enter your name here