উত্তরবঙ্গের ডায়েরি ২/এক গন্ডা গন্ডার দর্শন

0
291

wrivuশ্রয়ণ সেন:

“এই যা ময়ূর দেখে ফেললাম!”

“হ্যাঁ, তো কী হয়েছে। জঙ্গল সাফারিতে ময়ূর তো দেখবই।”

“আরে বুঝতে পারছিস না, এ রকম ভাবে ময়ূর দেখে ফেলা ঠিক না। এখন গন্ডার-টন্ডার না দেখেই ব্যর্থ হয়ে ফিরতে হবে।”

—“আরে চিন্তা কোরো না, গন্ডার ঠিক দেখা দেবেই, আমি বলে দিচ্ছি।”

–“বলছিস তা হলে। তোর মুখে ফুল-চন্দন পড়ুক।”

পিসির সঙ্গে কথোপকথন। জলদাপাড়া উদ্যানে সাফারি শুরুতেই ময়ূর দর্শনে পিসি বেশ হতাশ। ওর মতে, জঙ্গল সাফারির শুরুতে ময়ুর দেখে ফেলা না কি দুর্ভাগ্যের ব্যাপার। এর ফলে নাকি জঙ্গলের মূল বাসিন্দা দর্শন দেয় না। অবশ্য এর পেছনে অকাট্য একটা যুক্তিও দিল পিসি। ময়ূর আছে কারণ আশেপাশে কোনো বন্যজন্তু নেই।

jalda-peacock
অভয়ারণ্যে ঢোকার মুখেই ময়ূর দর্শন।

ডুয়ার্স বেড়াব আর জলদাপাড়ায় সাফারি করব না সেটা তো হতে পারে না। গতকাল বিকেলেই এসে পৌঁছেছি এখানে। উঠেছি মাদারিহাটে পশ্চিমবঙ্গ পর্যটন উন্নয়ন নিগমের টুরিস্ট লজে। তবে হোটেলের ঘরে ঢোকার আগেই ম্যানেজারবাবুর তাড়ায় ছুটতে হল সাফারি টিকিট কাটতে। টুরিস্ট লজের পাশেই সাফারি টিকিট বুকিং-এর অফিস। সন্ধে ছ’টায় অফিস খুলবে, কিন্তু তার ঘণ্টা দুয়েক আগে থেকেই বিশাল লাইন কাউন্টারের সামনে। দিনে চারটে সাফারি হয়। সকালে দু’টো আর বিকেলে দু’টো। প্রতিটা সাফারিতে ১৬টি জিপসি যায়, অর্থাৎ সারা দিনে ৬৪টি জিপসির টিকিট দেওয়া হবে। ভাগ্য অসম্ভব ভালো না হলে হাতি সাফারির কোনো সুযোগ পাওয়া যায় না। অবশ্য হাতি সাফারির ক্ষেত্রে প্রাধান্য দেওয়া হয় মূলত জঙ্গলের ভেতরে হলং টুরিস্ট লজের পর্যটকদের।  

ছ’টায় কাউন্টার খুলতেই হুড়োহুড়ি। সবাই ফর্ম পাওয়ার জন্য উদগ্রীব। উল্লেখ্য, ফর্মটা পাওয়াই আসল ব্যাপার। ফর্ম হাতে পেলেই সাফারি গ্যারান্টি। ফর্ম পূরণ করে টিকিট কাটলাম। পরের দিন সকাল সাড়ে আটটার সাফারি।

উঠে পড়লাম জিপসিতে। স্বাগত জানালেন সারথি স্বপন দাস এবং গাইড চয়ন সুব্বা। ইতিমধ্যে সকালের সাফারি শেষ করে ফিরছেন পর্যটকরা। সবার মুখেই হতাশার ছাপ স্পষ্ট। প্রথম সাফারিতে কিছুই দেখা মেলেনি। আমরাও চিন্তিত বুঝে চয়নবাবু অভয় দিলেন, “সাড়ে আটটার সাফারিতে গন্ডার দেখার সম্ভাবনা বেশি।” জয় মা দুর্গা বলে রওনা হয়ে গেলাম।

জলদাপাড়া উদ্যান নিয়ে দু’চার কথা বলে রাখা যাক। এক শৃঙ্গ গন্ডারের বিচরণভূমি এই জলদাপাড়া অরণ্য, ১৯৪১ সালে অভয়ারণ্যের মর্যাদা পায়। ২০১২-তে জাতীয় উদ্যান হিসেবে খ্যাতি লাভ করে জলদাপাড়া। ভারতে একমাত্র জলদাপাড়া আর গরুমারা জাতীয় উদ্যানে দেখা যায় এই একশৃঙ্গ গন্ডার।

জাতীয় সড়কে উঠে কিছুটা মাদারিহাটের দিকে এলে বাঁ দিকে পড়বে জলদাপাড়া জাতীয় উদ্যানের প্রবেশদ্বার। নথিভুক্তকরণের জন্য খানিক অপেক্ষা, তার পর প্রবেশ জঙ্গলের মধ্যে।  শুরুতেই ময়ূরের দর্শন। পাঁচ জনের দলে আমি ছাড়া সবাই বেশ হতাশ।

জঙ্গলের মধ্যে মেঠো পথ দিয়ে এগিয়ে চললাম। এটা বাফার জোন। চারিদিকে ঘন জঙ্গল। সাড়ে সাত কিলোমিটার চলার পর, এল হলং টুরিস্ট লজ। হলং বনবাংলো হিসেবেই এর পরিচিতি বেশি। এখন এই বনবাংলো অবশ্য পর্যটন উন্নয়ন নিগমের তত্ত্বাবধানে রয়েছে। জলদাপাড়ার প্রকৃত রূপ দর্শন করতে হলে এই হলং বাংলোয় এক রাত থাকা উচিত। রাতে বাংলোর নীচে চলে আসে গন্ডাররা। বাংলোর পাশ দিয়েই চলে গিয়েছে হলং নদী। সন্ধের পর বাংলোর জানলা থেকে উপভোগ করা যায় নদীতে গন্ডারদের জল খেতে আসা।  

jalda-halang
হলং টুরিস্ট লজ।

হলং-এ কিছুক্ষণের অপেক্ষা। আবার যাত্রা শুরু। জঙ্গলের চেহারাটা যেন হঠাৎ করে পালটে গেল। জঙ্গলটা হালকা হয়ে এসেছে। না, ঠিক জঙ্গল হালকা হয়নি, আসলে গাছের চরিত্র বদলে গেছে। বড়ো বড়ো গাছের বদলে জায়গা করে নিয়েছে লম্বা লম্বা ঘাস। এ গুলোকে ‘এলিফ্যান্ট গ্রাস’ বলে। চরিত্রটা ঠিক আফ্রিকার জঙ্গলের মতো। দূরে দেখা যাচ্ছে পাহাড়শ্রেণি। আমাদের এখন গন্তব্য জলদাপাড়া ওয়াচ টাওয়ার।  

বিস্তীর্ণ তৃণভূমির পর আবার গভীর জঙ্গল শুরু। কিছুটা এগোতে থমকালো গাড়ি। বাঁ দিকে তাকাতে বললেন গাইড চয়ন। অবশেষে আমাদের অপেক্ষার অবসান। বাঁ দিকে জঙ্গলের মধ্যে থেকে উঁকি মারছে উদ্যানের রাজা। আমাদের উচ্ছ্বাস ধরে রাখা দায়। হট্টগোল না করার জন্য সতর্ক করলেন গাইড। আবার চলা শুরু এবং কিছুটা এগিয়ে আবার থমকানো। এ বার তাকানো ডান দিকে। আবার গন্ডার। নিজের মতো ঘুরে বেড়াচ্ছেন গন্ডার বাবাজি। আবার বেরিয়ে এল ক্যামেরা। ছবি শিকারিদের আগ্রহ মিটিয়ে মুখ ফেরালেন তিনি, এগোলাম আমরা।

আবার থমকালাম। না এ বার গন্ডার নয়, হাতি। তবে বেশ দূরে, জঙ্গলের মধ্যে। আমাদের দিকে তাকানোর কোনো প্রয়োজনই বোধ করলেন না গজরাজ। কিছুটা চলার পর এল জলদাপাড়া ওয়াচ টাওয়ার। আবার কমে গিয়েছে বড়ো গাছ, দখল নিয়েছে তৃণভূমি। এরই মধ্যে দাঁড়িয়ে তিন তলা নজরমিনারটি। এই নজরমিনার পর্যন্তই পর্যটকরা আসতে পারেন। এর পর জঙ্গল শুধুমাত্র বন্যপ্রাণীদের জন্য।

jalda-rhino
ফের গন্ডার দর্শন। একেবারে জিপের কাছেই।

এ বার ফিরে চলা। গন্তব্য হরিণডাঙা নজরমিনার। আবার গন্ডার দর্শন। একটা নয়, দু’টো। একজন ব্যস্ত গাছের পাতা সাবাড় করতে। অন্য জনের পিঠে চেপে আরামে ভ্রমণ করছে প্রায় ছ’সাতটা পাখি। গন্ডারের কোনো তাপোত্তাপ নেই। আমাদের দিকেই তাকিয়ে থাকল বেশ খানিকক্ষণ, সুযোগ দিল বেশ কয়েকটা ছবি তুলে নেওয়ার।

jalda-harin
হরিণডাঙা নজরমিনার থেকে।

উঠলাম তিনতলা বিশিষ্ট হরিণডাঙা নজরমিনারে। জলদাপাড়া নজরমিনারের সঙ্গে বিশেষ কোনো ফারাক নেই এখানে। চারিদিকে ‘এলিফ্যান্ট গ্রাস’-এর জঙ্গল। দূরে দেখা যাচ্ছে হিমালয়। জলদাপাড়া বা হরিণডাঙা, কোনো নজরমিনার থেকেই অবশ্য জঙ্গলের কোনো বাসিন্দাকে দেখতে পাইনি। তবে আশেপাশের সৌন্দর্য ভোলার নয়। ঘড়িতে পৌনে দশটা। গাইড জানালেন এ বার ফিরতে হবে। সাফারি প্রায় শেষ। এক গন্ডা অর্থাৎ চার জন গন্ডারই দেখতে পেলাম আমরা।

jalda-ele
হেলদোল নেই গজরাজের।

তবে ফেরার পথেও চমক অপেক্ষা করেছিল। রাস্তার ঠিক ধারেই দাঁড়িয়ে এক হাতি। আমাদের থেকে ওর তফাৎ খুব একটা বেশি নয়, তাই পর্যটকরা কিঞ্চিৎ ভয়ে। মাঝখান দিয়ে বয়ে গিয়েছে একটি ছোটো নদী, তাই ও আমাদের দিকে আসবে না। গাইড আশ্বস্ত করতেই ফের বেরিয়ে পড়ল ক্যামেরা। শুঁড় তুলে অভিবাদন জানালেন গজরাজ।

আরও পড়ুন উত্তরবঙ্গের ডায়েরি ১ / বক্সা হয়ে জয়ন্তি

কী ভাবে যাবেন

জলদপাড়ায় আসার সহজতম উপায় হল ট্রেনে নিউ জলপাইগুড়ি (এনজেপি)। দেশের সব প্রধান শহরের সঙ্গেই ট্রেনে যোগ রয়েছে এনজেপির। এনজেপি থেকে মাদারিহাটের দূরত্ব ১২৫ কিমি। গাড়ি ভাড়া করে বা বাসে আসা যেতে পারে। মাদারিহাটে রেল স্টেশন রয়েছে। কিন্তু শিলিগুড়ি থেকে আলিপুরদুয়ারগামী কয়েকটা লোকাল ট্রেনই এই স্টেশনে থামে।

কোথায় থাকবেন

পশ্চিমবঙ্গ পর্যটন উন্নয়ন নিগমের জলদাপাড়া টুরিস্ট লজ রয়েছে মাদারিহাটে। জলদাপাড়া উদ্যানের ভেতরে রয়েছে হলং টুরিস্ট লজ। দুটো লজই অনলাইনে বুক করতে পারেন। www.wbtdc.gov.in। তবে হলং-এ জায়গা পাওয়া বেশ কষ্টকর আর পর্যটন নিগমের সাধারণ নিয়মাবলি হলং-এর জন্য প্রযোজ্য নয়। তবে এখানে রাত্রিবাসের সুযোগ পেলে সাফারির ক্ষেত্রে অনেক সুযোগসুবিধা পাওয়া যায়। এ ছাড়াও বেসরকারি অনেক হোটেল রয়েছে মাদারিহাটে।

ছবি : লেখক 

 

বিজ্ঞাপন
loading...

মতামত দিন

Please enter your comment!
Please enter your name here