উত্তরবঙ্গের ডায়েরি ৩/ খয়েরবাড়ির বাঘিনীরা

0
263

wrivuশ্রয়ণ সেন:

“হাতি দেখলে আগে খুব ভয় পেতাম, এখন আর পাই না।”

কত অবলীলায় এই কথাগুলো বলে ফেলল বছর দশেকের মামণি। খুব সুন্দর একটি ঘণ্টা কাটল আমাদের।

মাদারিহাট থেকে বীরপাড়ার দিকে কয়েক কিলোমিটার এলে বাঁ দিকে দিকনির্দেশ খয়েরবাড়ির। জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে মেঠো পথ। এমন রাস্তা, যেখানে যে কোনো মুহূর্তেই হাতি বেরোতে পারে। নিতান্ত কম দূরত্ব নয়। প্রায় কিলোমিটার দশেক যাওয়ার পর দেখা মিলল পুনর্বাসন কেন্দ্রটির প্রবেশদ্বারের।  

khayer-1বাঘ, চিতাবাঘের পুনর্বাসন কেন্দ্র এই সাউথ খয়েরবাড়ি নেচার পার্ক। সার্কাসে বাঘের খেলা দেখানো বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর এখানেই তাদের পুনর্বাসন দেওয়া হয়েছে। চোরাচালানকারীদের ডেরা থেকে উদ্ধার করা চিতাবাঘদেরও রাখা হয়েছে এখানে। টিকিট কেটে প্রবেশ করতেই ধরল দুই বন্ধু। ক্লাস ফাইভের মামণি আর্য আর ফোরের দীপিকা দাস। আমাদের পুরো কেন্দ্রটি ঘুরিয়ে দেবে, বিনিময় ওদের আবদার মাত্র কুড়ি টাকা।

এত সস্তার গাইড! এক কথায় রাজি হয়ে গেলাম। শুরুতেই একটা ছোটো নদী পেরোলাম। ওরা জানাল এটা বুড়ি তোর্সা। এখানে বোটিং-এরও ব্যবস্থা রয়েছে। এই উদ্যানের মূলত দু’টি ভাগ। ‘লেপার্ড সাফারি পার্ক’ এবং ‘টাইগার রেসকিউ সেন্টার’। কিছু দিন আগে পর্যন্ত ‘লেপার্ড সাফারি পার্ক’-এর মধ্যে ব্যাটারিচালিত গাড়িতে সাফারি করানো হত, কিন্তু কোনো এক অজ্ঞাত কারণে সেটি বন্ধ হয়েছে। 

—“ও দিক দিয়ে যেও না, এ দিক দিয়ে চলো।”

—“কিন্তু এটা তো পেছন দিক।”

—“হ্যাঁ পেছন দিক, কিন্তু এই দুপুরের সময়ে ওরা পেছন দিকেই থাকবে।”

khayer-2দুই বন্ধুর আত্মবিশ্বাস দেখে আমরা অবাক। তাই অপেক্ষাকৃত ভালো রাস্তা ত্যাগ করে ঝোপঝাড়ের মধ্যে দিয়েই এগলাম। ওদের কথা মিলেও গেল। সত্যি দর্শন পেলাম কয়েকটা চিতাবাঘের। দুপুরের খাওয়া সেরে তারা এখন আরাম করছে। বয়সের ভারে ন্যুব্জ হয়ে পড়েছে। কারওরই এখন হিংসাত্মক কাজ করার কোনো ক্ষমতা নেই। বোঝা যায় এরা সবাই এক কালে খুব অত্যাচারিত হয়েছে। চিতাবাঘের কেন্দ্র থেকে কয়েক পা এগোলে বাঘের পার্ক। ও দিকে যাওয়ার পথে কিছু কথা বলা গেল মামণি আর দীপিকার সঙ্গে।

কাছের গ্রামে বাড়ি ওদের। দীপিকার বাবা নেই, কেরলে রেলের হয়ে কাজ করতে গিয়ে মারা গিয়েছেন। ক্ষতিপূরণের জন্য অনেক আবেদননিবেদন করেও কিছু পাওয়া যায়নি। ওরা তিন বোন আর এক ভাই। খয়েরবাড়ির গেটের সামনে মায়ের দোকান রয়েছে। চা-কফি-কোল্ড ড্রিঙ্কস-চিপ্স-বিস্কুট ইত্যাদি। মায়ের সঙ্গে দাদা ওই দোকানে বসে। মামণিরা অসমের। একুশ বছর হল ওদের পরিবার এখানে। ওদেরও দোকান রয়েছে গেটে। দু’জনেই বলল ফেরার পথে আমরা যেন ওদের দোকান থেকে কিছু খেয়ে যাই।

khayer-3এল ‘টাইগার রেসকিউ সেন্টার’। রয়্যাল বেঙ্গলদের ডেরা এটি। বিশাল উঁচু জাল দিয়ে ঘিরে রাখা হয়েছে। অত্যুৎসাহী পর্যটকরা সেই জালের ওপর উঠে বাঘের দর্শন করতে চায়। বনকর্মীদের সতর্কতা থোড়াই কেয়ার। মামণিদের হিসেব, মোট এগারোটা বাঘ রয়েছে এখানে। জালের ধার বরাবর বেড় করে ঘুরলাম। চোখে পড়ল এই কেন্দ্রের সব থেকে বয়স্ক বাসিন্দার। এক কালে সার্কাসে খেলা দেখাত সে। কিন্তু বয়সের ভারে বেচারা এতটাই দুর্বল হয়ে পড়েছে যে দেওয়ালের ভর ছাড়া হাঁটতেই পারছে না। পুরো জায়গাটা আমাদের সুন্দর করে দেখাল এই ক্ষুদে গাইড।

কথা প্রসঙ্গেই চলে এল হাতি। আমরা পর্যটকরা কখনওই স্থানীয়দের দুর্দশার-সমস্যার কথা ভাবি না। জঙ্গল সাফারিতে হাতি দর্শন না দিলে আমরা হতাশ হই, কিন্তু হাতির সঙ্গে লড়াই করা যাঁদের নিত্য দিনের ব্যাপার তাদের কী মনে হয়? হ্যাঁ, ওদের গ্রামেও হাতি হানা দেয়। কিছু দিন আগেও এসেছিল। ওদের বাড়িতে আঘাত না হানলেও, গ্রামের অনেক বাড়িই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে দুই বন্ধু কোনো রাখঢাক না রেখেই বলে দিল, “হাতির জায়গা দখল করে বাড়ি করেছি আমরা, হাতি তো ছেড়ে দেবে না। হাতির সঙ্গে যুদ্ধ করা আমাদের অভ্যাস হয়ে গিয়েছে।”

খয়েরবাড়ির বাঘ দেখতে এসে, পরিচিত হলাম দুই খুদে বাঘিনীর সঙ্গে।

আরও পড়ুন উত্তরবঙ্গের ডায়েরি ২/এক গন্ডা গন্ডার দর্শন

কী ভাবে যাবেন

খয়েরবাড়ি যেতে হলে আপনাকে পৌঁছতে হবে মাদারিহাট। মাদারিহাট আসার সহজতম উপায় হল ট্রেনে নিউ জলপাইগুড়ি (এনজেপি)। দেশের সব প্রধান শহরের সঙ্গেই ট্রেনে যোগ রয়েছে এনজেপির। এনজেপি থেকে মাদারিহাটের দূরত্ব ১২৫ কিমি। গাড়ি ভাড়া করে বা বাসে আসা যেতে পারে। মাদারিহাটে রেল স্টেশন রয়েছে। কিন্তু শিলিগুড়ি থেকে আলিপুরদুয়ারগামী কয়েকটা লোকাল ট্রেনই এই স্টেশনে থামে।

কোথায় থাকবেন

থাকার জন্য মাদারিহাটে রয়েছে পশ্চিমবঙ্গ পর্যটন উন্নয়ন নিগমের জলদাপাড়া টুরিস্ট লজ। অনলাইনে বুক করতে পারেন। www.wbtdc.gov.in। এ ছাড়াও বেসরকারি অনেক হোটেল রয়েছে মাদারিহাটে।

বিজ্ঞাপন
loading...

মতামত দিন

Please enter your comment!
Please enter your name here