আমাদের গ্র্যান্ড ক্যানিয়ন

2
364

sambhuশম্ভু সেন

বাংলার ‘গ্র্যান্ড ক্যানিয়ন’ দেখতে চাস, গনগনি ঘুরে আয় –– আমার আমেরিকা-ঘোরা বান্ধবী বলেছিল।

ও কিন্তু সিরিয়াসলি বলেছিল। কিন্তু আমার মনে হয়েছিল বাড়াবাড়ি। ঘুরে এসে মনে হয়েছিল, খুব ভুল বলেনি। ‘গ্র্যান্ড ক্যানিয়ন’ আমার ছবিতেই দেখা। কিন্তু গনগনিকে চোখে দেখে মনে হয়েছিল, এ-ই বা কম যায় কীসে ?

একটু খুলে বলি।

ভালো নাম শিলাবতী, আদরের নাম শিলাই। দৈর্ঘ্যে খুব বড় নয় সে। ছোটনাগপুরের মালভূমিতে তার জন্ম, পুরুলিয়ার পুঞ্চা শহরের কাছে। তার পর পুরুলিয়া, বাঁকুড়া আর পশ্চিম মেদিনীপুর জেলা দিয়ে বয়ে গেছে। ঘাটালের কাছে জোট বেঁধেছে দ্বারকেশ্বরের সঙ্গে। দু’য়ে মিলে নাম হয়েছে রূপনারায়ণ। সেই রূপনারায়ণ গেঁওখালির কাছে মা গঙ্গায় ডুব দিয়েছে। এই ছোট্ট শিলাই প্রায় সারা বছর গা এলিয়ে শুয়ে থাকে, অত্যন্ত রুগ্ন, শীর্ণ চেহারা তার। কিন্তু বর্ষা এলেই তার রুদ্র রূপ, ভাসিয়ে দেয় চন্দ্রকোনা, ক্ষীরপাই আর ঘাটাল। এ হেন শিলাবতীর কেরামতিতে সৃষ্টি এই গনগনির ‘গ্র্যান্ড ক্যানিয়ন’।

এখন এই গনগনিতেও শিলাবতীর সেই পরিচিত রূপ — পার হয়ে যায় গরু, পার হয় গাড়ি। দুই ধার উঁচু তার, ঢালু তার পাড়ি।। একটু ভুল হল, ‘দুই ধার’ নয়, এক ধার, যে দিকে তৈরি হয়েছে শিলাবতীর গিরিখাত। আপাতত যেখানে দাঁড়িয়ে আছি, মনে হচ্ছে যেন একটা ঝুল বারান্দা। লাল মাটির সেই শক্ত ঝুল বারান্দা দু’ দিকে বহু দূর বিস্তৃত। আর নদীর পার অনেক নীচে, চার-পাঁচ তলা বাড়ি তো হবেই।

গড়বেতা থেকে যে রাস্তা হুমগড়ের দিকে গেছে, সেই পথে খানিক গিয়ে ডান দিকে গনগনি। বোর্ডে পথনির্দেশ দেওয়া। লাল মাটির রাস্তা পৌঁছে দিয়েছে চুয়াড় বিদ্রোহ খ্যাত গনগনির মাঠে। সামাজিক বনসৃজনের ফসল কাজু আর শাল-পলাশের বন দু’ পাশে রেখে এখানে আসতে আসতে বেলা অনেকটা গড়িয়ে গেল। গ্রীষ্মের সূর্য পশ্চিমে হেলেছে কিছুটা। অকুস্থলে আসতেই চোখের ফ্রেমে বন্দি হল এক আশ্চর্য ভূমিরূপ, প্রকৃতির শৌর্য আর খেয়ালিপনার এক বিস্ময়কর নিদর্শন। মনুষ্যকৃত সৃষ্টিগুলোকে যতই পৃথিবীর আশ্চর্য বস্তু বলে তকমা দিই না কেন, প্রকৃতির সৃষ্টির কাছে সে সব হার মানতে বাধ্য। মুহূর্তে মনে হল, সত্যিই তো, আমাদের গ্র্যান্ড ক্যানিয়ন নেই তো কী হয়েছে, গনগনি তো আছে। সার্থকনামা গনগনি। গ্রীষ্মের এই দুপুরে গনগনি যেন সত্যিই গনগন করছে। গোটা এলাকাটা আগুনের মতো জ্বলছে।

প্রকৃতিতে এখন রঙের ফোয়ারা। আকাশ রয়্যাল ব্লু, গিরিখাতে হরেক শেডের লাল, তার ওপর সবুজ ঘাসের জাজিম, শিলাবতীর গেরুয়া জল আর হলুদ বালুতট, দু’ পারে সবুজের ঘেরাটোপ। রঙের এই অদ্ভুত বাহারিয়ানা। 

প্রাকৃতিক ঝুল বারান্দায় দাঁড়িয়ে গনগনির ভূমিরূপের দৈর্ঘ্য-প্রস্থ বোঝার চেষ্টা করছিলাম। লম্বায় দেড়–দু’ কিলোমিটার তো হবেই। ল্যাটেরাইট শিলায় তৈরি এই ভূখণ্ড। যুগ যুগ ধরে চলেছে প্রকৃতির খেলা। শিলাবতী আজ শীর্ণ, কিন্তু চিরকাল তো তার এই রূপ ছিল না। তার জলোচ্ছ্বাস ল্যাটেরাইট শিলায় আঘাত করেছে নিয়মিত। প্রবল ঝড়-বাতাস বয়ে গেছে এই মাঠ দিয়ে। ফলে সময়ের প্রবাহে তৈরি হয়েছে নানা প্রাকৃতিক ভাস্কর্য। সেই সব ভাস্কর্য আমাদের কল্পনায় নানা রূপ পেয়েছে। কেমন সে সব রূপ ? ভালো ভাবে বোঝার জন্য বাঁধানো রঙিন সিঁড়ি দিয়ে নীচে নেমে এলাম।gangani-1

শিলাবতীর পাড় ধরে এগিয়ে চলেছি। নজর ডান দিকে। কখনও মনে হচ্ছে এখানে একটা দুর্গ ছিল। সেই দুর্গ আজ ধ্বংস, রয়ে গেছে তার প্রাচীর। এখানে ওখানে প্রচুর গহ্বর। কোনও কোনও জায়গায় ভূমিখাত এমন রূপ নিয়েছে যেন মনে হচ্ছে বাড়ি বা মন্দিরের থাম বা খিলান। কল্পনার ডানা মেলে দিই। এই গিরিখাতের দেওয়ালে দেওয়ালে যে রূপ তৈরি হয়েছে তা কোথাও যেন দুর্গা, কোথাও বা শিব, কোথাও আবার ডাইনোসর, তো কোথাও বুনোমোষ। মানুষও আছে। অভিনব, অসামান্য সব কারুকলা !

এই গনগনিকে ঘিরে রয়েছে এই অঞ্চলের লোককাহিনি, রয়েছে ইতিহাস। এখানকার মানুষজনের সঙ্গে আলাপ করলে তাঁরা আপনাকে মহাভারতের বকরাক্ষসের কাহিনিটা বলবেই। অজ্ঞাতবাসে থাকার সময় পঞ্চপাণ্ডব এখানে নাকি কিছু দিন কাটিয়েছিলেন। এখানেই বকরাক্ষসকে হত্যা করে মধ্যম পাণ্ডব। শিলাবতীর এই গিরিখাত আসলে বকরাক্ষস আর ভীমের মধ্যে যে ভয়ঙ্কর যুদ্ধ হয়েছিল তার ফলেই তৈরি হয়েছিল।

কল্পকাহিনি থাক, ইতিহাসে আসি। চুয়াড়-লায়েক বিদ্রোহ তো বেশি দিনের কথা নয়। মোটামুটি দু’শো বছর আগের। বিদ্রোহের অন্যতম নায়ক অচল সিংহ তাঁর দলবল নিয়ে আস্তানা গেড়েছিলেন গনগনির গভীর শালবনে, রপ্ত করেছিলেন গেরিলা লড়াইয়ের কলাকৌশল। ইংরেজদের ব্যতিব্যস্ত করে তুলেছিলেন। ইংরেজ বাহিনী নাকি কামান দেগে গোটা শালবন জ্বালিয়ে দিয়েছিল। তবু দমানো যায়নি অচলকে। চোরাগোপ্তা আক্রমণ চালিয়ে যান তিনি। অবশ্য শেষরক্ষা করতে পারেননি। বগড়ির শেষ রাজা ছত্র সিংহ ধরিয়ে দেন অচলদের। এই গনগনির মাঠেই নাকি অচল ও তাঁর সঙ্গীদের ফাঁসি দিয়েছিল ইংরেজ।

গনগনির এই বেহড় দেখে মনে হচ্ছিল বন্দুক হাতে বাগী হওয়ার এমন প্রশস্ত জায়গা ভূ ভারতে কমই আছে।

পশ্চিমে অনেকটা নেমে গেছে সূর্য। এ বার তার ঘরে ফেরার পালা। নীল আকাশের মাঝে উঁকি দিচ্ছে গোলাপি আভা। সেই গোলাপি ক্রমে ক্রমে সিঁদুররঙা হল। আকাশের লালচে সিঁদুর আর ‘গ্র্যান্ড ক্যানিয়ন’-এর লাল থেকে গেরুয়া, সব মিলেমিশে কেমন একটা খুনখারাপি রঙের বান ডাকল।

সূর্যাস্তের সময়ই যেন মাহেন্দ্রক্ষণ এই গনগনিতে আসার।

কী ভাবে যাবেন

হাওড়া/শালিমার থেকে ট্রেনে ঘণ্টা আড়াইয়ের পথ। যে সব ট্রেন খড়গপুর হয়ে বাঁকুড়া-পুরুলিয়ার দিকে যায় সেই পথে গড়বেতা। হাওড়া স্টেশন ও ধর্মতলা এবং মেদিনীপুর, বাঁকুড়া, পুরুলিয়া জেলার বিভিন্ন জায়গা থেকে নিয়মিত বাস চলে। হাওড়া থেকে জাতীয় সড়ক ৬ ধরে পাঁশকুড়া, তার পর ঘাটাল, চন্দ্রকোনা ও রোড চন্দ্রকোনা হয়ে গড়বেতা।

কোথায় থাকবেন

গড়বেতায় থাকার জন্য ছোট-বড় অনেক হোটেল আছে। একটা ধর্মশালাও আছে। তা ছাড়া চন্দ্রকোনা, বিষ্ণুপুর বা মেদিনীপুরে থেকেও ঘুরে নিতে পারেন গনগনি। 

বিজ্ঞাপন
loading...

2 মন্তব্য

  1. সুন্দর লেখা। যদিও আরো অনেক ইতিহাস জড়িয়ে আছে।

    ছোট্ট পরিসরে ভালই লাগল।

    কিন্তু আশা করেছিলাম, থাকা খাওয়া নিয়ে আরো কিছু খবর পাব।

  2. সুন্দর লেখা। যদিও আরো অনেক ইতিহাস জড়িয়ে আছে।

    ছোট্ট পরিসরে ভালই লাগল।

    কিন্তু আশা করেছিলাম, থাকা খাওয়া নিয়ে আরো কিছু খবর পাব।

মতামত দিন

Please enter your comment!
Please enter your name here