উত্তরবঙ্গের ডায়েরি ৮/ সঙ্গী জলঢাকা

0
316

শ্রয়ণ সেন:

মূর্তি নদীর মাঝে রকি আইল্যান্ডে কিছুক্ষণ সময় কাটিয়ে আবার পথ চলা শুরু। জলঢাকাকে এ বার সঙ্গী করতে হবে। সামসিং নেমে এসে, বাঁ দিকের রাস্তা ধরলাম। এ পথের সৌন্দর্য বলে বোঝানোর ভাষা আমার নেই। দিগন্ত বিস্তৃত চা বাগানের মধ্যে দিয়ে ছুটে চলেছে আমাদের বোলেরো। পাহাড় আবার কিছুটা দূরে সরে গিয়েছে।

চা বাগানের মধ্যে দিয়ে কিলোমিটার দশেক যেতে এসে পড়ল মৌরে গ্রাম। তিন রাস্তার সংযোগস্থলে এই গ্রামটি। ডান দিকের রাস্তাটি চলে যাচ্ছে চালসার কাছে খুনিয়া মোড়। আমরা এগিয়ে চললাম সামনের দিকে। ফের শুরু হয় গেল পাহাড়ি পথ। রবার গাছের সারি আমাদের স্বাগত জানাল।

বিজ্ঞাপন

গৈরিবাসে পেয়ে গেলাম জলঢাকাকে। ঝালং-বিন্দুর পথে প্রথম দ্রষ্টব্য স্থান এই গৈরিবাস। মেন রোডের ধারে প্রাকৃতিক ভাবে তৈরি হয়েছে একটি ভিউ পয়েন্ট। বেশ কিছুটা নীচ দিয়েই বয়ে চলেছে জলঢাকা। কিছুক্ষণ সময় কাটিয়ে প্রাণ ভরে দেখে নিলাম তাকে।

এই গৈরিবাসেই একটা মজার ঘটনা ঘটল। সময় দেখার জন্য মোবাইলটা দেখেই চমকে উঠলাম। মনে হচ্ছে হঠাৎ করে অনেকটা সময় এগিয়ে গিয়েছে। একটু আগেও তো সময় দেখেছিলাম, তখন তো এ রকম মনে হয়নি। হিসেবমতো যে সময়টা এখন থাকার কথা, তার থেকে অন্তত আধ ঘণ্টা এগিয়ে গিয়েছে সময়। কী করে হয়?

কৌতূহল মিটিয়ে দিলেন স্থানীয় এক দোকানি। আমরা রয়েছি ভুটান সীমানার একদম কাছে। নদীর ও-পারে যে বাড়িঘরগুলো দেখা যাচ্ছে সেগুলো রাজার দেশের। মোবাইলে তাই ভুটানের সময় দেখাচ্ছে। জলঢাকা এবং ভুটানকে পাশে নিয়ে এগিয়ে চললাম।

পাহাড়ি পথ ধরে এঁকেবেঁকে উঠে গাড়ি থামল ঝালং সেতুর ওপর। জলঢাকার ওপর এই সেতু। একে কেন্দ্র করে তৈরি এই ছোট্ট পাহাড়ি জনপদ। জলঢাকার একদম ধারেই রয়েছে পশ্চিমবঙ্গ বনোন্নয়ম নিগমের বাংলো। গোর্খা আন্দোলনের সময় বাংলাটি পুড়িয়ে দেওয়া হলেও এখন আবার চালু হয়েছে সেটি। এখানে একটা রাত কাটালে তবেই ঝালং-এর প্রকৃত রূপ বোঝা যায়। এখানকার রাতকে আরও মায়াবী করে তোলে পাথরে ধাক্কা খাওয়া নদীর জলের শব্দ।

আমাদের তো বাংলায় ঢোকার অনুমতি নেই, তাই সেতুর ওপর থেকেই ঝালং-এর সৌন্দর্য উপভোগ করতে হল। খরস্রোতা জলঢাকায় এসে মিশছে ক্ষীণস্রোতা ঝোলুং ঝোরা। প্রবল উচ্ছ্বাসে বয়ে যাচ্ছে জলঢাকা।

ফের যাত্রা শুরু, এ বার গন্তব্য বিন্দু। জলঢাকা জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রকে পাশে রেখে এগিয়ে চললাম। এল প্যারেন। ঝালং-এর থেকে কিছুটা বড়ো এই জনপদটা। ছোটখাটো একটা বাজারও রয়েছে এখানে।

‘নদীতে নামবেন না। বিপদ হতে পারে।’

গাড়ি পার্ক করে জলঢাকা ব্যারেজের দিকে যত এগোচ্ছি, তত চোখে পড়ছে স্থানীয় প্রশাসনের এই সতর্কবার্তা। কিছুদিন আগেই এখানে একটি মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটে গিয়েছে। হড়পা বানে ভেসে গিয়েছে বাবা-মায়ের সঙ্গে ভ্রমণে আসা বছর বারোর এক বালক। এ রকম ঘটনা যাতে ফের না ঘটে সে জন্য সতর্ক প্রশাসন। কিন্তু লোকে শুনলে তো। নিরাপত্তারক্ষীদের নজর এড়িয়েই সবাই নেমে পড়ছে জলঢাকার একদম ধারে।

দু’ দিকে পাহাড়ের কোলে বসে থাকা এই ব্যারেজই বিন্দুর সৌন্দর্য আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। এখানে জলঢাকায় মিশেছে আরও দু’টি ছোটো নদী, দুধপোখরি এবং বিন্দুখোলা। বিন্দু আক্ষরিক অর্থেই বিন্দু। ভুটান সীমানার আগে পশ্চিমবঙ্গের শেষ গ্রাম এই বিন্দু। ব্যারেজের ও-পারেই ভুটান। ব্যারেজ পেরিয়ে ভুটান ঘুরে আসতে কোনো বাধা নেই। মানুষের প্রয়োজন মুছে দেয় রাজনৈতিক সীমারেখা। তাই হাটবারে সীমানা পেরিয়ে ভুটান থেকে দলে দলে মানুষ আসেন এখানে। সংগ্রহ করে নিয়ে যান নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র। বুধবার ঝালং-এ আর বৃহস্পতিবার এই বিন্দুতে হাট বসে।

ঘুরতে ঘুরতে খেয়ালি হয়নি কখন পেটে ছুঁচোয় ডন মারা শুরু করে দিয়েছে। স্থানীয় এক রেস্তোরাঁয় গরম গরম থুকপা খেয়ে ফেরার রাস্তা ধরলাম।

আরও পড়ুন: উত্তরবঙ্গের ডায়েরি ৭/ সামসিং, সান্তালেখোলা হয়ে রকি আইল্যান্ড

কী ভাবে যাবেন

শিয়ালদহ থেকে কাঞ্চনকন্যা এক্সপ্রেসে পৌঁছোন নিউ মাল জংশন। এখান থেকে গৈরিবাস ৩৯ কিমি, ঝালং ৪১ কিমি এবং বিন্দু ৫০ কিমি। গাড়ি ভাড়া করে বেরিয়ে পড়ুন।

কোথায় থাকবেন

ঝালং-এর প্রকৃত রূপ বুঝতে গেলে এখানকার বনোন্নয়ন নিগমের নেচার রিসোর্টে একটা রাত কাটানো যেতে পারে। ঘরভাড়া যদিও একটু বেশি। বনোন্নয়ন নিগমের নেচার রিসোর্ট রয়েছে প্যারেনেও। অনলাইনে বুক করতে পারেন www.wbfdc.net। এ ছাড়া ঝালং, প্যারেন, বিন্দু, তিন জায়গাতেই রয়েছে বেসরকারি রিসোর্ট এবং হোমস্টে।   

বিজ্ঞাপন
loading...

মতামত দিন

Please enter your comment!
Please enter your name here