উত্তরবঙ্গের ডায়েরি ৪/ যাত্রাপ্রসাদে যাত্রাপালা

0
194

wrivuশ্রয়ণ সেন:

“ওরে ওকে দ্যাখ সবাই। ও নদী পেরিয়ে চলে যাচ্ছে। নিশ্চয়ই মন খারাপ হয়েছে।”

না, কোনো মানুষ নয়। একটি গন্ডার। আপন খেয়ালে নদী পেরিয়ে চলে গেল। সঙ্গী একটি বক। ওর পিঠের ওপরে বসে হেলতে দুলতে যাচ্ছে। অনেকটা দূরত্ব থেকেই তা উপভোগ করে চলেছি আমরা।

ডুয়ার্সের দু’টি প্রধান জাতীয় উদ্যান। জলদাপাড়া আর গরুমারা। আগের দিন জলদাপাড়ায় এক গন্ডা গন্ডার দর্শন হওয়ার পর, এ বার গন্ডার দেখার আশায় চলে এসেছি গরুমারা জাতীয় উদ্যানের কাছেই লাটাগুড়িতে। ঘরে ঢুকতে না ঢুকতেই ছুটতে হল লাটাগুড়ি নেচার ইন্টারপ্রিটেশন সেন্টারে। গরুমারা সাফারির জন্য টিকিট কাটতে হবে। বেলা বারোটায় খুলবে কাউন্টার।

এখান থেকে বিভিন্ন পয়েন্টের সাফারির টিকিট দেওয়া হয়। পর্যটকদের প্রথম পছন্দ গরুমারা উদ্যানের ভেতরে যাত্রাপ্রসাদ নজরমিনার। যাত্রাপ্রসাদের চাহিদা এত বেশি থাকে যে সচরাচর এর টিকিট পাওয়া যায় না। সে ক্ষেত্রে পর্যটকদের মেধলা, খুনিয়া প্রভৃতি নজরমিনারের টিকিট দেওয়া হয়। কিন্তু লোকমুখে শোনা, যাত্রাপ্রসাদ দেখে নিলে না কি মেধলা আর খুনিয়া দেখার কোনো প্রয়োজন হয় না। টিকিটের রেটও তাই যাত্রাপ্রসাদের অনেকটাই বেশি। টিকিটে ধরা থাকে আদিবাসী নৃত্য দেখানো।   

কী সৌভাগ্য আমাদের! ভাগ্যে যাত্রাপ্রসাদই জুটেছে। এই সবই হয়েছে তুলনামূলক ফাঁকা কাউন্টারে লাইন দেওয়ার জন্য। বিকেল ৩টেয় শুরু সাফারি, সওয়া দু’টোয় টিকিট কাউন্টারে রিপোর্ট করতে বলা হল।

goru-1সারথি তন্ময় আর গাইড রামকে সঙ্গে নিয়ে যাত্রা শুরু হল। লাটাগুড়ি থেকে চালসার দিকে দশ কিমি গিয়ে ডান দিকে পড়ল গরুমারা জাতীয় উদ্যানের গেট। পৌনে তিনটে নাগাদ পৌঁছে গেলাম সেখানে। কিছুক্ষণের অপেক্ষা। ঘড়িতে তিনটে বাজতেই খুলে গেল উদ্যানের গেট। বাঁ দিকে চা বাগান আর ডান দিকে গভীর জঙ্গলকে রেখে এগিয়ে চললাম।  

goru-mayurএ বারেও প্রথমেই ময়ূর দর্শন। কিন্তু ময়ূর দেখলে দর্শনভাগ্য সুখের হয় না, এই মিথ তো আমরা জলদাপাড়াতেই ভেঙেছি। যাই হোক, এগিয়ে চলেছি জঙ্গলের পথে। গরুমারার খ্যাতি যতটা না গন্ডারের জন্য, তার চেয়েও বেশি বাইসন বা গউরের জন্য। জঙ্গলের চরিত্রও জলদাপাড়া থেকে অনেকটাই আলাদা। শাল-সেগুন-শিমূল গাছে ভর্তি ঘন জঙ্গল।

এল যাত্রাপ্রসাদ নজরমিনার। জিপসি সাফারিতে এটাই শেষ পয়েন্ট। কিন্তু এখানেই শুরু। গাইড জানালেন, এখানে আধঘণ্টা থাকা হবে। ভাগ্য ভালো থাকলে চোখে পড়তে পারে গন্ডার, বাইসন, হরিণ এমনকি হাতিও। নজরমিনারটা খুব সুন্দর। দু’টো ধাপে করা এটি। এক সঙ্গে প্রায় শ’খানেক লোক দাঁড়াতে পারে এখানে।

সামনে দিয়ে বয়ে যাচ্ছে একটি নদী। গাইডের কথায় ওটা মূর্তি নদী। ওপারে বন্য বাসিন্দাদের বিচরণ ক্ষেত্র। দূরে দেখা যাচ্ছে হিমালয়ের সরু একটা স্কেচ। ঘড়িতে বিকেল প্রায় সাড়ে ৩টে। গাইডের নির্দেশে সবাই চুপ করে দাঁড়িয়ে। বেশি চিৎকার করলে কারও দর্শন পাওয়া নাও যেতে পারে।

না, বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হল না। গাইড আঙুল দিয়ে দেখালেন ওই দিকে নাকি একটা গন্ডারকে দেখা গিয়েছে।

—“কই, কিছুই তো দেখা যাচ্ছে না।”

—“ঝোপের মধ্যে আছে, একটু পরেই বেরোবে।”

goru-rhinoসত্যি, গাইডরা সব জানেন। তিন-চার মিনিটের মধ্যেই সে বেরিয়ে এল ঝোপের মধ্য থেকে। সঙ্গে সঙ্গে বেরিয়ে পড়ল ক্যামেরা। শুরু হয়ে গেল দমাদ্দম শাটার টেপা। তার বিশেষ কোনো হেলদোল নেই। ঘাস খেতেই ব্যাস্ত।

আগের দিন জলদাপাড়ায় চারটি গন্ডার দেখেছি, আজ কী তার থেকে বেশি দেখব, নিজেদের মধ্যে এই চর্চা যখন তুঙ্গে, তখনই ঝোপের আড়াল থেকে বেরিয়ে পড়ল আরও দু’জন। স্বামী-স্ত্রী হতে পারে, দুই বন্ধু হতে পারে। যাই হোক, আমাদের মনে তখন পরম স্বস্তি।

এরই মধ্যে একটি বাইসন দেখালেন গাইড। গরুমারার নিজস্ব বাসিন্দা। জীবনে প্রথম বাইসন দেখলাম। অনেকটা গরুর মতো দেখতে। গাঁয়ের রঙ খয়েরি এবং কালোর মিশ্রণ। খাড়া সিংহ তাঁর। মূর্তি নদীর জল খাচ্ছে সে।

goru-waterবাইসনের থেকে চোখ ফেরাতেই দেখলাম একটি গন্ডার ক্রমে নদী পেরিয়ে দূরে চলে যাচ্ছে। সঙ্গে সঙ্গে হাসির রোল নজরমিনারে। শুরু হয়ে গেল মজার কথা বলা। কেউ বলছে গন্ডারটা প্রেমে ব্যর্থ হয়েছে, কারও মতে সংসার ত্যাগ করে সন্ন্যাস নিতে যাচ্ছে। কারণ যা-ই হোক, ব্যাপারটা সবার কাছে উপভোগ্য। ও নদী পেরিয়ে চলে যেতেই চোখ ফেরালাম অন্য দিকে। এলিফ্যান্ট গ্রাসের জঙ্গলের আড়ালে রয়েছে অসংখ্য বাইসন। অজস্র সিং নজরে আসছে, কিন্তু সশরীরে তাদের দেখা যাচ্ছে না।

goru-bysonঘটনাক্রমে দিনটা ছিল রবিবার। পর্যটকদের কেউ কেউ বলে উঠলেন, রবিবার বলে ঘরের কাজ ফেলে বন্যজন্তুরা আজ মানুষ সাফারিতে বেরিয়েছে। যাই হোক, খুব উপভোগ্য পঁয়তাল্লিশটা মিনিট কাটালাম যাত্রাপ্রসাদে।

–“চলুন, এ বার যেতে হবে। অন্ধকার হয়ে যাবে।”

সময় ফুরিয়ে এল। এ বার ফিরতে হবে। হিসেব মতো আরও একটা পয়েন্ট দেখার কথা। মুখ ফেরানোর কয়েক সেকেন্ড আগেই চোখে পড়ল আরেকটা গন্ডার। নিজেদের রেকর্ড নিজেরাই ভেঙে ফেললাম। জলদাপাড়ায় দেখেছিলাম চারটে গন্ডার, এখানে পাঁচটা। তবে হাতি চোখে পড়ল না।

goru-pointএ বার গন্তব্য রাইনো পয়েন্ট। রাইনো পয়েন্টে মিনিট পনেরো অপেক্ষা করলাম, কিছু দেখার আশায়। কোনো রাইনোকে অবশ্য দেখা যায়নি।

যাত্রাপ্রসাদ থেকে এক অসাধারণ যাত্রাপালার স্মৃতি নিয়ে বিদায় জানালাম গরুমারা জাতীয় উদ্যানকে।

আরও পড়ুন উত্তরবঙ্গের ডায়েরি ৩/ খয়েরবাড়ির বাঘিনীরা

কী ভাবে যাবেন

লাটাগুড়ি বিভিন্ন ভাবে যাওয়া যায়। ট্রেনে পৌঁছোতে পারেন এনজেপি। সেখান থেকে লাটাগুড়ির দূরত্ব ৫০ কিমি। কাঞ্চনকন্যা এক্সপ্রেসে যেতে পারেন নিউ মাল জংশন। নিউ মাল থেকে লাটাগুড়ি ৩০ কিমি। ট্রেনে নিউ ময়নাগুড়ি পৌঁছে সেখান থেকেও লাটাগুড়ি যাওয়া যেতে পারে। দূরত্ব ২৩ কিমি। জলপাইগুড়ি থেকে লাটাগুড়ি ২৭ কিমি।

কোথায় থাকবেন

গরুমারা সাফারি করার জন্য লাটাগুড়ি শহরে থাকাই ভালো। লাটাগুড়িতে রয়েছে প্রচুর বেসরকারি হোটেল এবং রিসোর্ট। পশ্চিমবঙ্গ পর্যটন উন্নয়ন নিগম লাটাগুড়ির কাছে দু’টি রিসোর্ট খুলেছে বাটাবাড়ি আর টিলাবাড়িতে। কিন্তু সেগুলি লাটাগুড়ি নেচার ইন্টারপ্রিটেশন সেন্টার থেকে বেশ খানিকটা দূরে। অনলাইনে বুক করতে পারেন www.wbtdc.gov.in। পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য বন উন্নয়ন এজেন্সির বিচাবঙ্গ ইকো কটেজ বা নেওড়া জঙ্গল ক্যাম্পেও থাকা যেতে পারে। অনলাইনে বুক করতে পারেন www.wbsfda.gov.in

ছবি: লেখক 

বিজ্ঞাপন
loading...

মতামত দিন

Please enter your comment!
Please enter your name here